Ashraf’s Column

Sunday, March 30, 2014

ক্যাডেট কলেজের টুকরো স্মৃতি: ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ: পর্ব ৬: ঠিকাদারের চ্যালেঞ্জ

কলেজে যোগদানের সপ্তাহখানিকের মধ্যে লক্ষ্য করলাম, প্রিন্সিপালসহ কিছু কর্মকর্তা এবং কর্মচারি ঠিকাদারের কাছ থেকে ফ্রেশ রেশন, যেমন গোস্ত, মাছ, তরকারি, তাজা ফল ইত্যাদি ক্রয় করতেন। মাসের শেষে ঠিকাদারের বিল পরিশোধ করতেন। আরও লক্ষ্য করলাম, প্রিন্সিপালের বাসায় সরবরাহকৃত মাছ-গোস্তের ওজন চাহিদকৃত পরিমানের চাইতে সবসময় বেশি। তরি-তরকারি, ফল-মূলের গুণগত মান ক্যাডেট মেসে সরবরাহকৃত আইটেমের চেয়ে অনেক ভালো, এবং পরিমানও চাহিদার চাইতে বেশি। কোনো কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারি মাসের পর মাস ঠিকাদারের বিল পরিশোধ না করে বাকি রাখছেন। এ নিয়ে ঠিকাদার কোনো আভিযোগও করছেন না। আমার বুঝতে বাকি রইলো না, প্রিন্সিপাল এবং কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বাসায় অন-পেমেন্ট রেশন সাপ্লাইয়ের নামে বড় রকমের দুর্নীতি হচ্ছে। এসব লোকদের পরিমানে বেশি এবং উন্নততর মানের রেশন সাপ্লাই করে ঠিকাদারের যে লোকসান হচ্ছে, তা তিনি ক্যাডেট মেসে ওজনে কম এবং খারাপ রেশন সাপ্লাই করে পুষিয়ে নিচ্ছেন। ব্যাপারটি সম্পূর্ণ অনৈতিক হবার কারণে সাথেসাথে ঠিকাদারের কাছ থেকে প্রিন্সিপালসহ অন্য সকলের রেশন নেয়া নিষিদ্ধ করে দিলাম। ঝিনাইদহ শহরের কাঁচা বাজার কলেজ গেইট থেকে মাত্র সোয়া মাইল দূরে। বাস, রিক্সা বা সাইকেলে করে যাওয়াআসা করা কোনো কঠিন কাজ ছিলো না। ক্যাডেটদের জন্য নিকটস্থ আর্মি ইউনিট অথবা এসএসডি (স্টেশন সাপ্লাই ডেপো) থেকে সরকার-নির্ধারিত মূল্যে চাল, আটা, চিনি ও ভোজ্য তেল সরবরাহ করা হতো। ফ্রেশ এবং ড্রাই রেশনের বাকি সব আইটেম ঠিকাদারের কাছ থেকে নিতে হতো। সকল আইটেম সাপ্লাই করার জন্য একজন ঠিকাদার ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে বারো মাসের জন্য নিয়োগ পেতেন। রাজনৈতিকভাবে অতি প্রভাবশালী এবং পেশীশক্তিতে অত্যন্ত বলীয়ান ঝিনাইদহ শহরের একই ব্যক্তি প্রতি বছর ছলে-বলে-কৌশলে ঠিকিাদারির একাজটি বাগিয়ে নিতেন। ভয়ে কেউ কোনো প্রতিবাদ করতে সাহস পেতো না। বাইরে থেকে এসে অন্য কোনো ঠিকাদার ভয়ে টেন্ডার জমা দিতে পারতেন না। তাছাড়া, টেন্ডারে কিছুকিছু আইটেম ছিলো যা কখনই কেনা হতো না। যেমন, গুড় এবং নারিকেল। কলেজ অফিস থেকে এসব আইটেমের চাহিদাও দেখানো হতো অনেক বেশি করে। যেমন, গুড়ের বাৎসরিক চাহিদা ছিলো ৩০ মণ, নারিকেলের চাহিদা ছিলো ৫০০০। আমার মনে আছে, গুড়ের দাম কোট করা হয়েছিলো কেজিপ্রতি দুই পয়সা, আর নারিকেল প্রতিটির দাম ছিলো এক পয়সা ! ক্যাডেট মেসে গুড়ের ব্যবহার একেবারেই ছিলো না। সকল প্রয়োজনে চিনি ব্যবহার করা হতো। কখনও কখনও নারিকেলের প্রয়োজন হলে কলেজের নিজস্ব গাছ থেকে নারিকেল পেরে ব্যবহার করা হতো। প্রভাবশালী ঠিকাদারটি এরকম সব আইটেমের অবিশ্বাস্য রকম কম দাম কোট করতেন। অন্যদিকে যেসব আইটেম প্রায় প্রতিদিন লাগতো সেগুলোর দাম অসম্ভব বেশি করে কোট করতেন। যেমন, রুই মাছের কেজি তখন বাজারে ছিলো ৩০ থেকে ৪০ টাকা। টেন্ডারে কোট করা হতো ৭০ থেকে ৮০ টাকা, বা তারও বেশি। একইভাবে মুরগি, গরু এবং খাসির গোস্তসহ অন্যান্য আইটেমের দাম আকাশচুম্বি অবাস্তব রেটে কোট করা হতো। এর মধ্যে কতো বড় অসাধু চতুরতা আছে, তা যাঁরা সাপ্লাইয়ের ব্যবসার সাথে জড়িত তাঁরা সবাই জানেন। তবে যাঁরা ব্যবসা করেন না, তাঁদের জন্য বিষয়টি একটু খোলাসা করে বলছি। টেন্ডারে উল্লিখিত প্রতিটি আইটেমের ইউনিট প্রাইস কোট করে চাহিদাকৃত সকল আইটেমের, আইটেমওয়াইজ, মোট পরিমানের দাম কোট করা হতো। সবশেষে সব আইটেমের সর্বসাকুল্যে যা দাম হতো তা কোট কর হতো। নিত্য প্রয়োজনীয় আইটেমগুলোর দাম আকাশচুম্বি হলেও গুড় এবং নারিকেলের মতো আপ্রয়োজনীয় আইটেমের হাস্যকর কম দামের কারণে সর্বসাকুল্য দাম অনেক কমে আসতো। বাহির থেকে কোনো ঠিকাদার এলে তাঁর পক্ষে এ চালাকি করা সম্ভব হতো না। তাঁরা গুড় এবং নারিকেলসহ সব আইটেমের স্বাভাবিক দাম কোট করতেন। যারফলে তাঁদের কোট করা সর্বসাকুল্য দাম প্রভাবশালী ঠিকাদারের কোট করা দামের চাইতে বেশি হতো। ঝিনাইদহ শহরের সেই একই প্রভাবশালী ঠিকাদার বছরের পর বছর, আইনের কোনো ব্যত্যয় না ঘটিয়ে, এভাবে সাপ্লাইয়ের কাজটি হস্তগত করতেন। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে উভয় পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য একটি সমাধান বের করার জন্য ঠিকাদারকে অফিসে আসতে অনুরোধ করলাম। অফিসে এলে আমি তাঁকে নিশ্চয়তা দিলাম, যেসব আইটেমের অস্বাভাবিক বেশি দাম ধরা হয়েছে সেগুলো কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে আনা হলে আমি গুড় বা নারিকেল জাতীয় আইটেমের জন্য কোনো ডিমান্ড দেবো না। চাইলে তাঁকে আমি লিখিত নিশ্চয়তা দিতে রাজি আছি। তিনি কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে পরে জানাবেন বলে চলে গেলেন। পরে লোক মারফত জানালেন, তাঁর পক্ষে এখন কিছু করা সম্ভব নয়। পরবর্তী অর্থ বছরে কোটেশন সাবমিট করার সময় তিনি কথাটা বিবেচনায় রাখবেন। শুনে আমার খুব মন খারাপ হলো, রাগও হলো ঠিকাদারের উপর। নিজের সন্তানের বয়সী বাচ্চা ছেলেদের কল্যাণের কথা বিবেচনা না করে বছরের পর বছর নাজায়েয মুনাফা লুটে খাচ্ছেন। অথচ, ৩০ জুন পর্যন্ত, মাত্র দু’তিন মাসের জন্য কোনো বিবেচনা করতে রাজি নন। ভাবলাম, এই জালিমকে অন্তত: একবার উচিৎ শিক্ষা দিতে হবে। আমি সর্বোচ্চ পরিমান গুড় এবং নারিকেল সাপ্লাই করার জন্য ঠিকাদারকে অর্ডার দিলাম। এবার তাঁর টনক নড়লো। লোক পাঠিয়ে অনেক অনুনয়-বিনয় করলো গুড় এবং নারিকেলের অর্ডার বাতিল করার জন্য। আমার এক জবাব, সময়মত গুড় এবং নারিকেল সরবরাহ করুন। নইলে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী আর্নেস্ট মানি ৩০ হাজার টাকা বাজেয়াপ্ত করা হবে। কলেজের কেউকেউ মন্তব্য করলেন, প্রিন্সিপাল সাহেবের কি মাথা খারাপ হয়ে গেলো ? এত গুড় আর নারিকেল কে খাবে ? তাঁদেরকে বললাম, গুড় ডেইরি ফার্মের গাভীদের খাওয়ানো হবে। নারিকেল ক্যাডেট মেসে দেওয়ার পর যা অতিরিক্ত থাকবে তা কলেজের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের কাছে কেনাদামে বিক্রি করা হবে। করেছিলামও তাই ! ঠিকাদার আমাকে বিভিন্ন চ্যানেলে হুমকি-ধামকি দিলেন। শেষ পর্যন্ত ‘রক্ত’ (আসলে আলতা !) দিয়ে চিঠি লিখে হত্যা করার হুমকিও দিতে বাকি রাখলেন না। আমার শুভাকাঙ্খীরা আমাকে সতর্ক হয়ে চলাফেরা করার পরামর্শ দিলেন। বিশেষ করে রাতবিরাতে গাড়িতে করে একা শুধু ড্রাইভার নিয়ে ৩০ মাইল দূরে যশোর ক্যান্টনমেন্টে যাতায়াতে নিষেধ করলেন। সেসময়ে ঝিনাইদহ অঞ্চল উগ্র রাজনৈতিক কর্মকান্ডের জন্য পরিচিত ছিলো। প্রায়ই দু’য়েকটা রাজনৈতিক হত্যাকান্ড সংঘটিত হতো। যাহোক, আমি এসবে কর্ণপাত করিনি। আমার বিশ্বাস ছিলো, এবং আজও আছে, হায়াত-মউতের মালিক আল্লাহ। আর, যারা এরকম হুমকি দেয় তারা সাধারণত: কাপুরুষ হয়ে থাকে। যাদের সাহস থাকে তারা হুমকি দেয় না, কাজটাই করে ফেলে। তখন সম্ভবত: মার্চ মাসের শেষ ভাগ। এপ্রিল মাসে পরবর্তী অর্থ বছরের জন্য নতুন দরপত্র আহ্বানের সময় হবে। সংশ্লিষ্ট সকল ছোটোছোটো সাব-কন্ট্রাক্টরকে আফিসে ডাকলাম। তাঁরা সবাই যা একবাক্যে বললেন তা হলো: সরবরাহকৃত সকল আইটেমের কনসলিডেটেড মূল্য প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা। যার জন্য টেন্ডারের সাথে ৩০ হাজার টাকার বেশি আর্নেস্ট মানি জমা দিতে হয়। তাঁরা প্রত্যেকে অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। এতো টাকা আর্নেস্ট মানি দেওয়া তাঁদের কারও একার পক্ষে সম্ভব নয়। শ্রেণী অনুযায়ী আইটেমগুলো ভাগভাগ করে প্রতি ৬ মাসে যদি টেন্ডার ডাকা হয় তবে তাঁরা তাতে অংশ নিতে পারবেন। সেক্ষেত্রে প্রতি শ্রেণীর আইটেমসমূহের জন্য ৫ থেকে ১০ হাজার টাকার মতো আর্নেস্ট মানি দিতে হবে। তবে একাজ করতে গেলে বড় একটা সমস্যা হবে। সেজন্য তাঁরা আমার সাহায্য চাইলেন। প্রভাবশালী বড় ঠিকাদার ক্ষেপে গিয়ে নিজস্ব গুন্ডা দিয়ে, অথবা থানাপুলিশ দিয়ে তাঁদের হেনস্থা করতে চাইবেন। আমি আমার পক্ষ থেকে সকল প্রকার সাহায্য-সহযোগিতার নিশ্চয়তা দিলাম। কেনো আমি ফ্রেশ এবং ড্রাই রেশনের দরপত্র ভেঙ্গেভেঙ্গে ছোটো করতে চাই তা ব্যাখ্যা করে চেয়ারম্যানের অফিসে চিঠি দিলাম। চেয়ারম্যান অনুমোদন দিয়ে দিলেন। ঝিনাইদহের এসডিও এবং এসডিপিও-কে (তখনও ঝিনাইদহ জেলা হয়নি) ক্ষুদ্র ঠিকাদারদের নিরাপত্তার কথা বলে, তাঁদের সহযোগিতা চাইলাম। তাঁদের দু’জনকেই আমার কাছে অত্যন্ত ভালো অফিসার বলে মনে হয়েছে। দু’জনেই সানন্দে রাজি হলেন সর্বপ্রকার সহযোগিতা প্রদানের জন্য। এতোদিন পর তাঁদের নাম মনে করতে পারছিনা বলে আমি দু:খিত। আসলে, স্থানীয় প্রশাসনিক অফিসারদের সহযোগিতা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে মফস্বল অঞ্চলে, পরিচালনা করা খুবই কঠিন। সে যায়গায় তাঁরা যদি অন্যায় হস্তক্ষেপ করেন তাহল কাজটি করা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। পরবর্তী জুলাই মাস থেকে ক্যাডেটদের খাওয়াদাওয়া নিয়ে বড় কোনো সমস্যা রইলো না। নবনিযুক্ত ক্ষুদ্র ঠিকাদাররা অত্যন্ত উৎসাহের সাথে ভালো মানের ফ্রেশ এবং ড্রাই রেশন সরবরাহ করতে লাগলেন। বড় একটা ঝামেলা থেকে বাঁচা গেলো !

Tuesday, March 25, 2014

ক্যাডেট কলেজের টুকরো স্মৃতি: ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ: পর্ব ৫: ক্যাডেট কলেজে অশান্তি এড়াতে হলে

আপনা র ঘরে যদি তিনটি ছেলেকে দিনের চব্বিশ ঘন্টা মাসের পর মাস আটকে রাখা হয় তাহলে কেমন অরাজক পরিস্থিতি হতে পারে, আশা করি, তা বুঝিয়ে বলতে হবে না। কমবেশি তিন’শ ছেলেকে (বা মেয়েকে), যাদের বয়স ১২ থেকে ১৮ বছর, যদি কঠিন শৃঙ্খলার মধ্যে আটকে রাখা হয় এবং সেখানে যদি শান্তিশৃঙ্খলা বজায় না থাকে তাহলে পরিস্থিতি কোন পর্যন্ত যেতে পারে, তা কল্পনাও করা যায় না। অথচ, ক্যাডেট কলেজগুলো অনেক দিন ধরে এই আপাত: অসম্ভব কাজটিই সার্থকতার সাথে করে সবার প্রশংসা কুড়াচ্ছে। যদি কেউ প্রশ্ন করেন, এর কোনো গোপন রহস্য আছে কি না। যদি থাকে তাহলে সেটা কী ? এ প্রশ্নের জবাব হলো: কোনো রহস্য নেই। যে চারটি বিষয়ে মনোযোগ দিলে পরিস্থিতি আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকবে তা হলো: (১) ছেলেদেরকে সময়মতো ভালো খাবার পরিবেশন করুন। (২) রুটিনমতো কাজকর্মে ব্যস্ত রাখুন। (৩) পর্যাপ্ত বিনোদনের ব্যবস্থা রাখুন। (৪) রাতে নিরবচ্ছিন্ন ঘুমেরে যাতে ব্যাঘাত না হয়, তা নিশ্চিত করুন। দেখবেন, বড় কোনো অশান্তি হবে না। ছোটোখাটো কিছু সমস্যা হতেই পারে। প্রশাসন যদি সজাগ থেকে সময়মতো সঠিক ব্যবস্থা নেয় তাহলে এসব ছোটো সমস্যা কোনো বড় অসুবিধা করে না। কেউ হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, তাহলে পড়ালেখা কোথায় গেলো ? ক্যাডেট কলেজের কোনো ক্যাডেটকে পড়ালেখা করার জন্য বলতে হয় না। একাজটি ওরা নিজ থেকেই খুব সিরিয়াসলি করে থাকে। এমনকি অনেকে লাইটস আউটের (রাতে আবশ্যিকভাবে বাতি নেভাবার সময়) পর ডিউটি মাস্টারের নজর এড়িয়ে চুপিচুপি পড়শুনা করে থাকে, বিশেষ করে পরীক্ষার আগে। শিক্ষকগণ শুধু নির্দেশণা দিয়ে সাহায্য করেন। কেউ কোনো বিষয়ে অতি দূর্বল হলে তাকে ক্লাসের বাইরে অতিরিক্ত সময়ে টিউটরিং করে থাকেন। স্পুনফিডিংয়ের কোনো প্রয়োজন হয় না। যখন ক্যাডেটরা ভেকেশনে বাড়ি যেতো তখন যাবার আগে হাউস মাস্টাররা ছেলেদের ব্যাগ-সুটকেইস রীতিমতো তল্লাশি করে সকল পাঠ্যবই হাউসে রেখে দিতেন। কোনো হোম ওয়ার্ক দেওয়া হতো না। ছেলেদের বলা হতো: বাড়ি গিয়ে আনন্দ করো, ঘুরে বেড়াও, খেলাধুলা করো, সিলেবাসের বাইরের বইপত্র পড়ো, মা-বাবার ঘরের কাজে সাহায্য করো ইত্যাদি। আড়াই-তিন মাস একনাগারে কলেজে থাকলে এক ধরনের একঘেয়েমি এসে যায়। তা থেকে মুক্তি পাবার জন্যই এমন পরামর্শ দেওয়া হতো। আজকাল শুনছি, ভেকেশনে যাবার সময় ক্যাডেটদের পাঠ্যবই সঙ্গে নিতে অনেকটা বাধ্য করা হয়। প্রচুর হোম ওয়ার্ক দেওয়া হয়। বাড়িতে থাকতে কোন কোন বিষয়ে প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়তে হবে সে সম্পর্কে অভিভাবককে চিঠি দিয়ে জানানো হয়। যে দর্শন ও নীতির উপর ভিত্তি করে শুধুমাত্র জাতীয় ভিত্তিতে মেধাবীদের জন্য ক্যাডেট কলেজ শুরুতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো, এসব কাজ তার পরিপন্থি। যেসব ছেলেমেয়েদের জন্য এমন করা প্রয়োজন তারা ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হবার জন্য উপযুক্ত নয়, অন্তত: মেধার দিক থেকে। শোনা যায়, আজকাল ভর্তির জন্য নির্বাচন প্রক্রিয়ায় আপোষ করা হচ্ছে। কথাটা সত্য হলে এটা কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। আর যদি ভর্তির জন্য নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কোনো ত্রুটি থাকে, বিশেষজ্ঞদের দিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে সংষ্কার করতে হবে। তা নাহলে ক্যাডেট কলেজের সুনাম, ঐতিহ্য ও কার্যকারিতা ধরে রাখা যাবে না ক্যাডেট কলেজের জন্য জনগণের ট্যাক্স থেকে যে বিপুল পরিমান অর্থ ব্যয় করা হয়, তার যৌক্তিকতা ধরে রাখা যাবে না। এবার আসা যাক ক্যাডেট কলেজে ক্যাডেটদের খাবার ব্যবস্থা প্রসঙ্গে। সকালের পিটি/প্যারেডের পর ব্রেকফাস্ট, সকাল দশটার দিকে মিল্ক ব্রেকে দুধ আর বিস্কুট, দুপুর একটার দিকে লাঞ্চ, বিকেলে গেইমস পিরিয়ডের পর চা-টিফিন, সর্বশেষ রাতে ডিনার। ক্যাডেট কলেজে মাথাপ্রতি একজন ক্যাডেটকে কোন বেলায় কোন খাবার কতটুকু দিতে হবে তা পুষ্টিবিজ্ঞানী নির্ধারণ করে দেন। যেমন, বলা হয় না, এক বেলায় একজন ক্যাডেটকে এতো টাকার মুরগির গোস্ত দিতে হবে। বলা হয়, এতো গ্রাম মুরগির গোস্ত দিতে হবে, দাম যতোই হোক না কেনো। যার ফলে বাজারে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়লে ক্যাডেট কলেজের বাজেটও আবশ্যিকভাবে বাড়াতে হয়। যে কোনো রান্না করা খাবার খেতে ভালো লাগবে কি না তা বহুলাংশে নিভর্র করে রান্নার উপকরণের গুণগত মান, রান্নার প্রক্রিয়া এবং পরিবেশের মানের উপর। এসব দেখার জন্য ডিউটি মাস্টার এবং ডিউটি এনসিওকে তাঁদের পর্যবেক্ষণে সর্বোচ্চ মনোযোগী হবার জন্য অনুরোধ করলাম। আমি নিজেও সময়ে-অসময়ে ক্যাডেট মেসের কুকহাউস ভিজিট করতে লাগলাম। সুযোগ পেলেই খাবার সময়, আগাম খবর না দিয়ে, মেসে গিয়ে ক্যাডেটদের সাথে বসে খাবার টেস্ট করতে লাগলাম। পরিবেশিত খাবারের মান এবং স্বাদ সম্পর্কে ক্যাডেটদের মতামত নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করতাম। একথা সত্য, ক্যাডেটদের মন্তব্যে বাড়াবাড়ি ছিলো, এ ধরনের কম্যুনিটি কিচেনের রান্না সম্পর্কে সাধারণত: যা হয়ে থাকে। তারপরও অত্যন্ত পরিতাপের সাথে লক্ষ্য করলাম: (১) অধিকাংশ ছেলে টিফিনে পরিবেশিত দুধ না খেয়ে টেবিলের উপর দুধভর্তি কাপ ছেড়ে যাচ্ছে। জিজ্ঞাসা করাতে ছেলেরা জবাব দিলো, স্যার, দুধ খেতে ভালো লাগে না। (২) যে বেলায় গরু, খাসি বা মুরগির গোস্ত থাকতো ছেলেরা সব গোস্ত না খেয়ে প্লেটে ফেলে রেখে যেতো। জিজ্ঞেস করলে ছেলেরা একবাক্যে জবাব দেতো, মরা গরুর (খাসি বা মুরগির) গোস্ত। খাওয়া যায় না। (৩) বাজে রান্নার জন্য সব্জিও অনেকে খেতে পসন্দ করতো না। শুধু ডাল দিয়ে ভাত খেয়ে উঠে যেতো। এসব দেখে ও শুনে মনেমনে কষ্ট পেতাম। সরকার ছেলেদের খাওয়াদাওয়ার জন্য এতো টাকা খরচ করছে। অথচ, ছেলেরা খেতে পারছে না। নিজের ছেলেবেলার কথা মনে হলো। মা যখন গ্লাসে করে গরম দুধ খেতে দিতেন তখন কী মজা করেই না তা খেতাম ! আর গোস্ত ! মা যে বেলায় গোস্ত রান্না করতেন সে বেলায় শুরু থেকেই সব ভাইবোন মিলে আনন্দে লাফাতাম ! খেতে বসার আগেই জিহ্বায় পানি এসে জেতো ! যাহোক, ছেলেদের মেসের খাবারে অরুচির কারণ খুঁজতে বেশি দূর যেতে হলো না। কলেজের নিজস্ব ডেইরি ফার্মে পর্যাপ্ত সংখ্যক গাভী ছিলো। যার বেশির ভাগ ছিলো ‘সিন্ধি’ প্রজাতির। অল্প কিছু ছিলো ‘ফ্রিজিয়ান’। দেশি জাতের কোনো গরু ছিলো না। তা সত্বেও মেসের চাহিদা মেটাবার মতো পর্যাপ্ত দুধ সেখানে উৎপন্ন হতো না। ফলে পুরোটাই বাইরের ঠিকাদারের কাছ থেকে কিনতে হতো। বাংলাদেশের বাস্তবতায় কোনো ঠিকাদারের কাছ থেকে খাঁটি দুধ আশা করা তখনও যেতো না, এখনও যায় না। ছেলেদেরকে খাঁটি দুধ খাওয়াতে হলে যে কোনো মূল্যে কলেজের নিজস্ব ডেইরি ফার্মের উন্নতি করা ছাড়া গত্যন্তর রইলো না। খুলনা থেকে সরকারি পশুপালন বিভাগের উপ-পরিচালক মহোদয়কে পরামর্শের জন্য দাওয়াত দিলাম। ভদ্রলোক খুব খুশিমনে এলেন। সঙ্গে ঝিনাইদহের সাবডিভিশনাল পশুপালন অফিসারকে আনলেন। সরজমিনে ডেইরি ফার্ম দেখলেন। ফার্মে রাখা রেজিস্টার খুলে প্রতিটি গাভীর বয়স, রোগ প্রতিরোধক টিকা দেওয়ার রেকর্ড, সবশেষ কবে ডিওয়ার্মিং (কৃমিমুক্ত) করা হয়েছে, খাবারের মেনু, নিয়মিত ব্যায়ামের রুটিন, এসব তথ্য পরীক্ষা করলেন। সাবডিভিশনাল পশুপালন অফিসারকে বিস্তারিত নির্দেশ প্রদান করে তাঁকে ফার্মের দায়িত্ব নিতে বললেন । সাবডিভিশনাল পশুপালন অফিসার বিষয়টিকে ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিলেন। প্রতি সপ্তাহে দু’তিনবার কলেজে এসে ফার্মের দেখভাল করতে লাগলেন। ফার্মের কর্মীদের পরামর্শ দিতে লাগলেন। কলেজের কৃষি ফার্মে অন্য ফসলের চাষ কমিয়ে দিয়ে সেখানে গাভীর দুধ বাড়ে এমন খাদ্য যথা নেপিয়ার ঘাস, জার্মান ঘাস, ভুট্টা ইত্যাদির চাষ শুরু হলো। ক্যাডেট মেসের ভাতের মাড় অন্য কোথাও না গিয়ে পুরোটা ডেইরি ফার্মে আসতে লাগলো। তিন মাসের মধ্যে, গাভীর সংখ্যা না বাড়িয়ে, দুধের পরিমান এতটা বেড়ে গেলো যে, ক্যাডেট মেসের চাহিদা মিটিয়ে কলেজের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে, বিশেষ করে যাদের দুগ্ধপোষ্য শিশু এবং ছোটো বাচ্চা ছিলো তাদেরকে, ভর্তুকিমূল্যে দুধ সরবরাহ করা সম্ভব হলো। ভেকেশনের সময় শহরের মিষ্টির দোকানদাররা সারপ্লাস দুধ সানন্দে কিনে নিয়ে যেতো। শত হলেও খাঁটি দুধ তো ! ক্যাডেটরা বেজায় খুশি হলো। এবার আর টেবিলে খালি দুধের গ্লাস দেখা গেলো না। ডেইরি ফার্মের কথা অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে যদি তার এক সদস্যের কথা না বলা হয়। তার নাম ‘মন্টু’। কলেজের সবাই তাকে এই নামে চিনতো। পরিচিত রাখাল নাম ধরে ডাকলে মন্টু যেখানই থাকতো ছুটে আসতো। সে ছিলো ফার্মের প্রবীনতম ষাঁড়। জাতে ছিলো ‘সিন্ধি’। গায়ের রং টকটকে লাল। দেখতে অত্যন্ত স্বাস্থ্যবান, হ্যান্ডসাম এবং স্মার্ট ! গত তিন বছর যাবত নিকটস্থ ভাটুই বাজারের কোরবানির হাটে নিয়ে বিক্রি করার চেষ্টা করা সত্বেও বিক্রি করা যায়নি। প্রতিবারই সকল বাধা এবং রশি ছিন্ন করে মন্টু হাট থেকে পালিয়ে এক দৌড়ে কলেজে ফিরে এসে ফার্মে ঢুকে নিজ অবস্থানে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো। যেহেতু আমাদের ফার্মটি ছিলো মূলত: দুধের জন্য, এঁড়ে বাছুর বড় হয়ে গেলে সেটিকে রাখার ব্যবস্থা ছিলো না। সিদ্ধান্ত নিলাম, কষ্ট হলেও, মন্টুকে এবার যে করে হোক বিদায় করতে হবে। এবার কোরবানির সময় কলেজের পিকআপে চড়িয়ে মন্টুকে ঢাকার গাবতলি গরুর হাটে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। এবার আর মন্টু হাট থেকে মন্টু ফিরে এলো না। মন্টুকে যখন ঢাকা নেবার জন্য পিকআপে উঠানো হয় ফার্মের রাখালসহ অনেকের চোখে পানি দেখে আমি নিজেও বিচলিত হয়ে পড়েছিলাম বৈকি। ক্যাডেট মেসে রান্না করা গোস্তের স্বাদ ও মান উন্নয়ন করা অতটা সহজ ছিলো না। কুকহাউস থেকে যাতে কেউ কোনো মশলা, বিশেষ করে অতি দামি গরম মশলা, রান্নার তেল-ঘি চুরি করে বাইরে নিতে না পারে সেজন্য কুকহাউসের স্টাফদের আচমকা শরীর তল্লাসি শুরু করা হলো। প্যান্টের পকেটে ভরে গড়ম মশলা চুরি করে নেবার সময় ধরা পড়ায় দু’একজনকে চাকুরি থেকে বরখাস্ত করা হলো। এদের মধ্যে কেউকেউ স্থানীয় হবার কারণে বাইরের মাস্তানদের সাথে নিয়ে প্রিন্সিপালকে একহাত দেখে নেবার হুমকি দিলো। এতো সবের পরও গোস্তের মান বাড়ানো গেলো না। একেবারে মৃত না হলেও মৃতপ্রায় এবং অতিশয় রুগ্ন পশুর গোস্ত সরবরাহ বন্ধ করা যাচ্ছিলো না। গোস্তের ঠিকাদারকে ডেকে প্রথমে অনুরোধ পরে সতর্ক করলাম। কোনো কাজ হলো না। ঠিকাদারের এক জবাব, তাঁর নিজের কোনো কসাইখানা বা গোস্তের ব্যবসা নাই। কসাইদের কাছ থেকে কিনে তিনি গোস্ত সাপ্লাই দেন। কলেজের মেডিক্যাল অফিসার ছিলেন মেজর (পরে লে: কর্নেল, বর্তমানে মরহুম) কফিলউদ্দিন আহমদ (চলচ্চিত্র পরিচালক তৌকীর আহমদের পিতা)। ঠিকাদার ফ্রেশ রেশন নিয়ে এলে তিনি প্রতিবার গোস্তসহ সব আইটেমের গুণগত মান পরীক্ষা করতে লাগলেন। কোনো কিছুতেই কাজ হচ্ছিলো না। সর্বশেষ উপায় হিসেবে আমাকে নিজ দায়িত্বে একটি অসাধারণ পদক্ষেপ নিতে হলো। বিল্ডিং সুপারভাইজারকে ডেকে বললাম মেসের পাশে একটি ‘বুচারি’ অর্থাৎ কসাইখানা বানাতে হবে। যাতে একটা বা দু’টো গরু একসাথে জবাই করে গোস্ত বানানো যেতে পারে। তার জন্য সম্ভাব্য নির্মাণ ব্যয় কতো হবে তা আইটেমওয়ারি লিখে আমাকে এস্টিমেট দিতে বললাম। এস্টিমেট দেখে চিন্তায় পড়ে গেলাম। প্রিন্সিপালের ফিনান্সিয়াল পাওয়ারের চাইতে অনেক বেশি টাকার প্রয়োজন। যদি অনুমোদন চেয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উর্ধতন কতৃর্পক্ষকে চিঠি লিখি, আর যদি কোনো কারণে সে অনুরোধ প্রত্যাখ্যাত হয়, তাহলে ‘বুচারি’ আর কখনও বানানো যাবে না। অথচ ‘বুচারি’ না বানিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কলেজের সামনে যশোর-কুষ্টিয়া হাইওয়ে। তার পাশে, আল্লাহ জানেন কবে থেকে, প্রচুর অব্যবহৃত উদ্বৃত্ত ইট পড়ে ছিলো। কলেজের পাম্প হাউস বানানোর সময়ে ঠিকাদার কর্তৃক লেবারদের জন্য নির্মিত টিনশেড বহুদিন যাবত পড়ে ছিলো। বিল্ডিং সুপারভাইজারকে আদেশ দিলাম, যতো শীঘ্র সম্ভব হাইওয়ের পাশ থেকে অব্যবহৃত ইট, এবং পাম্প হাউসের পাশ থেকে টিন নিয়ে এসে ‘বুচারি’ বানিয়ে ফেলতে। ক্যাডেট মেস থেকে পানি ও বিদ্যুতের সংযোগ নিতে। মেইনটিন্যান্স খাত থেকে বাকি নির্মাণ সামগ্রী কিনে নিতে। তাড়াতাড়ি এইজন্য করছিলাম যে, ‘বুচারি’ বানালে যাদের স্বার্থে আঘাত লাগবে তাদের কেউ যাতে উপরওয়ালা কাউকে দিয়ে আমার এ ‘ষড়যন্ত্র’ অংকুরেই নস্যাত না করে দেয়। যেমন আদেশ, তেমন কাজ। প্রচুর আলোবাতাসের ব্যবস্থা রেখে, চারদিকে ফ্লাইপ্রুফ নেটের ঘেরা দিয়ে, প্রায় রাতারাতি টিনের চালওয়ালা ‘বুচারি’ তৈরী হয়ে গেলো। এবার ঠিকাদারকে বলা হলো গরু, খাসি এবং মুরগি, সব জীবীত অবস্থায় কলেজে আনতে হবে। কলেজের মেডিক্যাল অফিসার পরীক্ষা করে দেখে ‘গ্রহণযোগ্য’ বলে সার্টিফিকেট দিলে কলেজের ‘বুচারি’তে জবাই করে গোস্ত সরবরাহ করতে হবে। কলেজ মসজিদের ইমাম সাহেব বিনা পারিশ্রমিকে পশু জবাইর কাজ করে দিবেন। মজার ব্যাপার হলো, জ্যান্ত মুরগি খাচায় ভরে আনলেও, ঠিকাদারকে জ্যান্ত গরু ও খাসি সকাল বেলা একাডেমিক ব্লকের সামনে দিয়ে হাটিয়ে আনতে বলা হলো। ক্যাডেটরা ক্লাসরুমে বসেই নিজের পায়ে হেটে যাওয়া গরু ও খাসির অবয়ব দেখতে পেতো। এবার আর খাবার টেবিলে কোনো গোস্তের চিহ্ন রইলো না। ছেলেরা পরিতৃপ্তির সাথে পরিবেশিত প্রতিটি গোস্তের টুকরা খেয়ে শেষ করতে লাগলো। এই ঘটনার কিছুদিন পর ঢাকায় কোনো কাজে গেলে আর্মি হেডকোর্য়াটার্সে ক্যাডেট কলেজ গভর্নিং বডিজের চেয়ারম্যান জে: এরশাদের সাথে দেখা। তিনি অনেকের সামনে আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ওয়েলডান, আশরাফ। ‘বুচারি’ বানিয়ে খুব ভালো কাজ করেছো। আমি বললম, স্যার, আপনি কেমন করে জানলেন ? আমি তো আপনাকে জানাইনি। তিনি মুচকি হেসে বললেন, বেনামী চিঠি থেকে জেনেছি ! তোমরা তো জানোনা, প্রতিদিন প্রিন্সিপালদের বিরুদ্ধে আমার কাছে প্রচুর বেনামী চিঠি আসে। প্রিন্সিপালদের মধ্যে যারা খুব ভালো করছে, এবং যারা খুব খারাপ করছে তাদের বিরুদ্ধে বেশি বেনামী চিঠি আসে। ডোন্ট ওরি, তুমি অবশ্যই ভালো করছো। কীপ ইট আপ।

ক্যাডেট কলেজের টুকরো স্মৃতি: ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ: পর্ব ৪: সেকুলারিজম নিয়ে বিভ্রান্তি

পেরেন্টস ভিজিটিং ডে’তে অফিসে বসে আছি। অভিভাবকরা এক এক করে আসছেন। কেউ আসছেন শুধু শুভেচ্ছা জানাতে। কেউ আসছেন নিজ ছেলের কোনো সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে। কেউ বা আসছেন কলেজ কর্তৃপক্ষের কোনো সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে তা প্রত্যাহার করার অনুরোধ জানাতে। নানা বয়সের, নানা পেশার, নানা ব্যাকগ্রাউন্ডের লোক আসছেন। প্রত্যেকে আমার সম্মানিত ক্লায়েন্ট। সেভাবেই সবার সাথে কথা বলে আসছিলাম। হঠাৎ করে এক ভদ্রলোক কিছুটা উত্তেজিত অবস্থায় আমার অফিসে এসে বসলেন। মনে হলো, আমার অফিসে আসার আগে উনি কোনো বিষয় নিয়ে কারো সাথে কথা বলছিলেন। উত্তেজনাটা সেখানেই ঘটেছে। বাংলা একাডেমির একজন সিনিয়র অফিসার হিসেবে নিজের পরিচয় দিলেন। আরও জানালেন, বাজারে উনার লেখা এবং অনুবাদ করা অনেক বই আছে। বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য এবং সংস্কৃতি জগতের একজন সিনিয়র মোড়ল বলেও নিজেকে তুলে ধরলেন। ধরা যাক ভদ্রলোকের নাম মাসুদ সাহেব। কোনো প্রকার ভূমিকা না করে মাসুদ সাহেব বললেন: তাঁর ছেলে ক্লাস নাইনে পড়ে। তাকে জোর করে কলেজ কর্তৃপক্ষ মসজিদে নিয়ে নামাজ পড়তে বাধ্য করছে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, প্রতিদিন মাগরিবের ওয়াক্তে সকল মুসলমান ছেলেদের জন্য সারিবদ্ধ হয়ে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়া বাধ্যতামূলক। একইভাবে শুক্রবার জুমার নামাজ মসজিদে গিয়ে আদায় করা বাধ্যতামূলক। অন্যান্য ওয়াক্তিয়া নামাজ পড়ার জন্য প্রত্যেক হাউসে প্রেয়াররুম আছে। মাসুদ সাহেব পবিত্র কুর’আনের সুরা বাকারার ২৫৬ নম্বর আয়াতের প্রথম অংশ উদ্ধৃত করে বললেন, ইসলামে ধর্ম নিয়ে জবরদস্তি নেই। যার খুশি সে নামাজ পড়বে। যার খুশি সে পড়বে না। তিনি আরও বললেন, বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। এখানে কাউকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে নামাজ পড়ানো যাবে না। ভদ্রলোক একই আয়াতের ঠিক পরের অংশটি বেমালুম চেপে গেলেন, যেমনটি আমাদের দেশের একধরনের সেকুলারিস্ট রাজনৈতিক নেতারা করে থাকেন। এধরনের লোকদের সাথে তর্ক করে লাভ হয় না। আমি আমার অফিস সুপারিনটেনডেন্ট নাজির সাহেবকে বললাম মাসুদ সাহেবের ছেলের পার্সোনাল ফাইল আনতে। ফাইলের একেবারের প্রথম পাতাটি ছিলো দু’বছর আগে পাঠানো তাঁর ছেলের ভর্তির দরখাস্ত। যার নিচের দিকে মাসুদ সাহেবের নিজের দস্তখত। দরখাস্তে প্রার্থীর ধর্ম হিসেবে ‘ইসলাম’ কলম দিয়ে লেখা ছিলো। আমি কথা না বাড়িয়ে দরখাস্তটি মাসুদ সাহেবের দিকে এগিয়ে দিয়ে বরলাম, ‘ইসলাম’ কথাটি কেটে দিন। পরিবর্তে ‘নাস্তিক’ বা ‘নাই’ যা খুশি লিখে নিচে আজকের তারিখসহ ইনিশিয়াল করে দিন। আপনার ছেলেকে আর আমি জোর করে নামাজ পড়তে নেবো না। ভদ্রলোক মনে হলো বজ্রাহত হলেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, তা কি সম্ভব ? আমি বললাম, যদি সম্ভব না হয়, তাহলে দয়া করে এবার যান। আমাকে আমার কাজ করতে দিন। মাসুদ সাহেব আর কথা না বাড়িয়ে উঠে গেলেন। এই ঘটনার পর কোনো পেরেন্টস ডে’তে ওনার সাথে আর দেখা হয়েছে বলে পড়ে না। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর ক্যাডেট কলেজকে লোকচোখে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য কিছু মতলববাজ লোক এক ধরনের প্রপাগান্ডা শুরু করে। তারা বলতে শুরু করে, নতুন সংবিধানে সেকুলারিজম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সুতরাং স্কুলের বাচ্চাদের আর ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ক্যাডেট কলেজসহ সকল স্কুল থেকে অবিলম্বে ধর্মীয় শিক্ষা উঠিয়ে দেওয়া হোক। সংবিধানে যা-ই লেখা থাক না কেনো, বাস্তব সত্য হচ্ছে, একজন মুসলমান আল্লাহ কর্তৃক নির্দেশিত এবং রাসুল পাক (সা:) কর্তৃক প্রদর্শিত পথে আল্লাহর ইবাদত করেন। নিজে নামাজ-রোজা করেন, সন্তানকে নামাজ-কালিমা শেখান। পিতামাতা বা কারো মৃত্যু হলে তাঁর জন্য জানাযা পড়েন, দোয়া করেন। শতকরা নব্বইভাগ মুসলমানের দেশে এসবই তো স্বাভাবিক। কীভাবে এসব কতর্ব্য পালন করতে হয়, অর্থাৎ দৈনন্দিন জীবনে কীভাবে ইসলাম চর্চা করতে হয় এবং তার অনুশাসন মেনে চলতে হয়, তা একজন মুসলমানের সন্তানকে শিশুকাল থেকে শিক্ষা দেওয়া অতীব জরুরি। কয়েক যুগ আগে নিজ বাড়িতে ধর্মীয় শিক্ষক রেখে, অথবা নিকটস্থ মকতবে পাঠিয়ে মুসলমানের শিশু সন্তানদের এসব শেখানো হতো। আজকাল নানা কারণে পিতামাতার পক্ষে এই দায়িত্ব পালন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই সংগত কারণে সেই দায়িত্ব রাষ্ট্র নিজে গ্রহণ করেছে। স্কুল পর্যায়ে তাই ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। শুধু ইসলাম নয়, অন্য ধর্মালম্বীদের সন্তানদেরও নিজনিজ ধর্ম শিক্ষার ব্যবস্থা স্কুলে রাখা হয়েছে। ক্যাডেট কলেজেও ইসলামসহ সকল ধর্ম শিক্ষা দেওয়া হয়ে থাকে। নৈতিক শিক্ষাকে সব সময় সাধারণ শিক্ষার অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে ধরা হয়। নৈতিক শিক্ষা ছাড়া শিক্ষা কখনও পূর্ণতা লাভ করে না। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য একটি মানব শিশুকে আলোকিত মানুষে, পরিপূর্ণ মানুষরূপে গড়ে তোলা। যে মানুষের নৈতিক গুণাবলী নাই তাকে আর যা-ই বলা যায় না কেনো, আলোকিত বা পরিপূর্ণ মানুষ বলা যায় না। পৃথিবীর সকল সমাজে ধর্মীয় শিক্ষাকে, শিক্ষক থেকে ছাত্রের মধ্যে, নৈতিক শিক্ষা স্থানান্তরের সর্বোৎকৃষ্ট কনডুইট (Conduit) বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। যেসব লোক স্কুল থেকে ধর্মীয় শিক্ষার মূলোৎপাটন করতে চান তাঁরা নৈতিক শিক্ষা প্রদানের কনডুইটের বিকল্প হিসেবে স্কুল পর্যায়ে কী ব্যবহার করবেন, তা কিন্তু বলেন না। ধর্মীয় শিক্ষার নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক গুরুত্ব ছাড়াও সামাজিক গুরুত্ব অপরিসীম। ধরা যাক, আমাদের দেশে মুসলমান বলে পরিচিত একজন লোক কোনো প্রতিষ্ঠানের নেতৃস্থানীয় পদে আছেন। তিনি হতে পারেন বেসামরিক বা সামরিক সার্ভিসের অফিসার, অথবা কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের একজন বড়কর্তা। তাঁর প্রতিষ্ঠানের কেউ একজন মারা গেলো। কর্তাব্যাক্তিটি এই বলে জানাযায় যোগ দিলেন না যে, তিনি জানাযার নামায পড়তে জানেন না। তা হলে ঐ প্রতিষ্ঠানের লোকেরা কি তাঁকে মনেপ্রাণে নেতা হিসাবে মেনে নিতে পারবেন ? নিশ্চয়ই না। মাসুদ সাহেবের কথা শোনার পর থেকে অনেকদিন বিষয়টি নিয়ে ভেবেছি। বন্ধুবান্ধব ও সহকর্মীদের সাথে আলোচনা করেছি। আসলে ইংরেজি সেকুলারিজম শব্দটির অর্থ কি ? ধর্মনিরপেক্ষতা না ধর্মহীনতা ? যদি ধর্মহীনতা হয়, তাহলে অর্থ খুব পরিষ্কার। সেকুলার সমাজে বা রাষ্ট্রে ধর্মের কোনো স্থান নেই। সহজ কথা। এ নিয়ে অতিরিক্ত আলোচনার প্রয়োজন নেই। কিন্তু যদি অর্থ হয় ধর্মনিরপেক্ষতা, তা হলে বিষয়টি অবশ্যই বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। ধরা যাক, আমাকে বলা হলো: ইসলামধর্ম, সনাতনধর্ম, খৃষ্টধর্ম, বৌদ্ধধর্ম, এসবের মধ্য থেকে যেকোনো একটি ধর্ম পসন্দ করে নেও। বলা বাহুল্য, একজন মুসলমান হিসেবে ইসলামই হবে আমার শেষ এবং একমাত্র চয়েস। একইভাবে একজন হিন্দু, খৃষ্টান বা বৌদ্ধ নিজনিজ ধর্মকে বেছে নিবেন। এখানে তো কারো পক্ষে নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ নেই। তাহলে কথাটা দাড়ালো, সেকুলারিজমের অর্থ ধর্মনিরপেক্ষতা করা যায় না। আজকাল কেউ কেউ সেকুলারিজমের অর্থ অসাম্প্রদায়িকতা বলে চালাবার চেষ্টা করছেন। আমি মনে করি, সেটাও ঠিক নয়। ধর্ম আর সম্প্রদায় এক কথা নয়। একই ধর্মের মধ্যে একাধিক সম্প্রদায় বিরাজ করে। পশ্চিমা বিশ্বে, এমন কি আমাদের পাশের দেশ ভারতে, সেকুলারিজম বলতে সকল ধর্মের সমান মর্যাদা ও গুরুত্বকে বুঝানো হয়। সঠিক অর্থ প্রকাশ করা জন্য এর বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে ‘ পরধর্মসহিষ্ঞুতা’ বলা যেতে পারে। আশা করি, যাঁরা বাংলাভাষার শব্দ বা ওয়ার্ডের উৎস এবং অর্থ নিয়ে গবেষণা করেন ( Etymologist) তাঁরা যদি একটি যুৎসই প্রতিশব্দ চালু করতে পারেন তাহলে সেকুলারিজমের অর্থ নিয়ে সকল বিভ্রান্তি দূর হবে। আজকের পর্ব শেষ করার পূর্বে আমাদের দেশের সেকুলারিজমের অন্ধ ভক্তদের উদ্দেশ্যে কয়েকটি কথা নিবেদন করতে চাই। ১৯৭৬ সনের ২২ সেপ্টেম্বর তারিখে আমি, আরও দু’জন সহকর্মীর সাথে, প্রথম চীনদেশে যাই। ১৯৭১ সনে দেশ স্বাধীন হবার আগে ইসলামাবাদে অবস্থিত ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব মডার্ন ল্যাঙ্গুয়েজেজ নামক প্রতিষ্ঠানে সরকারি ব্যবস্থায় দেড় বছর চীনা ভাষা পড়াশুনা করি। যুদ্ধ শুরু হবার কারণে পাকিস্তানিরা আমাদের তিনজন বাংগালিকে ফাইনাল পরীক্ষা দিতে না দিয়ে প্রথমে বিভিন্ন ইউনিটে, পরে বন্দিশিবিরে পাঠিয়ে দেয়। চীন কর্তৃক বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পরপরই বাংলাদেশ আর্মি আমাদের তিনজনকে চীনা বৃত্তির অধীনে সে দেশে চীনা ভাষার কোর্সটি শেষ করে ডিগ্রি নেবার জন্য পাঠিয়ে দেয়। মূল কোর্স তিন বছরের হলেও পূর্ববর্তী পাঠকাল বিবেচনা করে দশ মাসের একটি সেসনের পর আমাদের তিনজনকে চীনের বিশ্ববিদ্যালয়টি ফাইনাল পরীক্ষায় অংশ নেবার অনুমতি দেয়। আগের থেকে চীনা ভাষায় অনেকটা দক্ষতা থাকার কারণে সেখানে পৌছে, ইন্টারপ্রেটরের মাধ্যমে নয়, আমরা নিজেদের চোখ-কান দিয়ে চীনা সমাজ এবং রাষ্ট্রকে দেখতে পেরছি। সর্বপ্রথম যে বিষয়টা আমাদের মনে গভীর রেখাপাত করলো, তা হলো নিজেরা কট্টর কম্যুনিস্ট হওয়া সত্বেও অন্যের ধর্মের প্রতি তাদের শ্রদ্ধাবোধ। আমাদের ক্যাফেটেরিয়ায় মুসলমান ছাত্রদের জন্য আলাদা ডাইনিং হল ছিলো। যেখানে মুসলমান শেফ দিয়ে রান্না করা একমাত্র হালাল খাবার পরিবেশন করা হতো। তখন এবং পরবর্তীকালে চীনে থাকার সময় চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক শহর এবং গ্রাম ভিজিট করেছি। সবখানে একই রকম অবস্থা দেখেছি। মসজিদসহ সকল ধর্মের উপাসনালয় রাষ্ট্রের টাকায় চালানো হচ্ছে। সরকারি কোষাগারের অর্থ দিয়ে কুর’আন শরীফ ছাপিয়ে মুসলমানদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে, মসজিদের ইমামদের বেতন দেওয়া হচ্ছে। এমনকি সরকারি টাকায় প্রতি বছর মুসলমানদের হজ্জ করতে পাঠানো হচ্ছে। ইসলাম সম্বন্ধে পড়াশুনা করার জন্য ইমামদের মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হচ্ছে। ছোটোবড় সকল শহরে হালাল গোস্তের দোকান রয়েছে। প্রায় সব রেস্টুরেন্টে হালাল খাবার পরিবেশনের ব্যবস্থা রয়েছে, যা রেস্টুরেন্টের বাইরে সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে। একবার বিশেষ ট্রেনে করে আমাদের কোথাও নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো। পথে খাবারের জন্য একটি স্টেশনে ট্রেন থেমেছিলো। আমরা কিছু মুসলমান যাত্রী খাবার শেষ হলে ওয়াক্তিয়া নামাজের জন্য প্ল্যাটফর্মের উপর দাঁড়ালাম। চীনারা বিন্দুমাত্র বিরক্তি প্রকাশ না করে নামাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে পরে ট্রেন ছাড়লো। আরেকবার, তখন আমি আমাদের পেইচিং দূতাবাসে চাকুরি করি, রমজান মাসে পেইচিং থেকে অনেক দূরে এক শহরে কাজে গিয়েছি। সেখানে পৌছার পর আমার হোস্টকে জানালাম, আমি রোজা রাখছি, শেষরাতে সেহরির ব্যবস্থা করা যাবে কিনা। হোস্ট, পিএলএ’র একজন কর্নেল, হেসে দিয়ে বললেন, আমি তোমাদের রোজা সম্বন্ধে জানি। আমার ইউনিটে কিছু মুসলিম সোলজার আছে যারা নিয়মিত রোজা রাখে। তুমি এ নিয়ে ভেবো না। ভোর রাতে দরজায় নক্ শুনে জেগে দেখলাম মেসের দু’জন কর্মীকে সাথে নিয়ে চীনা কর্নেল সাহেব ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় নিজে সেহরির খাবার হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। এ দৃশ্য দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলাম। কর্নেল সাহেব অনুমতি নিয়ে ঘরে এসে টেবিলে খাবার সাজিয়ে রেখে চলে গেলেন। যাবার সময় বলে গেলেন, সকাল বেলা প্লেট-পেয়ালা নিয়ে যাবেন। দু’তিন দিন সেখানে ছিলাম। প্রতিদিন সেহরি এবং ইফতারির সময় একইভাবে আমাকে খাবার সার্ভ করা হয়েছিলো। কম্যুনিস্ট দেশের মানুষের অপরের ধর্মের প্রতি সম্মান দেখার পর আমার দেশে মুসলমানের ঘরে জন্ম নেয়া সেকুলারিজমের ফেরিওয়ালাদের কথা শুনে ভাবি, এরা আসলে কী চায় ?

ক্যাডেট কলেজের টুকরো স্মৃতি: ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ: পর্ব ৩: মায়ের মন মানে না মানা

সন্তানের প্রতি বাংগালি মায়ের প্রবাদতুল্য বাৎসল্য সম্পর্কে আমরা সবাই অবগত আছি। এজন্য আমরা বাংগালিরা নিজেদেরকে ভাগ্যবান মনে করি। কন্তু কখনও যে এই বাৎসল্য অশান্তির কারণ হতে পারে তেমন অভিজ্ঞতা ক’জনের হয় ? ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজে প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালনকালে আমাকে এমন একটি অশান্তির মোকাবিলা করতে গিয়ে বেশ বেগ পেতে হয়েছিলো। এখানে বলে রাখা ভালো, ছোটোবেলায় নিজের মাকে হারিয়েছিলাম। তাই মায়েদের ব্যাপারে সবসময় খুব ষ্পর্শকাতর ছিলাম, এখনও আছি। আমি যখন দেখি একজন মা তাঁর সন্তানকে কোলে নিয়ে চুমু খাচ্ছেন, সন্তানের মাথায় হাত রেখে দোয়া করছেন, অথবা নিজহাতে সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন, তখন আমার মনে হয় পৃথিবীর একটি সুন্দরতম দৃশ্য আল্লাহ আমাকে দেখাচ্ছেন। আমার কোনো কাজে বা কথায় কোনো মা কষ্ট পান তা আমি কখনও চাই না। তারপরও ক্যাডেটদের বৃহত্তর স্বার্থে আমাকে এমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিলো যাতে তাদের মায়েরা আহত বোধ করেছিলেন। পেরেন্টস ভিজিটিং ডে’তে আগত সকল মা তাঁর ছেলের জন্য একাধিক টিফিন ক্যারিয়ার এবং ব্যাগ ভরে খাবার নিয়ে আসতেন। রান্না করা নানাবিধ খাবার, পিঠাপায়েস থেকে শুরু করে যাবতীয় মৌসুমী ফল, কোমল পানীয় কোনোকিছু বাদ যেতো না। বিশেষ করে নিচের ক্লাসের ছেলেদের মায়েদের মধ্যে প্রবণতাটা লক্ষ্যণীয়ভাবে বেশি ছিলো। মা ছেলেকে নিজের পাশে বসিয়ে ‘ডাকফিডিং’ করতেন। যার ফলে পরদিন সকালে কলেজের হাসপাতালে ডায়রিয়াজনিত কারণে সিক রিপোর্টের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতো। তবে সবচেয়ে খারাপ পরিণতি ছিলো বিষয়টির ইমশেনাল দিক। যাদের মায়েরা আসতেন সেসব ক্যাডেট সবার সামনে প্রকাশ্যে হাপুসহুপুস করে খেলেও, যাদের মায়েরা আসতে পারতেন না তাদের চোখেমুখে যে বঞ্চনার করুণভাব ফুঠে উঠতো তা আমাকে ব্যাথিত করে তুলতো। এমন অনেক ছেলে ছিলো যাদের মায়েরা দূরত্ব অথবা অসুস্থতার কারণে কখনই আসতে পারতেন না। এদের অবস্থা চিন্তা করে আমার নিজের মনও খারাপ হয়ে যেতো। একদিন কৌতহল বশত: ছেলেকে খাওয়াচ্ছেন এমন একজন মায়ের পাশে গিয়ে বসে আলাপ শুরু করলাম। দেখলাম তিনি পরম আদরের সাথে আস্ত মুরগির রোস্ট ভেঙ্গে ছেলের মুখে তুলে দিচ্ছেন। জানতে পারলাম, ছেলেটির বাবা খুলনায় স্বল্প বেতনে একটি চাকুরি করেন। তাঁদের আরও তিনটি ছেলেমেয়ে বাড়িতে আছে। জিজ্ঞাসা করলাম, বাসায় সপ্তাহে ক’বার মুরগির রোস্ট রান্না করেন ? জবাবে তিনি জানালেন, সপ্তাহ তো দূরের কথা। মাসেও একবার করেন না। সামর্থ্যে কুলায় না। মেহমান-অতিথি এলে কালেভদ্রে মুরগির রোস্ট রান্না করেন। জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কী জানেন, আপনার এই ছেলে ক্যাডেট কলেজে সপ্তাহে কতবার মুরগির গোস্ত খায় ? মা কিছুক্ষণ নীরবে মাথা নিচু করে থেকে বললেন, কী করবো স্যার। মনটা যে মানে না। প্রত্যেকবার পেরেন্টস ডে’তে আসার সময় টাকা ধার করে মুরগি কিনে রোস্ট বানিয়ে আনি। আমি তাঁর ক্যাডেট ছেলেকে দেখিয়ে বললাম, এই ছেলে সপ্তাহে চার বেলা মুরগির গোস্ত, চার বেলা গরু বা খাসির গোস্ত, চার বেলা বড় মাছ এবং দুই বেলা শাকশব্জি দিয়ে ভাত বা পোলাও খায়। এছাড়া নিয়মিত ডিম, দুধ, ফলমূলসহ অনেক রকম পুষ্টিকর খাবার খেয়ে থাকে। আপনি তো আপনার চারটি সন্তানের সকলরই মা। বাড়িতে আপনার সাথে যে তিনজন থাকে তাদেরকে মাসে একবার মুরগি খাওয়াতে পারেন না। অথচ, যে ছেলে ক্যাডেট কলেজে থেকে সপ্তাহে চারদিন মুরগিসহ আরও অনেক পুষ্টিকর খাবার খাচ্ছে তার জন্য ধার করা টাকা দিয়ে মুরগি রান্না করে আনছেন, আপনারই অন্য বাচ্চাদের বঞ্চিত করে। মা হয়ে সন্তানদের মধ্যে এ ধরনের পক্ষপাতিত্ব করা কি ঠিক কাজ হলো ? আমি মায়ের চোখে পানি দেখলাম। তিনি বললেন, আজই শেষ। ভবিষ্যতে এমন আর হবে না। আমি মায়ের চোখের পানিতে সমস্যার সমাধান খুঁজে পেলাম। সহকর্মীদের সাথে আলাপ করে পেরেন্টস ভিজিটিং ডে’তে ক্যাডেটদের জন্য সকল প্রকার খাবার এবং পানীয় আনা কঠিনভাবে নিষিদ্ধ করা হলো। এবার অনেক মা ভীষণ ক্ষেপে গেলেন। তাঁদের বক্তব্য, আমরা নিজেদের টাকা দিয়ে নিজেদের ছেলেদের জন্য খাবার আনি। তাতে প্রিন্সিপাল সাহেবের আপত্তি করার কী আছে ? একদিন চারপাঁচজন মা মিলে একটি ডেলিগেশন নিয়ে আমার অফিসে এলেন। আমার সিদ্ধান্ত বাতিল করার জন্য জোর অনুরোধ জানালেন। আমি আমার পক্ষ থেকে বিষয়টি বুঝিয়ে বললাম। উপরে বর্ণিত মায়ের ছেলেকে মুরগির রোস্ট খাওয়ানের ঘটনা বললাম। সবশেষে বললাম, তবে হ্যাঁ, আমার তিন’শ ছেলের সবার জন্য যদি খাবার আনতে পারেন তা হলে মোস্ট ওয়েলকাম। আমাকে আগে থাকতে জানাবেন। আমি আনন্দের সাথে পরিবেশনের সব ব্যবস্থা করে দেবো। এরপর এমন অনুরোধ নিয়ে কেউ আর অমার কাছে আসেননি।

ক্যাডেট কলেজের টুকরো স্মৃতি: ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ: পর্ব ২: প্রিন্সিপাল তো নয় যেনো আই জি প্রিজন !

ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজে যোগদান করার পরপরই নজর দিলাম ক্যাডেটদেরকে বাইরের সকল প্রকার অশুভ প্রভাব ও হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষা প্রদানের দিকে। কারণ, আমার মনে হয়েছে, ভিতরে আমি যতো ভালো কাজই করি না কেনো, বাইরের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে তাকে রক্ষা না করতে পারলে সে ভালো কাজ সফল হবে না। মাসে একটি নির্দিষ্ট দিনে পেরেন্টস ভিজিটিং ডে ছিলো। বিধি অনুযায়ী ঐদিন শুধুমাত্র ক্যাডেটদের পিতামাতা এবং অনুমোদিত স্থানীয় আভিভাবকরা ক্যাডেটদের সাথে দেখা করতে আসতে পারতেন। ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে একটা নির্দিষ্ট স্থানে একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দেখাসাক্ষাতের ব্যবস্থা ছিলো। লক্ষ্য করলাম, ঐদিন কলেজের মেইন গেইট দিয়ে জলের স্রোতের মতো লোকজন ঢুকতো। কে কার সাথে দেখা করলো তার কোনো হিসাব ছিলো না। খবর নিয়ে জানলাম, ক্যাডেটদের পিতামাতা ছাড়াও, আত্মীয় নয় এমন লোকজন আত্মীয় পরিচয় দিয়ে প্রবেশ করতো। যার মধ্যে উগ্র রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ধর্মীয় গুরু, এলাকার মাস্তান, সিনিয়র ক্লাসের ক্যাডেটদের গার্লফ্রেন্ডসহ আরো অনেকে ছিলো। এ ছাড়া পেরেন্টস ভিজিটিং ডে নয় এমন দিনেও কিছুকিছু লোক, বিশেষ করে কিছু উচ্চপদস্থ সরকারি অফিসার এবং তাঁদের পত্নীগণ, ভিতরে এসে ক্যাডেটদের সাথে দেখা করতো। একদিন ক্লাস টুয়েলভের একটি ছেলের বাবা আমাকে ঢাকা থেকে টেলিফোন করলেন। ধরা যাক ছেলেটির নাম বাবর। অত্যন্ত কাতর কন্ঠে আমাকে বাবরের বাবা যা বললেন তার সারাংশ হলো: তিনি একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাঝারি পর্যায়ের অফিসার। আগে যশোর শহরে পোস্টেড ছিলেন তখন পেরন্টেস ভিজিটিং ডে’তে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এসে বাবরের সাথে দেখা করতেন। ঢাকায় থাকার কারণে গত ছ’মাস যাবত তিনি বা পরিবারের অন্য কেউ ঐদিনগুলোতে বাবরকে দেখতে আসতে পারছেন না। এই সুযোগ নিয়ে তাঁদের যশোরের এক প্রাক্তন পড়শী মহিলা বাবরের খালার পরিচয় দিয়ে বাবরকে দেখতে আসছে। আমি সরল মনে জানতে চাইলাম তাতে দোষের কী হলো। জবাবে ভদ্রলোক যা বললেন তাতে আমার দিব্যদৃষ্টি খুলে গেলো ! তথাকথিত খালার একটি ১৫/১৬ বছর বয়সী মেয়ে আছে যে ক্লাস টেনে পড়ে। মহিলা চাচ্ছে বাবর যাতে তার মেয়ের সাথে প্রেম করতে থাকে। বাবর ক্যাডেট কলেজের ছাত্র, পড়াশুনাসহ সবদিক দিয়ে ভালো। জামাই হিসেবে খুব ভালো হবে। তাই এখন থেকে ‘হুক’ করে রাখতে চাচ্ছে। বাবর অনেকটা পটে গেছে বলে বাবরের মা-বাবার ধারণা। কলেজে লম্বা ছুটি হলে বাবর এখন আর সরাসরি ঢাকা চলে যায় না। যশোরে ‘খালা’র বাসায় দু’য়েক দিন বেড়িয়ে পরে ঢাকা যায়। বিষয়টি বাবরের বাবা এবং মা কেউই মেনে নিতে পারছেন না। কাঁদোকাঁদো হয়ে তিনি বললেন, যেভাবেই হোক বাবরের সাথে ঐ ‘খালা’ এবং তার মেয়ের দেখাসাক্ষাত বন্ধ করতেই হবে। কলেজে ভেকেশন শুরু হলে বাবরকে সরাসরি ঢাকাতে আসতে হবে। যশোরে ‘খালা’র বাড়ি যাওয়া চলবে না। আমি মনেমনে ভাবলাম, আল্লাহ জানেন, এমন আর কতো বাবর আছে আমার কলেজে ! আমি বাবরের বাবাকে এই বলে আস্বস্ত করলাম, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। অবশ্যই কিছু একটা করবো। মাসিক হা্‌উস ইন্সপেকশনের সময় কোনোকোনো ক্যাডেটের কাবার্ড থেকে উগ্র রাজনৈতিক দলের প্রচারমূলক পুস্তিকা, লিফলেট পাওয়া গেলো। শুক্রবার জুমার নামাজে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলের সদস্যরা নামাজ পড়ার অছিলায় কলেজ মসজিদে এসে ছেলেদের সাথে রাজনৈতিক আলোচনা করতো। কিছু উগ্র বামপন্থী দলের কর্মীরাও সুযোগ বুঝে কলেজে ঢুকে একই কাজ করছে বলে জানতে পারললাম। টি-ব্রেকের সময় আমি স্টাফ রুমে গিয়ে ফ্যাকাল্টি মেম্বারদের সাথে একত্রে চা-নাস্তা খেতাম । এটা আমার প্রতিদিনের অভ্যাস ছিলো। অভ্যাসটি শিখেছিলাম আর্মি থেকে। ইউনিট পর্যায়ে আর্মিতে এটির চর্চা খুব জনপ্রিয়। অফিসে বা বাইরে খুব জরুরি কিছু না থাকলে এটা মিস করতাম না। চা-নাস্তা খেতেখেতে হাল্কা পরিবেশে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অবতারণা করে সকলের মতামত ও সুপারিশ জেনে নিতাম। মতানৈক্য হলে বেশ বিতর্ক জমে উঠতো। টি-ব্রেকের নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে গেলে যাঁদের ক্লাস বা কাজ থাকতো তাঁরা উঠে চলে যেতেন। আমি অন্যদের নিয়ে আলাপ করতাম। ফর্মাল স্টাফ মিটিংয়ে অনেকে, বিশেষ করে জুনিয়র সহকর্মীরা, সহজে মুখ খুলতে চান না। কিন্তু ইনফর্মাল চায়ের টেবিলে হাল্কা পরিবেশের কারণে সবাই মনের কথা বলতে উৎসাহিত বোধ করতেন। অনেকটা আড্ডার মতো পরিবেশ হতো, যেখানে আমি বলতাম খুব কম, শুনতাম বেশি। নেপথ্যে থেকে আলোচনার বিষয় ও গতি নিয়ন্ত্রণ করতাম। প্রায় সকল ক্ষেত্রে আলোচনায় গৃহীত সিদ্ধান্ত আমার নিজস্ব সিদ্ধান্ত থেকে ভিন্নতর হতো না। এ ধরনের আলোচনায় আরও একটা সুবিধা ছিলো। আলোচনার মাধ্যমে যে সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসতো তা, প্রিন্সিপালের সিদ্ধান্ত হিসেবে অফিস অর্ডারের মাধ্যমে প্রকাশিত হলেও, উপস্থিত সকলে যৌথ সিদ্ধান্ত হিসেবে মেনে নিয়ে তা আন্তরিকভাবে পালন করতেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সবাই নিজেকে অংশীদার মনে করতেন। প্রিন্সিপালকে কমান্ডার বা বস হিসেবে না দেখে টীমলিডার হিসেবে দেখতেন। নির্দেশ প্রদান ও পালনের ক্ষেত্রে এই বিশেষ পদ্ধতিটি খুবই কার্যকর হয়েছিলো। ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশিরা এন্টি এস্টাবলিশমেন্ট। যার কারণে, শিক্ষিতরা বসের আদেশ মানার চাইতে টীমলিডারের আদেশ মানতে আধিকতর সাচ্ছ্যন্দ বোধ করেন বলে আমি মনে করি। যাহোক, পেরেন্টস ভিজিটিং ডে’তে সৃষ্ট এসব অরাজকতা দূর করার জন্য টি-রুমে আলোচনার ভিত্তিতে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। যা ক্যাডেটদেরকে সাপ্তাহিক সমাবেসে, এবং তাদের পিতামাতা/অভিভাবকদেরকে লিখিতভাবে জানিয়ে দেওয়া হলো। কলেজ গেইটে কড়াকড়ি আরোপ করা হলো। কলেজ চত্বরে ঢোকার সময় এবং বের হবার সময় সকল ভিজিটরক তার নাম, ঠিকানা, প্রবেশের সময় এবং কারণ, এবং বের হবার সময় লিপিবদ্ধ করার নিয়ম চালু করা হলো। শুক্রবার ক্যাডেট ও ক্যাম্পাসে বসবাসকারী ছাড়া অন্যদের কলেজ মসজিদে জুমার নামাজের জন্য আসা বন্ধ করা হলো। ক্যাডেটদের আবাসিক এলাকায় প্রবেশের পথে প্রয়োজনীয় চেকপোস্ট বসানো হলো। মসজিদে কর্মকর্তা-কর্মচারীর কোনো বহিরাগত মেহমান আসতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বলা হলো মেহমানকে নিজে সঙ্গে করে আনতে। সকল পিতামাতা ও অনুমোদিত অভিভাবককে কলেজের অফিস থেকে ছবিসহ পরিচয়পত্র প্রদান করা হলো। পেরেন্টস ভিজিটিং ডে’তে পরিচয়পত্র দেখিয়ে প্রবেশ করা বাধ্যতামূলক করা হলো। কোনো পিতামাতা বা অনুমোদিত অবিভাবক পরিচয়পত্র আনতে ভুলে গেলে সংশ্লিষ্ট ক্যাডেটের হাউস মাস্টার/টিউটর গেইটে এসে পরিচয় জেনে নিয়ে তাঁকে ভিতরে আসতে দিতেন। এতো সব করার পরও বাবরের বাবার সমস্যা পুরোপুরি সমাধান হলো না। বাবরের যশোর যাওয়া বন্ধ করতে হবে। ঝিনাইদহ বাস মালিক সমিতির কর্মকর্তাদেরকে চায়ের দাওয়াত দিয়ে আমার অফিসে ডেকে এনে সহযোগিতা চাইলাম। সিদ্ধান্ত হলো, ভেকেশন শুরুর কয়েকদিন আগে জানালে তাঁরা ঢাকা, খুলনা, কুষ্টিয়া, যশোর, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা এসব শহরের জন্য রিজার্ভড বাসের ব্যবস্থা করে দিবেন। এসব বাস গন্তব্য ছাড়া রাস্তায় কোথাও থামবে না। কোনো ক্যাডেট নির্ধারিত গন্তব্য ছাড়া অন্য কোথাও যেতে চাইলে আগেভাগে অভিভাবকের কাছ থেকে লিখিত অনুরোধ আনতে হবে। এরপর থেকে বাবরের পক্ষে আর যশোরে ‘খালা’র বাড়ি যাওয়া আমার জানামতে সম্ভব হয়নি। তবে শেষ পর্যন্ত সেই ‘খালা’র মেয়েটির সাথে বাবরের প্রেম কতদূর এগিয়েছিলো, তা আমি জানতে পারিনি ! ইতোমধ্যে একটি ঘটনা ঘটলো যা আমার জন্য কষ্টদায়ক হলেও আমার কাজ কিছুটা হলেও সহজ করে দিলো। একদিন দুপুর বেলা আমার বড় মামা গ্রামের বাড়ি থেকে কলেজে এলেন আমার পরিবারের সবার সাথে দেখা করতে। ছোটো বেলায় আমার মা মারা যাবার পর থেকে, যেখানেই থাকতাম না কেনো, উনি প্রায়ই এমন আসতেন। বিকেল বেলা মামা ইচ্ছে প্রকাশ করলেন উনার গ্রামের একটি ক্যাডেটকে উনি দেখবেন। ওর বাবাকে উনি কথা দিয়ে এসেছেন। আমি পড়লাম মহা বিপদে। কলেজের আইন ভঙ্গ করে আমার পক্ষে উনার ইচ্ছা পূরণ করা কিছুতেই সম্ভব নয়। অন্যদিকে জীবনে কখনও মামার কথা অমান্য করিনি। তখনই সরাসরি জবাব দিলে, আমি জানি, মামা আমার বাসা ছেড়ে রাগ করে চলে যাবেন। কিছুটা সময় নেবার জন্য বললাম, এই তো এলেন। রেস্ট করেন। দেখি কাল সকালে কী করা যায়। পরদিন সকাল বেলা নাস্তার টেবিলে মামা পুনরায় অনুরোধ জানালেন ছেলেটিকে দেখার জন্য। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ক্যাডেটদের সাথে বহিরাগতদের দেখাসাক্ষাতের নিয়মকানুন সম্পর্কে ছেলেটির বাবা আপনাকে কিছু বলেননি ? তিনি জানালেন, না। আমি তখন অনেক কষ্টে তাকে বুঝিয়ে বললাম, কেনো কলেজের আইন অনুযায়ী তাঁর সাথে ছেলেটিকে দেখা করতে দেওয়া যায় না। তিনি বললেন, প্রিন্সিপাল আনুমতি দিলেও দেখা করা যাবে না ? আমি বললাম, না। খুব জরুরি কারণ ছাড়া প্রিন্সিপালের অনুমতি দেওয়ার এখতিয়ার নেই। আপনার সাথে ঐ ছেলেটির দেখা করার কোনো জরুরি প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। আমি খোঁজ নিয়েছি। ছেলেটি ভালো আছে। বাড়ি ফিরে ওর বাবাকে জানিয়ে দিবেন। যদি ওর বাবা প্রশ্ন করেন কেনো দেখা হলো না, তবে তাঁকে কি জবাব দেবো, মামা জানতে চাইলেন। বলবেন, ভাগ্নে খুব আদর যত্ন ও সম্মান করেছে। তবে প্রিন্সিপাল বেটা খুব নিষ্ঠুর ! কোনোমতেই আপনার ছেলের সাথে দেখা করার অনুমতি দিলো না। আমার একথা শুনে মনে হলো মামা নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। মুখ অত্যন্ত বেজার করে মামা উঠে গেলেন। কোনো রকমে চা-নাস্তা খেয়ে চলে গেলেন। তারপর রাগ করে প্রায় তিনচার মাস আমার বাসায় আসেননি। ঘটনাটি কেমন করে যেনো সারা কলেজে ছড়িয়ে গেলো। হয়তো প্রিন্সিপালের বাসার স্টাফদের কাছ থেকে জানতে পেরে থাকবে। এখানে একটা কথা বলে রাখি। ক্যাডেট কলেজের প্রিন্সিপালের ব্যক্তিগত জীবনে প্রাইভেসি বলতে কিছু নেই। সারাক্ষণ তাঁকে এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদেরকে প্রায় ১৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর তীক্ষ্ন নজরদারিতে থাকতে হয়। ভালো বা মন্দ উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটলে তা সাথেসাথে সবার কানে পৌঁছে যায়। ক্যাডেটরাও জেনে ফেলে। এজন্য প্রিন্সিপালকে, এমনকি তাঁর পরিবারের সদস্যদেরকে, প্রতিটি কাজে এবং কথায় অনগার্ড থাকা খুবই জরুরি। কিছুকিছু পিতামাতা/অভিভাবক, বিশেষ করে মায়েরা, উপরে উক্ত ব্যবস্থা নেবার কারণে প্রথম দিকে প্রিন্সিপালের উপর খুব রাগ করেছিলেন। তাঁদের নানারকম মন্তব্য, যা মোটেও সুখকর ছিলো না, ঘুরেফিরে আমার কানে আসতে লাগলো। তাঁরা কেউকেউ এমন মন্তব্যও করলেন, প্রিন্সিপাল তো নয় যেনো আই জি প্রিজন এসেছেন। তবে অনেকে ব্যাপারটি প্রশংসার চোখেও দেখেছিলেন। কিছুদিন পরে অবশ্য সবাই নিয়মটি মন থেকে মেনে নিয়েছিলেন।

ক্যাডেট কলেজের টুকরো স্মৃতি: ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ: পর্ব ১: প্রিন্সিপাল পদে যোগদান

১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ৮ তারিখে ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের প্রিন্সিপাল পদে যোগদান করি। তখন আমার বয়স কতোই বা হবে। সার্টিফিকেট অনুযায়ী বত্রিশ বছর কয়েক মাস। বাস্তবে তেত্রিশ বছর। প্রসঙ্গত: বর্তমান প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের জন্য একটা কথা বলা প্রয়োজন মনে করছি। এখন থেকে ষাট-সত্তর বছর আগে, আমাদের ছোটোবেলায়, এখনকার মতো জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনের কোনো রেওয়াজ এবং ব্যবস্থা ছিলো না। প্রায় সকলের দু’টো করে জন্মদিন থাকতো। একটা ছিলো আসল জন্মদিন। আর একটা অফিসিয়াল জন্মদিন। ক্লাস নাইনে উঠার পর সকলকে দু’বছর পর মেট্রিকুলেশন পরীক্ষার জন্য শিক্ষা বোর্ডে নাম রেজিস্ট্রি করতে হতো। কাজটি নিজনিজ স্কুলের মাধ্যমে করতে হতো। তখন, মাস্টার্স পাশ করে সরকারি চাকুরিতে ঢোকার সর্বনিম্ন বয়স বিবেচনায় রেখে, স্কুলের হেড স্যার একটা জন্মদিন ঠিক করে লিখে দিতেন। যাতে রিটায়ার করার আগ পর্যন্ত সর্বোচ্চ বেশিদিন চাকুরি করা সম্ভব হয়। আমার বেলায়ও তেমনটি হয়েছিলো। এ নিয়ে একবার জেদ্দা এয়ারপোর্টে বেশ বিব্রত হয়েছিলাম। আমার পাসপোর্ট দেখতেদেখতে ইমিগ্রেশন অফিসার হঠাৎ আমাকে প্রশ্ন করলেন, আচ্ছা বলোতো তোমার দেশের প্রায় সব লোকের জন্মদিন পহেলা জানুয়ারি হয় কেনো ? সৌদি ইমিগ্রেশন অফিরারটি হঠাৎ আমাকে কেনো এমন প্রশ্ন করলেন তা বুঝতে পারলাম না। আমার পাসপোর্টে অবশ্য আমার সরকারি জন্মদিন পহেলা জানুয়ারি ছিলো না। উপরে বর্ণিত আমার জবাব শুনে ভদ্রলোক অবাকই হয়েছিলেন বৈ কি ! যাহোক, আগের কথায় আসি। বলা হয়েছিলো এতো কম বয়সে, অর্থাৎ চল্লিশের চাইতে কম বয়সে,উপমহাদেশে আমার আগে আর কেউ পাবলিক স্কুল বা ক্যাডেট কলেজে প্রিন্সিপাল পদে নিয়োগ পাননি। আজকে ছত্রিশ বছর পর, ২০১৪ সালে, যখন ফিরে তাকাই তখন মনে হয়, আমার মতো এতো অল্প বয়সের একজনকে এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেবার পেছনে দু’টি কারণ ছিলো। এক, ১৯৭১ সনের পূর্বে সশস্ত্রবাহিনীর শিক্ষা বিভাগ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানি অফিসাররা চাকুরিতে সিনিয়র হবার কারণে প্রিন্সিপাল পদে নিয়োগ পেতেন। তখন পর্যন্ত মাত্র একজন বাংগালি অফিসার এই পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন। তাঁর নাম শহীদ লে: কর্নেল এম এম (মোহাম্মদ মঞ্জুরুর) রহমান এইসি (আর্মি এডুকেশন কোর), যিনি কর্নেল রহমান নামে অধিক পরিচিত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় নিজ কর্মস্থল ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজে কনের্ল রহমান পাকিস্তান আর্মির হাতে নিমর্মভাবে, একজন সত্যিকারের বীরের মত, শহীদ হন। দু:খের বিষয়, আমাদের আর্মি তথা দেশ আজ পর্যন্ত এই বীরের প্রতি যথাযথ সম্মান দেখাতে পারেনি। দুই, তখন দেশের প্রসিডেন্ট হিসেবে চীফ এক্সিকিউটিভ ছিলেন শহীদ জেনারেল জিয়াউর রহমান, বীর উত্তম। ডিফেন্স মিনিস্ট্রির দায়িত্বও তাঁর হাতে ছিলো। জে: জিয়া পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে সরাসরি ইন্সট্রাক্টর হিসেবে আমাকে পড়িয়েছেন, ট্রেইনিং দিয়েছেন। ১৯৭৩ সালে আর্মি হেডকোর্য়াটার্সে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি (বি এম এ) প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে, প্রস্তুতিমূলক কাজগুলো দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য, একটি সেল গঠন করা হয়েছিলো। অনেক কাজের মধ্যে যার প্রধান কাজ ছিলো বি এম এ’র জন্য টেবল অব অর্গানাইজেশন এন্ড ইকুইপমেন্ট (টি ও এন্ড ই) প্রনয়ণ করা। এই সেলে প্রথম যে চারজন অফিসারের কাজ করার গৌরব হয়েছিলো তার মধ্যে আমি একজন ছিলাম। জে: জিয়া আর্মির ডেপুটি চীফ অব স্টাফ হিসেবে সেলের কাজ তত্বাবধান করতেন। তখন আর একবার আমার সুযোগ হয়েছিলো জে: জিয়ার প্রত্যক্ষ সাহচর্যে আসার। পরে আরও একবার জে: জিয়ার ব্যক্তিগত তত্বাবধানে কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছিলো। ১৯৭৫ সালে মার্শাল ল’ জারি হবার পর রাস্ট্রের সকল গোয়েন্দা সংস্থার কাজকর্ম কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় করার জন্য কোঅর্ডিনেশন এন্ড কন্ট্রোল সেল ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি নামে প্রেসিডেন্টের অধীনে একটি শীর্ষ প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়। সেখানে আর্মি থেকে প্রাথমিকভাবে যে চারজন অফিসারকে নিয়োগ দেওয়া হয় তার মধ্যে আমাকে রাখা হয়েছিলো। ব্যক্তিগতভাবে জে: জিয়া এই সেলের কাজ তত্বাবধান করতেন। বলতে গেলে এসব কারণে আমি সম্ভবত: ব্যক্তিগতভাবে জে: জিয়ার স্নেহভাজন এবং আস্থাভাজন হয়ে উঠেছিলাম। ১৯৭১ সালে দেশ পাকিস্তানি হানাদার মুক্ত হবার পর দেখা গেলো বাঁচিয়ে রাখতে হলে, অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মতো, ক্যাডেট কলেজগুলোরও পুনর্গঠন করা জরুরি। তখনকার ডেপুটি আর্মি চীফ জে: জিয়াকে ক্যাডেট কলেজগুলোর গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান নিয়োগ করে তাঁকে এই দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। জে: জিয়ার নির্দেশনায় প্রিন্সিপাল নিয়োগের জন্য একটি প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়। প্রক্রিয়া অনুযায়ী ক্যাডেট কলেজের প্রিন্সিপাল হবার যোগ্য এমন প্রার্থীদের নাম আর্মি, নেভী, এয়ার ফোর্স ও ক্যাডেট কলেজের সিভিলিয়ান শিক্ষকদের পক্ষ থেকে ডিফেন্স মিনিস্ট্রিতে পাঠানো হয়। সেবার তালিকাতে আমার নামও ছিলো। পরবর্তীকালে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানতে পারি যে, নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ ক্যাডেট কলেজ কাউন্সিলের চেয়ারম্যন আমার ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছিলেন বয়স কম হবার কারণে। কিন্তু জে: জিয়া এই বলে সে আপত্তি নাকোচ করে দিয়েছিলেন, Don’t worry. I know this boy. He will not let you down. যাঁদের জে: জিয়ার সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে তাঁরা জানেন, জে: জিয়ার কথা এবং কাজের স্টাইলই এমন ছিলো। ১৯৬৩ সনে ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬৪ সন থেকে রেগুলার ক্যাডেট ভর্তি এবং ক্লাস শুরু হয়। তৎকালীন পাকিস্তান আর্মি এডুকেশন কোরের অত্যন্ত দক্ষ, মেধাবী এবং চৌকশ অফিসার লে: কর্নেল এন ডি হাসানকে প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাশ করা একঝাঁক অত্যন্ত মেধাবী ও ডেডিকেটেড যুবককে অতি যত্ন সহকারে নির্বাচন করে লেকচারার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। যাঁরা শুধু নিজনিজ একাডেমিক বিষয়ে ভালো জ্ঞান রাখতেন না, নানা প্রকার শিক্ষাসহায়ক (কো-কারিকুলার) বিষয়েও পারদর্শী ছিলেন। প্রত্যেকে বালকদের জন্য অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। এখানে উল্লেখ্য, তখন ক্যাডেট কলেজের একজন লেকচারের বেসিক পে, সরকারি কলেজ এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন লেকচারের বেসিক পে থেকে বেশি ছিলো। চাকুরির সুযোগ-সুবিধাও উন্নততর ছিলো। মুক্তিযুদ্ধের পর এসব পার্থক্য আর ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। কর্নেল হাসানের সুযোগ্য নেতৃত্বে শুরুতেই নবনিযুক্ত ফ্যাকাল্টি মেম্বররা এক অসাধারণ ট্রেন্ড সেট করতে, অর্থাৎ ধারা প্রবর্তন করতে, সমর্থ হন। ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের ইতিহাসে এঁদের অবদান স্বর্ণাক্ষরে চিরদিন লেখা থাকবে। যে কোনো প্রতিষ্ঠানের, বিশেষ করে তা যদি হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রতিষ্ঠাতা প্রধান নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। তিনি শুরুতে ভালো বা মন্দ যে ট্রেন্ড সেট করবেন প্রতিষ্ঠানটিকে সেটাই অনেকদিন, এমনকি চিরদিন, বহন করতে হয়। কর্নেল হাসানের পর, কর্নেল রহমানসহ চারজন অত্যন্ত দক্ষ প্রিন্সিপাল আমার আগে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন। এসব গুণী ব্যক্তিদের পর আমার মতো একজন অনভিজ্ঞ তরুনের প্রিন্সিপালের দায়িত্ব গ্রহণ সত্যিকার অর্থেই বিরাট চ্যালেঞ্জ ছিলো। ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্টের কথা উল্লেখ করার দাবি রাখে। তা হলো, চতুর্থ শ্রেণীর সর্বকনিষ্ঠ কর্মচারি থেকে শুরু করে প্রথম শ্রেণীর সর্বজ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পর্যন্ত, সকলে ব্যক্তিগতভাবে এবং সমষ্টিগতভাবে কলেজের প্রতি প্রচন্ডভাবে অনুগত ছিলেন। আমি দেখেছি, প্রিন্সিপালের সকল আদেশ তাঁরা কীভাবে শিরোধার্য মনে করে সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সাথে পালন করতেন। কলেজটি প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত হবার কারণে বড় শহরের সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষতিকর প্রভাব ও ঝামেলা থেকে মুক্ত ছিলো। বেশিরভাগ ক্যাডেট আসতো গ্রামীণ অঞ্চল অথবা ছোটো মফস্বল শহর থেকে। ক্যাডেটদের এবং তাদের অভিভাবকদের মধ্যে একরকম গ্রামীণ সারল্য লক্ষ্য করে আমি মাঝেমাঝে হতবাক হয়ে যেতাম। যেমন, কোনো কোনো অভিভাবক প্রিন্সিপালের অফিসে ঢোকার সময় জুতা খুলে ঢুকতেন। আমি চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে হাত ধরে বারণ করার আগেই কাজটি করে ফেলতেন। ক্যাডেটদের অভিভাবকরা ছিলেন, শিক্ষিত-অশিক্ষিত এবং ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে, অত্যন্ত ভদ্র ও বিনয়ী। অপসন্দ হলেও কলেজ কর্তৃপক্ষের সকল আদেশ-উপদেশ হাসিমুখে পালন করতেন। তাঁরা বিশ্বাস করতেন, কলেজ কর্তৃপক্ষ যা কিছু করছে তা সবই তাঁদের সন্তানের মঙ্গলের জন্য। যে কারো জন্য ফার্স্ট টাইম প্রিন্সিপাল হিসেবে কাজ করার জন্য ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ একটি আদর্শ প্রতিষ্ঠন ছিলো। সে জন্য প্রিন্সিপাল হিসেবে ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজে প্রথম নিয়োগ পাবার জন্য আমি নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে করি। কলেজের সহকর্মীরা আমাকে অনেক ট্রিক্স অব দি ট্রেইড শিখতে সাহায্য করেছেন। যা বই পড়ে শেখা যায় না। ১৯৫০ দশকের শেষভাগে তৎকালীন পাকিস্তানে বৃটিশ পাবলিক স্কুলের আদলে ক্যাডেটট কলেজ স্থাপনের কাজ শুরু হয়। মূল উদ্দেশ্য ছিলো, ১১/১২ বছরের ছেলেদেরকে বোর্ডিং স্কুলের পরিবেশে রেখে ক্লাস সেভেন থেকে ক্লাস টুয়েলভ পর্যন্ত, অর্থাৎ এইচএসসি পযর্ন্ত শিক্ষাদান করা। সেইসাথে কিছু এলিমেন্টারি মিলিটারি ট্রইনিং দেওয়া, এবং নেতৃত্বের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক কিছু গুণাবলী বিকাশে সহায়তা করা। যাতে পাশ করে ছেলেরা সশস্ত্রবাহিনীতে কমিশন্ড র্যাং কে যোগদানের জন্য উপযুক্ত এবং উৎসাহিত হয়। সেদিক থেকে বিচার করলে বলা যায়, বাংলাদেশের ক্যাডেট কলেজগুলো সর্বাংশে না হলেও অনেকাংশে সফল হয়েছে, এখনও হচ্ছে বলে আমি মনে করি। ক্যাডেট কলেজ থেকে পাশ করে একটি ছেলে (বা বর্তমানে মেয়েও) যদি সশস্ত্রবাহিনীতে যোগদান করতে আগ্রহী না হয় তা হলেও ক্ষতি নেই বলে আমি মনে করি। অন্য যেকোনো পেশাতেই সে যোগদান করুক না কেনো, সেখানে সে ক্যাডেট কলেজে অর্জিত গুণাবলী দ্বারা অন্যদের তুলনায় অধিকতর অবদান রাখবে বলে আমার বিশ্বাস। যদি কেউ তা না পারে তবে সেটা ক্যাডেট কলেজের ব্যর্থতা নয়, তার ব্যক্তিগত ব্যর্থতা। সেজন্য অনেক কারণ থাকতে পারে। পৃথিবীর অনেক দেশেই স্কুল পর্যায়ের ছেলেমেয়েদের জন্য ক্যাডেট কলেজের মতো রাষ্ট্র পরিচালিত উন্নত মানের স্কুল আছে। যেগুলোকে সেন্টার্স অব এক্সেলেন্স বলা হয়ে থাকে। আমি নিজে চীনদেশে এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেখেছি। অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশেও এমন ব্যবস্থা আছে বলে জেনেছি। রাষ্ট্র এবং সমাজ পরিচালনায় নেতৃত্ব প্রদান করা ডাফার বা অকর্মণ্যদের কাজ নয়। এজন্য দরকার মেধাবী, দক্ষ এবং দেশেপ্রমিক কর্মীর। যারা সকল ক্ষেত্রে যোগ্য নেতৃত্ব প্রদান করবে। এসব সেন্টার্স অব এক্সেলেন্সে ছেলেমেয়েদের নেতৃত্বের প্রয়োজনীয় গুনাবলী, ইংরেজিতে যাকে বলা হয় কোয়ালিটিজ অব হেড, হার্ট এন্ড হ্যান্ড, শিক্ষা দেওয়া হয়। বলে রাখা ভালো, এখানে নেতৃত্ব বলতে শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্ব বুঝায় না। যেকোনো পেশায় উৎকর্ষ অর্জনের জন্য প্রয়োজন সুযোগ্য নেতৃত্বের। যদি একমাত্র মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলের সন্তানের জন্য এসব প্রতিষ্ঠানের দরজা সমানভাবে উন্মুক্ত রাখা হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় খরচে ক্যাডেট কলেজ পরিচালনাতে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। বাংলাদেশে কিছু লোক আছেন যাঁরা ক্যাডেট কলেজের কঠোর সমালোচনা করে থাকেন। এঁদের বেশিরভাগই বিত্তশালী ও শক্তিশালী, যাঁরা নিজেদের বিত্ত ও শক্তি দিয়ে বাংলাদেশে নিজ ইচ্ছামতো সব কিছু কিনতে পারেন বা করিয়ে নিতে পারেন। সুপারিশ বা অর্থের জোরে নিজ সন্তানের জন্য ভর্তির ব্যবস্থা করতে না পেরে এরা ক্যাডেট কলেজের সমালোচনা করেন। অন্য কিছু লোক আছেন যাঁরা নীতিগত প্রশ্ন তুলে ক্যাডেট কলেজের বিরোধিতা করেন। যাঁদের সমালোচনা, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অজ্ঞতাপ্রসূত। বহু বছর আগে, পাকিস্তান আমলে, একজন জ্ঞানী লোকের মুখে আমাদের একটি সামাজিক ব্যাধি সম্পর্কে একটা দামি কথা শুনেছিলাম। কথাটা বর্তমানে মনে হয় অধিকতর প্রযোজ্য। কথাটা হলো: Too many people talk too much on subjects they know too little. আমি ১৯৭৮ সনের ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৮০ সনের মে মাসের প্রথম ভাগ পর্যন্ত ঝিনাইদহে দায়িত্ব পালন করি। সময়টা অল্প হলেও এ সময়ে বেশ কিছু ঘটনা ঘটে যা পাঠকের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে। সব ঘটনা তো বলা যাবে না। পরবর্তীত তার মধ্য থেকে কয়েকটি মাত্র উল্লেখ করার ইচ্ছা রাখি।

Monday, November 11, 2013

ক্যাডেট কলেজের টুকরো স্মৃতি

২০০০ সনের জানুয়ারিতে অবসরে যাবার আগ পর্যন্ত তেত্রিশ বছর সেনাবাহিনীতে চাকুরি করেছি। এর মধ্যে প্রায় পাঁচ বছর ক্যাডেট কলেজে কাজ করেছি। চাকুরির একেবারে শুরুতে এক বছর পাকিস্তানের মিলিটারি কলেজ ঝেলামে জুনিয়র একাডেমিক ইন্সট্রাক্টর হিসেবে চাকুরি করেছি। পরে চাকুরির ১১/১২ বছরের মাথায় চার বছর একনাগারে ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ এবং ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করেছি। এ সময়ে অনেক কিছু দেখেছি, শুনেছি, শিখেছি, অনুভব করেছি, কিছুটা অভিজ্ঞতাও হয়েছে। তার কিছু কিছু অংশ পাঠকদের সাথে শেয়ার করার তাগিদ অনুভব করছি। গল্পচ্ছলে যখন আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবদের কাছে এসব দিনের কোনো ঘটনা বলি, তখন কেউ কেউ সেগুলো লিখে প্রকাশ করার জন্য অনুরোধ করেন। তাঁদের যুক্তি: এগুলো বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা। ভবিষ্যতের আভিভাবক, শিক্ষক, এমনকি ক্যাডেটরা পড়ে উপকৃত হতে পারে। সামরিক বাহিনীতে চাকুরি করার সময়ে রোজনামচা বা ডাইরি লেখার অভ্যাস বজায় রাখা নিরাপদ নয়, বিশেষ করে আমাদের মতো দেশে। স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারলেও স্বাধীনভাবে বলা বা লেখা খুব ঝুঁকিপূর্ণ। ১৯৭১ সনের পূর্বে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে চাকুরি করার সময়ে একজন বাংগালি অফিসারের জন্য কাজটি যারপরনাই বিপজ্জনক ছিলো। তাই চাকুরি জীবনের শুরু থেকে ডাইরি লেখার অভ্যাস গড়ে উঠেনি। যা কিছু লিখছি তার সবটাই স্মৃতি থেকে। দিন, তারিখ, সময়ের হেরফের হতে পারে। লোকজনের নাম ভুল হতে পারে। বোধগম্য কারণে কোনোকোনো লোকের সঠিক নাম আড়াল করে ছদ্মনাম ব্যবহার করতে হয়েছে।

আমি ইতিহাস লিখতে বসিনি। আমি লিখছি আমার নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা। সাধারণ বিবেচনায় এগুলো নৈমিত্তিক ঘটনা হলেও আমার কাছে, তখন মনে না হলেও, এখন মনে হয় এর মধ্যে কিছু অসাধারণ ঘটনা ছিলো। যদিও সব ঘটনার নায়ক বা ভিলেন আমি নিজে নই। কখনও কখনও পার্শ্ব চরিত্র হিসেবে ঘটনার স্বাক্ষী ছিলাম। তাই বর্ণনাতে ‘আমি’র আধিক্য থাকাটা স্বাভাবিক হলেও উদ্দেশ্য আত্মপ্রচার নয়। আশা করি পাঠক ক্ষমা করবেন। প্রয়োজনে যাতে সহজে উল্লেখ করা যায় সেজন্য বর্ণিত ঘটনাগুলোকে একটি করে শিরোনাম ও ক্রমিক নম্বর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।

মিলিটারি কলেজ ঝেলাম: পর্ব ১ বাংগালির উর্দু শেখা

১৯৬৭ সনের আগস্ট মাসের ২৭ তারিখে পি এম এ’র (পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি) ট্রেইনিং শেষ করে পাকিস্তান আর্মির এডুকেশন কোরে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে পার্মানেন্ট রেগুলার কমিশন লাভ করি। পাসিং আউটের পর ছুটি কাটিয়ে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি আমার জীবনের প্রথম ইউনিট মিলিটারি কলেজ ঝেলামে যোগদান করি। এখানে মিলিটারি কলেজ ঝেলাম সম্পর্কে কিছু বলাটা আশা করি অপ্রাসংগিক হবে না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বৃটিশ গভর্নমেন্টের পক্ষে অনেক ভারতীয় সৈনিক যুদ্ধ করে প্রাণ হারিয়েছিলো। প্রধানত: সেসব নিহত সৈনিকদের ছেলেদেরকে সরকারি খরচে লেখাপড়া শিখিয়ে সৈনিক বানাবার লক্ষ্যে বৃটিশ সরকার ১৯২২ সনে (পাকিস্তানের) ঝেলামে মুসলমানদের জন্য এবং (ভারতের) দেরাদুনে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য দু’টি পৃথক আবাসিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করে। নাম দেওয়া হয় কিং জর্জ রয়েল মিলিটারি স্কুল। ১৯২৫ সাল থেকে স্কুল দু’টোর কার্যক্রম শুরু হয়। সাধারণ বেসামরিক স্কুলের সিলেবাস অনুযায়ী ক্লাস এইট পর্যন্ত পাঠদানের পাশাপাশি এলিমেন্টারি মিলিটারি ট্রেইনিং দেবার ব্যবস্থা রাখা হয়। অত্যন্ত পারদর্শিতা অর্জনকারীকে কমিশন প্রদানের জন্য নির্বাচন করা হতো। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ঝেলামের স্কুলটির নাম পাল্টে মিলিটারি কলেজ ঝেলাম রাখা হয়। প্রচলিত বোর্ডিং স্কুলের মত এটিকে একটি ইন্টারমিডিয়েট কলেজে (দ্বাদশ শ্রণী পর্যন্ত) উন্নীত করা হয়। অনেকটা বর্তমানের ক্যাডেট কলেজের মত। পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর ইতিহাসে এই কলেজের প্রাক্তন ছাত্ররা আজ পর্যন্ত অতি গৌরবময় দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ ও শৌর্যবীর্যের স্বাক্ষর রেখে আসছে। পাকিস্তানের একাধিক আর্মি চীফ, নেভি চীফ ও এয়ার চীফ এই কলেজের প্রাক্তন ছাত্র। পাকিস্তানের বর্তমান (২০১৩) আর্মি চীফ জেনারেল আশফাক পারভেজ কায়ানী এই কলেজের একজন প্রাক্তন ছাত্র, যাকে ১৯৬৭ সনে ক্লাসরুমে পড়াবার সুযোগ আমার হয়েছিলো।

আমি যখন যোগদান করি তখন মিলিটারি কলেজ ঝেলামে ছাত্র, যাদেরকে সরকারিভাবে ক্যাডেট বলা হতো তাদের, সংখ্যা ছিলো কমবেশি ৩০০। হাউস (হোস্টেল) ছিলো ৪টি। এর মধ্যে শের শাহ নামক একটি হাউসে একেবারে নতুন আসা ক্লাস এইটের ক্যাডেটদের রাখার ব্যবস্থা ছিলো। অন্য তিনটি হাউসে বাকি ক্লাসের ক্যাডেটদের মোটামোটি সমানভাবে ভাগ করে রাখা হতো। অমি যখন ছিলাম তখন এই প্রতিষ্ঠানে বাংগালি আর কোনো অফিসার বা কর্মচারি ছিলো না। ক্যাডেট ছিলো মাত্র চারজন। এর মধ্যে দু’জন আপন ভাই নিচের ক্লাসে পড়তো, যাদের বাবা ছিলেন সিলেটি, মা ইউরোপিয়ান। দু’জনের কেউ বাংলা এক শব্দও বলতে পারতো না। বাকি দু’জন পড়তো ক্লাস টুয়েলভে। ভালো বাংলা বলতে পারতো। ওদের বাবারা পাকিস্তান আর্মিতে অফিসার ছিলেন। সুযোগ পেলে কখনও কখনও লুকিয়ে ওদের সাথে বাংলায় দু’য়েক কথা বলতাম। যথাসময়ে ওরা দু’জন আর্মিতে কমিশন লাভ করেছিলো। বাংলাদেশে এসে অবসরে যাবার আগে একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অন্যজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল হতে পেরেছিলো। যাহোক, আমার দায়িত্ব ছিলো ক্লাসরুমে আমার নিজের সাবজেক্ট কেমিস্ট্রি এবং সাধারণ বিজ্ঞান পড়ানো। সেইসাথে শের শাহ হাউসের এসিস্ট্যান্ট হাউস টিউটরের দায়িত্ব পালন করা। এছাড়া ফটোগ্রাফি ক্লাব, মিউজিক ক্লাব এবং ফুটবল আর সাঁতারের ভারপ্রপ্ত অফিসার করা হলো আমাকে। হাইকিং ক্লাবের সাথেও আমাকে যুক্ত করা হলো। মজার কথা হলো, এসবের মধ্যে শুধু ফটোগ্রাফি ও সাঁতার সম্বন্ধে আমার কিছু ধারণা ছিলো। তারপরও মিউজিক আর ফুটবলের দায়িত্ব এড়ানো গেলো না। পাকিস্তানিদের বিশ্বাস ছিলো, তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের সকল তরুন জন্মগতভাবে গান আর ফুটবলের বিশেষজ্ঞ হয়ে থাকে ! সকল দায়িত্ব পালনে দেহমন উজাড় করে দিয়ে লেগে গেলাম, যেমনটা সকল সেকেন্ড লেফটেন্যান্টরা করে থাকে।

প্রথমেই হোচট খেতে হলো ভাষা নিয়ে। ক্লাসরুমে পড়ানোসহ ক্যাডেটদের সাথে, এবং অফিসারদের সাথে সকল ফর্মাল কথাবার্তা ইংরেজিতে করতে হয়। অনানুষ্ঠানিক দু’য়েক কথা উর্দুতেও বলা যায়। বাংলা সম্পূর্ণ অচল। বাংলা বলাটা ছিলো গুনায়ে কবিরা। ভুলে দু’য়েক কথা মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেলে আসেপাশের সবাই ‘কেয়া বোলা, কেয়া বোলা তুমনে’ বলে হৈহৈ করে উঠতো। আমার ইংরেজি উচ্চারণ পদ্মাপাড়ের উচ্চাড়ণ। বিশেষ করে ইংরেজি অক্ষর ‘জে’ (এবং জিওমেট্রির ‘জি’) এবং ‘জেড’ এর উচ্চারণ নিয়ে মহাবিপদে পড়েছিলাম। বাংলা ভাষায় তফাৎ না থকলেও উর্দু ভাষায় এ দু’টোর উচ্চারণগত পার্থক্যের কারণে অর্থের পার্থক্য ইংরেজির মতোই প্রবল। পাকিস্তানি এক সহকর্মী যিনি ইংরেজি ভাষার শিক্ষক ছিলেন বুদ্ধি ও অভয় দিয়ে বললেন, ছোট একটি রেডিও কিনে নাও। বেশি করে রেডিওতে বিবিসি শোন। টেইপ রেকর্ডার কিনে নিজের কথা বারবার বাজিয়ে শোন। উচ্চারণে কোথায় ভুল হচ্ছে লক্ষ্য করো। তাহলেই দেখবে ইংরেজি বলাটা রপ্ত হয়ে যাবে। তাছাড়া, তোমার লেখা পড়ে মনে হয়, ইংরেজি ভাষাটা তো তুমি ভালোই জানো। সমস্যা হবে না। কথা ঠিক। অল্প দিনের মধ্যে ওস্তাদের কথামত সমস্যা বহুলাংশে কেটে গেলো।

মহা সমস্যা হলো উর্দু নিয়ে। সৈনিকদের সাথে, বেয়ারা-বাবুর্চির সাথে, বাজারে দোকানদারের সাথে, রাস্তায় টাংগাওয়ালার সাথে উর্দু অথবা পাঞ্জাবি ছাড়া উপায় নাই। পাঞ্জাবি শেখা বাদ দিয়ে উর্দু শেখার উদ্যোগ নিলাম। এর অন্য আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিলো। যেসব তরুণ রেগুলার কমিশন্ড অফিসারের মেট্রিক পর্যায়ে উর্দু ভাষা ছিলো না, তাদের জন্য চাকুরির প্রথম দু’বছরের মধ্যে আর্মি পরিচালিত সমমানের পরীক্ষায় পাশ করা জরুরি ছিলো। যতদিন পাশ না করতো ততদিন চাকুরি স্থায়ী করা হতো না। আর্মির পরীক্ষায় লিখিত এবং মৌখিক আলাদা আলাদা দুই পেপার ছিলো। টেনেটুনে লিখিত পেপারে পাশ করলেও ৯৫% পরীক্ষার্থী, তা সে বাংগালি, পাঞ্জাবি, পাঠান যে জাতিরই হোক না কেনো, মৌখিক পেপারে ফেল করতো ! বলা হতো, পরীক্ষা নেয়ার ফী হিসেবে অনেক বেশি টাকা আয় করার জন্য পরীক্ষকরা এমনটা করতেন। যাহোক, আমি সর্বশক্তি দিয়ে উর্দু বলা, পড়া ও লেখা শেখার চেষ্টা শুরু করে দিলাম। কারণ, মেট্রিকে আমার উর্দু পড়া হয়নি, তার বদলে পড়েছিলাম আরবি। এতে একটা সুবিধা হয়েছিলো। উর্দুর অক্ষরগুলো নতুন করে চিনতে হয়নি। তবে বাধার হিমালয় ছিলো অন্যখানে। বাজারি উর্দু বলা খুবই সহজ। ইংরেজি, হিন্দি মিলিয়ে গ্রামারের পরোয়া না করে জগাখিচুরি কিছু একটা বলে ফেললেই হলো। কেউ মাইন্ড করে না। কিন্তু কেতাবি উর্দু বলা যে কতো কঠিন, তা একমাত্র ভুক্তভোগী জানে। একদিকে বড় কাফ-ছোট কাফ, আইন-গাইন, জ্বীম-জাল-জে-জোয়া, বড় হে-ছোট হে, তে-তোয়া ইত্যাদি বর্ণসমূহের মধ্যে উচ্চারণগত সূক্ষ পার্থক্য আয়ত্ব করার চাইতে পাথর চিবিয়ে খাওয়া সহজ। তার পরেও কথা আছে। উচ্চারণ হয়তবা ঠিক হলো, ব্যাকরণ ? সেটা তো প্রায় কুকুরের লেজ সোজা করার মতো কঠিন। মনে আছে, একবার ক্যাডেটদের নিয়ে বাইরে কোথাও গিয়েছিলাম। ফেরত আসার সময় বাস এলো। আমি ছেলেদের লক্ষ্য করে যেইনা বলেছি, চলো, বাস আগিয়া, অমনি সবাই এতো জোরে অট্টহাসি করে উঠলো যে আমি মহাআহাম্মক বনে গেলাম। আমার আপরাধ, বলা উচিত ছিলো, বাস আগেয়ি। যার কারণ আমি আজও বুঝি না। বাস তো প্রাণী নয় যে এর জেন্ডার খুঁজতে হবে ! কর্তার টেন্স, জেন্ডার, নাম্বার ভেদে বাক্যের ভিতর ক্রিয়াপদের যে রূপান্তর হয়, যাকে ইংরেজিতে কনজুগেশন বলে, তার হদিস রাখা, মানুষ তো দূরের কথা, দেবতার পক্ষেও হয়তো সম্ভব নয় ! এর পর রয়েছে ভোক্যাব্যুলারি অর্থাৎ নতুন নতুন শব্দ শেখার সমস্যা। ঝেলাম বাজারে মাগুর মাছ দেখে খাবার শখ জাগলো। মেসে এসে বাবুর্চিকে বললাম মাগুর মাছ এনে রান্না করতে। বুড়ো পাঞ্জাবি বাবুর্চি লাল খান চোখ কপালে তুলে বললো, সাব, হাম মাগর মাছ নেই খাতে। উয়োহ তো হারাম হায়। বাংগাল মে তোমলোগ খাতেহো ? পরদিন সকালে অফিসে গিয়ে এক পাঞ্জাবি কলিগের কাছ থেকে বুড়োর অবাক হবার কারণ বুঝলাম। উর্দুতে মাগর মাছ মানে কুমির ! সে সময় ঢাকা শিক্ষা বোর্ড মহাত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়। তারা বাংগালি আর্মি অফিসারদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা হিসেবে শুধুমাত্র উর্দু ভাষার মেট্রিক পরীক্ষা নেবার ব্যবস্থা রেখেছিলো। কেবলমাত্র লিখিত পরীক্ষা যাতে বেশিরভাগ প্রশ্নের উত্তর বাংলায় লিখে সহজে পাশ করা যেতো। অবশেষে আমি আরও অনেক বংগসন্তানের মতো ঢাকায় এসে সেই পরীক্ষা দিয়ে পাশ করে নিজের মান রক্ষা করি।

-------------
মিলিটারি কলেজ ঝেলাম: পর্ব ২
লেফটেন্যান্ট ফিশ!

আগেই বলেছি, মিলিটারি কলেজে জয়েন করার পরপরই আমাকে ক্লাসরুমে নিজের সাবজেক্ট পড়ানো ছাড়া ফটোগ্রাফি, মিউজিক, ফুটবল ও সুইমিং ক্লাবের অফিসার-ইন-চার্জ (ও আই সি) নিয়োগ দেওয়া হয়। ছাত্রজীবনে ছবি তোলার শখ ছিলো। তখন ছিলো সাদাকালো ছবির জমানা। ফিল্ম ডেভেলপ ও প্রিন্ট করা সম্বন্ধে কিছু ধারণা ছিলো। কলেজ লাইব্রেরিতে ফটোগ্রাফির উপর ভালোভালো বই ছিলো। সেসব পড়ে মোটামুটি কাজ চালিয়ে নিলাম। সাঁতার ভালোই জানতাম। সেকথায় পরে আসছি। মিউজিক ক্লাবে বেশিরভাগ ছেলে ছিলো কলেজ ব্যান্ডের সদস্য। যার জন্য আর্মি থেকে আসা ব্যান্ড ইন্সট্রাক্টর ছিলো। এছাড়া বাহির থেকে একজন সিভিলিয়ান গানের মাস্টার সপ্তাহে একদিন এসে ছেলেদের সা-রে-গা-মা শেখাতেন। এই বৃদ্ধ ভদ্রলোককে আমি কখনও হারমনিয়াম আর ঢোল ছাড়া অন্য কিছু বাজাতে দেখিনি। আর্মি স্কুল অব ফিজিক্যাল ট্রেইনিং এন্ড স্পোর্টস থেকে পাশ করে আসা হাবিলদাররা ফুটবলসহ অন্যান্য গেইম ও সাঁতার শেখাতো। আমার কাজ ছিলো এসবের সমন্বয় ও তত্বাবধান করা।

এবার আসি সাঁতারের কথায়। আমার বয়স যখন সাত কি আট বছর তখন মামা বাড়ি গেলে আমার ছোটো মামা আমাকে একটি বিশেষ সাঁতারের কৌশল শেখান, যা মামা নিজেও খুব ভালো জানতেন। দুই হাত পিঠের পেছনে নিয়ে কব্জি বরাবর একটি ছোটো রশি বা গামছা দিয়ে একসাথে বেঁধে দিতেন। তারপর দুই পা’র গোড়ালি বরাবর একসাথে গামছা দিয়ে বেঁধে আমাকে দু’তিনজন মিলে ঘাড়ে করে নিয়ে পুকুরে ছেড়ে দিতেন। আমি বহাল তবিয়তে ধীরেধীরে সাঁতার দিয়ে দূরত্ব অতিক্রম করতাম। কখনও চিৎসাঁতার, কখনও বুকসাঁতার দিতাম। হাত-পা বাধা অবস্থায় মাঝেমাঝে চিৎ হয়ে বুকের উপর চারখানা থান ইট নিয়ে সাঁতার দিয়ে বন্ধুদের চমৎকৃত করে দিতাম। ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীন সময় পর্যন্ত এই বিশেষ সাঁতাররে চর্চাটা অব্যাহত রেখেছিলাম।

মিলিটারি কলেজে আমার সহকর্মী বেশ ক’জন অবাংগালি অফিসার ছিলেন যাঁরা সাঁতার জানতেন না, পানিকে যমের মতো ভয় করতেন। একদিন কথাচ্ছলে তাঁদেরকে সাহস যোগাবার জন্য বললাম, সাঁতরানো কোনো কঠিন কাজ নয়। আমাকে হাত-পা বেঁধে পানিতে ছেড়ে দিলেও সাঁতরাতে পারি। কথাটা ওরা মোটেও বিশ্বাস করলেন না। বললেন, জানি তোমরা ইস্ট পাকিস্তানিরা পানির দেশের মানুষ। সবাইকে সাঁতার জানতে হয়। তাই বলে অতটা বাহাদুরি করো না। কথাটা আমি পরে ভুলে গেলেও ওরা ভুলেননি। এর ক’দিন পর কিছু ক্যাডেট নিয়ে আমরা মংলা ড্যামে বেড়াতে গেলাম। আমাকে অবাক করে দিয়ে সেই সহকর্মীরা দু’টুকরা রশি বের করে বললো, এবার তোমার কথা রাখো। আমরা তোমার দু’হাত পেছনে বেঁধে দেবো, সেই সাথে দু’পা গোড়ালিতে একসাথে বেঁধে দিয়ে লেকের পানিতে ছেড়ে দেবো। ভয় পেয়ো না, আটজন দক্ষ সাঁতারু হাবিলদার এবং ক্যাডেট তোমাকে ঘিরে রাখবে, তুমি যাতে ডুবে না মরো। তোমাকে মেরে আমরা কোর্টমার্শালে যেতে চাই না। বাংগালি পৌরুষের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছোড়া হয়েছে ! বললাম, কবুল ! তা-ই করো। ভয় নেই, আমি ইনশাল্লাহ মরবো না। তোমরা বিপদে পড়বে না। কথামতো প্রায় চল্লিশ মিনিট সাঁতরালাম, তার মধ্যে কিছুক্ষণ বুকের উপর চারখানা থান ইট নিয়ে। যখন আমাকে পানি থেকে টেনে তোলা হলো, তখন সে কী আনন্দ আর চিৎকার। রাতারাতি হিরো হয়ে গেলাম। বিশেষ করে ক্যাডেটদের কাছে।

ঝেলাম এবং নিকটস্থ খাড়িয়া ক্যান্টনমেন্টে খবরটা বাতাসের বেগে ছড়িয়ে গেলো। এরিয়া কমান্ডার শুনতে পেয়ে ভাবলেন, তাঁর এরিয়াতে বহু অবাংগালি অফিসার আছেন যাঁরা সাঁতার জানেন না। পানিকে যমের মতো ভয় পান। কিছুদিন আগে এক্সারসাইজের সময় প্রায় হাটু পানিতে ডুবে একজন ইনফ্যান্ট্রির ক্যাপ্টেইন মারা যান। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, অসাতারুদের ভয় ভাংগানোর জন্য, পরবর্তী রবিবার (সাপ্তাহিক ছুটির দিন) বিকেলে মিলিটারি কলেজের সুইমিং পুলে লে: আশরাফের সুইমিং প্রদর্শণীর ব্যবস্থা কর হোক। সকল অফিসার সস্ত্রীক আমন্ত্রিত। বাচ্চারা বিশেষভাবে আমন্ত্রিত। নির্ধারিত দিনে সুইমিং পুলে মহাআয়োজন। চর্তুদিকে সামিয়ানা টাংগানো হয়েছে। সকল বয়সের অফিসার, তাঁদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যাগণ, কলেজের ক্যাডেটগণ, স্টাফ, সব মিলিয়ে অনেক লোকের সমাগম। কলেজের ব্যান্ড বাদ্য বাজাচ্ছে। কাবাব, স্যান্ডউইচ, সামুসাসহ নানা ধরনের মুখরোচক স্ন্যাকস। সাথে চা, কফি, সোডা। সেই সাথে চলছে মাইকের ঘোষণা। নির্ধারিত সময়ে চারজন তাগড়া হাবিলদার, যেমন করে লাশ কাঁধে করে বহন করে তেমন করে, আমাকে কাঁধে বয়ে নিয়ে আসলো। আমার পরনে শুধু একটি জাংগিয়া, যাকে ভদ্র ভাষায় বলে সুইমিং কস্টিউম। মনে হচ্ছিলো আমি যেনো সার্কাসের কোনো জন্তু ! আমাকে দেখামাত্র উপস্থিত সবাই, বিশেষ করে মহিলা ও বাচ্চারা উত্তেজনায়, আনন্দে এবং আতংকে চিৎকার হাততালি দিতেদিতে দাঁড়িয়ে গেলো। আমি নিজেও হাবিলদারদের কাঁধে শুয়ে কেমন যেনো শিহরণ অনুভব করছিলাম। হাবিলদাররা ধীরেধীরে স্লো মার্চ করে পুলরে পারে এসে আমাকে ঝুপ করে পানিতে ফেলে দিলো। অন্য সময় সাথেসাথে পানি থেকে মাথা বের করে নি:শ্বাস নেই, সাঁতার করি। এবার একটু সাসপেন্স করার জন্য বেশ কিছুক্ষণ পানির নিচে মাথা ডুবিয়ে রাখলাম। পরে শুনেছি, যতক্ষণ আমি ডুব মেরে ছিলাম ততক্ষণ উপস্থিত দশর্করা সবাই ভয়ে, আতংকে নির্বাক হয়েছলো। তারপর যখন মাথা বের করলাম তখন কী গগনবিদারী চিৎকার। সাবাস, আশরাফ। সাবাস, বাংগালি। কেউ একজন বলে উঠলেন, ইয়ে তো ইনসান নেহি হায়, মছলি হায়। ব্যাস, সেদিন থেকে আমার নিকনেইম হয়ে গেলো লেফটেন্যান্ট ফিশ ! ওভারনাইট হিরো হয়ে গেলাম। শনিবার সন্ধ্যায় অফিসার্স ক্লাবে গেলে শুনতে পেতাম আমাকে দেখিয়ে লোকজন বলাবলি করছে, দেয়ার গো’জ লে: ফিশ।

--------------- মিলিটারি কলেজ ঝেলাম: পর্ব ৩
শাসন করা তারই সাজে ---

“ফায়ার ! ফায়ার ! আগ লাগি হ্যায় ! সব বাহার আ-যাও!” পড়াশুনা করে, রেকর্ডপ্লেয়ারে গান শুনে সবে ঘুমিয়েছি। রাত্রি দু’টা-তিনটা হবে। চারদিক থেকে আসা হঠাৎ এমন তীব্র চিৎকারে ঘুম ভেংগে গেলো। অফিসার মেসে নিজের রুমে একা ছিলাম। ( কখনও একরুমে দু’জন সিংগল ফিসারকেও থাকতে হতো।) ধরফরিয়ে উঠে কাপড় পাল্টে দরজা খুলে বাইরে এলাম। পূব-পশ্চিমে টানা কলেজের মেইন রোড ধরে অনেক লোক, যার মধ্যে কোনো ক্যাডেট ছিলো না, পশ্চিম দিকে ছুটছে। সবার মুখে এক চিৎকার, আগ লাগি হ্যায়। পশ্চিম দিকে তাকিয়ে দেখলাম আকাশে আগুনের সুউচ্চ লেলিহান শিখা। ওদিকে ক্যাডেটদের আবাস হিসেবে বাবর হাউস এবং গজনবি হাউস নামে দু’টি হাউস রয়েছে। বলা তো যায় না ! স্লিপার পায়েই ছুটলাম পশ্চিম দিকে। পথে কলেজের কম্যানড্যান্ট কর্নেল মর্তুজাকে (লে: কর্নেল মর্তুজা হোসেন, এ ই সি) খুড়িয়েখুড়িয়ে একই দিকে যাচ্ছেন। পড়নে স্লিপিং স্যুট (বৃটিশ এটিকেট অনুযায়ী স্লিপিং স্যুট পড়ে বেডরুমের বাউরে আসা মহা গুনাহের কাজ !)। দেখামাত্র আমি ফৌজি তরিকায় ‘উইশ’ করলাম, অর্থাৎ “স্লামালেকুম, স্যার” বলে চিৎকার করে উঠলাম। তিনি আতংকিত কন্ঠে বললেন, “ভাই, কওন হো তোম ? ম্যায় জলদি মে আয়নাক (চশমা) ভুল গেয়া। তোম মুঝে যারা সাথ লে চলো।” ইতোমধ্যে কেউ একজন দৌড়ে এসে যা বললো তার সারাংশ হলো: কলেজের পশ্চিম প্রান্তে সীমানা প্রাচীর ঘেঁসে যে গো-খামার রয়েছে সেখানকার খরের গাদায় কে বা কারা আগুন লাগিয়েছে। কম্যানড্যান্টকে নিয়ে আস্তে আস্তে সেখানে গিয়ে দেখলাম আগুন ততক্ষণে নিভে গেছে। কিছু লোক ভীড় করে আছে। গেইটের বাইরে ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি এসে গেছে। অন্য সময় লাইটস আউটের পর সব হাউসে দু’য়েকজন ক্যাডেটকে টয়লেটে যাওয়াআসা করতে দেখা গেলেও সেদিন রাতে একজন ক্যাডেটকেও রুমের বাইরে দেখা গেলো না। হাউসগুলো মনে হচ্ছিলো জনমানবহীন ভূতের বাড়ির মতো।

ক্যাডেট কলেজের মতো মিলিটারি কলেজেও সপ্তাহে একদিন ক্লাস শুরুর আগে এসেম্বলি বা সমাবেশ হতো। তাতে সকল ক্যাডেট ও শিক্ষককে উপস্থিত থাকতে হতো। অগ্নিকান্ডের পরের দিন নরমাল এসেম্বলি ছিলো না, বিশেষ এসেম্বলি ডাকা হলো। সবার মুখ গম্ভীর। চতুর্দিকে থমথমে ভাব। কী জানি, কম্যানড্যান্ট তাঁর বক্তৃতায় অপরাধীদের জন্য কী কঠোর শাস্তি ঘোষণা করেন। যথারীতি কুর’আন থেকে আবৃত্তির পর কম্যানড্যান্ট মঞ্চে উঠলেন। ধীর-স্থিরভাবে চারদিকে একবার চোখ ফিরিয়ে নিলেন। চেহারা বা কন্ঠে রাগ বা উত্তেজনার লেশমাত্র নেই। তারপর বললেন: My dear boys, I understand last night some of you wanted to cut a joke with me. I do appreciate your sense of humor. It is only the intelligent people who can cut good jokes. But, my boys, I have a request to make. Before you cut a joke you should also consider the age of the person concerned. For an old man like me a joke like the one you had last night might be too dangerous to bear with. Next time when you cut such a joke, please keep my age in mind. Thank you. College Captain, carry on, please.এসেম্বলি শেষ। ক্যাডেটরা ক্লাসে চলে গেলো। আমরা ইয়ং আফিসাররা খুব হতাশ হলাম। ক্যাডেট কলেজে সাধারণত ক্লাস ইলেভেনের ছেলেরা, যারা প্রায়শ ইয়ং ইন্সট্রাক্টরদের কর্তৃত্ত মানতে চায় না, বড় ধরনের কান্ড ঘটিয়ে থাকে। এরা কোনো কারণে বড় শাস্তি পেলে ইয়ং ইন্সট্রাক্টররা মনেমনে পুলকিত হয়। যাহোক, আমরাও হতাশ হয়ে যারযার কাজে ফিরে গেলাম।

কম্যানড্যান্ট কর্নেল মর্তুজা ব্যক্তি জীবনে চিরকুমার ছিলেন। প্রথম যৌবনে প্রেমে ব্যর্থ হবার পরিণতি। ছেলেমেয়ে একদম পসন্দ করতেন না বলে রটনা ছিলো। যা সঠিক ছিলো না। যাহোক, সপ্তাহখানেক পরের কথা। ক্লাস ইলেভেনের চারপাঁচজন ক্যাডেট নিয়মানুযায়ী এডজুট্যান্টের অফিসে গিয়ে কম্যানড্যান্টের সাক্ষাৎকার চাইলো। এডজুট্যান্ট কারণ জানতে চাইলেন। ছেলেরা বললো, আপনাকে কারণ বলা যাবে না। যা বলার সরাসরি কম্যানড্যান্টকে বলবো। কম্যানড্যান্ট ছেলেদেরকে তাঁর অফিসে আসার অনুমতি দিলেন। সাথে এডজুট্যান্টকে থাকতে বললেন। বলা তো যায় না, পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়। ছেলেগুলো কম্যানড্যান্টের অফিসের দরজায় গিয়ে ‘উইশ’ করে হুড়মুড় করে, কেউ চেয়ারের তল দিয়ে, কেউ টেবিলের তল দিয়ে কম্যানড্যান্টের পায়ের উপর হুমরি খেয়ে পড়লো। সবাই উচ্চস্বরে কাঁদতেকাঁদতে বললো: স্যার, উই ডিড ইট। উই পুট দি হে স্ট্যাক অন ফায়ার। প্লিজ ফরগিভ আস। উই আর রিয়ালি ভেরি সরি ফর দি ট্রাবল উই গেইভ ইউ। উই শ্যাল নেভার ডু ইট এগেইন। প্লিজ ফরগিভ আস দিস টাইম। কম্যানড্যান্ট চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সবাইকে বুকে জড়িয়ে ধরে নিজেও কাঁদতে লাগলেন। হাপুস নয়নে সবার সে কি কান্না ! কিছুক্ষণ কান্নাকাটির পর কম্যানড্যান্ট কিছুটা স্থির হয়ে বললেন: বয়েজ, ইউ আর মাই চিল্ড্রেন। আই ফরগেইভ ইউ দি ডে আই এড্রেসড ইউ। আই এম হ্যাপি টু সি দ্যাট ইউ আর রিপেন্ট্যান্ট। দ্যাট’স লাইক গুড বয়েজ। আই এম প্রাউড অব ইউ। কাম অন মাই সান্স, নাউ স্মাইল ! ছেলেরা তাঁর পা ছুঁয়ে সালাম করে চোখে পানি, ঠোটে হাসি নিয়ে বেরিয়ে আসলো। তারপর কর্নেল মর্তুজা যতদিন ছিলেন ততদিন মিলিটারি কলেজে ছেলেরা তেমন কোনো বড় ঘটনা ঘটিয়েছে বলে শোনা যায়নি।


সেদিনের সে ঘটনা আমার জীবনে গভীর রেখাপাত করেছিলো। সারা জীবনের জন্য আমাকে যেনো চোখে আংগুল দিয়ে শেখালো: “শাসন করা তারই সাজে সোহাগ করে যে গো।” -------------
মিলিটারি কলেজ ঝেলাম: পর্ব ৪
আমার গুরু কর্নেল মর্তুজা

আগেই বলেছি, মিলিটারি কলেজে জয়েন করার সাথেসাথে আমাকে প্রশাসনিক কাজের জন্য শের শাহ হাউসে এসিট্যান্ট হাউস টিউটর নিয়োগ করা হলো। শের শাহ হাউসের হাউস মাস্টার ছিলেন মি: ফজলুল হক হায়দ্রি। সিনিয়র সিভিলিয়ান ইন্সট্রাক্টরদের মধ্যে অন্যতম একজন। বাচ্চ্দের জন্য চমৎকার একজন ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন। সমবয়সী হবার কারণে কম্যানড্যান্ট কর্নেল মর্তুজার ব্যক্তিগত বন্ধু ছিলেন। প্রশাসনিক অনেক সিদ্ধান্ত নিতে কম্যানড্যান্টের উপর প্রভাব বিস্তার করতেন। পরে বুঝতে পেরেছিলাম হায়দ্রী সাহেবের একান্ত আগ্রহে আমাকে ওনার অধীনে শের শাহ হাউসে এসিট্যান্ট হাউস টিউটর নিয়োগ করা হয়েছিলো। এর আগে আর কোনো আর্মি অফিসারকে ওনার আন্ডারে নিয়োগ করা সম্ভব হয়নি। কারণ, হায়দ্রী সাহেবের অফিসিয়াল স্ট্যাটাস ছিলো ক্লাস টু গেজেটেড অফিসার। একজন আর্মি অফিসারকে ক্লাস ওয়ান গেজেটেড অফিসার হবার কারণে হায়দ্রী সাহেবের অধীনে নিয়োগ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। হায়দ্রী সাহেব আমার জুনিয়রিটির সুযোগ নিয়েছেন। অল্প দিনের মধ্যে বিষয়টি বুঝতে পারলাম। একজন বন্ধু ভাবাপন্ন সিনিয়র পাঞ্জাবি কলিগের সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বললাম। তিনি বললেন, কাজটি অবশ্যই বেআইনি হয়েছে। তোমার প্রতি অবিচার করা হয়েছে। আমি তাঁকে প্রশ্ন করলাম, কেনো তাঁরা কম্যানড্যান্টকে একাজ থেকে বিরত থাকতে বললেন না। জবাবে তিনি যা বললেন তা আমার সারা জীবনের জন্য শিক্ষা হয়ে আছে। তনি বলেছিলেন, প্রথমত: কাজটি করার আগে কম্যানড্যান্ট কোনো আর্মি অফিসারের পরামর্শ চাননি। দ্বিতীয়ত: আর্মিতে আগ বাড়িয়ে কেউ কারও জন্য কথা বলে না। যার কথা তাকেই বলতে হয়। আমরা ভাবলাম, তুমি যদি ব্যাপারটা মেনে নেও তাহলে আমরা বলার কে ? আর, তুমি যদি না মানো তাহলে প্রচলিত আইনই তোমাকে বলে দিবে তোমার কী করতে হবে।

ক’দিন ভেবেচিন্তে অবশেষে একদিন হায়দ্রী সাহেবকে বিনয়ের সাথে বললাম যে, আমার পক্ষে আর তাঁর হাউসে কাজ করা সম্ভব নয়। তিনি যেনো বিকল্প ব্যবস্থা করেন। বিষয়টি ব্যাখ্যা করে আরও বললাম, বয়স্ক লোক হিসেবে আপনাকে আমি সব সময় সম্মান করি। এটি একটি নীতির প্রশ্ন। দয়া করে ব্যক্তিগতভাবে নিবেন না। হায়দ্রী সাহেব কোনো জবাব না দিয়ে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন।

পরদিন টী-ব্রেকের সময় স্টাফ রুমে সকল আর্মি এবং সিভিলিয়ান অফিসারের সামনে হায়দ্রী সাহেব আমাকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার করে বলে উঠলেন, লে: আশরাফ, গতকাল থেকে কেনো আপনি হাউসে ডিউটি থেকে অনুপস্থিত থাকছেন ? এটা খুব অন্যায় কাজ। আপনার বুঝা উচিৎ। আমি বুঝলাম, হায়দ্রী সাহেব এতো লোকের সামনে আমাকে উল্টাপাল্টা কিছু বলার জন্য প্ররোচিত করছেন। রাগের মাথায় মুখ ফসকে অন্যায় কিছু যদি বলে ফেলি তাহলে আমার কোর্ট মার্শাল করতে সাক্ষীর অভাব হবে না। আমি ধীরস্থিরভাবে জবাব দিলাম, আমার যা বলার তা গতকাল আপনাকে বলেছি। আমার আর কিছু বলার নেই। তুমি কম্যানড্যান্টের আদেশ অমান্য করছো, হায়দ্রী সাহেব এবার গর্জে উলেন। আমি বললাম, বিষয়টি তা’হলে আপনি কম্যানড্যান্টকে বলুন। তিনি যা করার করবেন।

এর পরদিন, যা ভেবেছিলাম, কম্যানড্যান্ট আমাকে তাঁর অফিসে ডেকে পাঠালেন। অফিসে ঢুকে স্যাল্যুট করতে না করতেই শুরু হলো বজ্রের গর্জন। ইংরেজি, উর্দু মিলিয়ে আর্মিতে যত গালি ও মন্দ কথা আছে তা প্রবল বেগে আমার উপর বর্ষিত হতে লাগলো। যার বেশিরভাগ ছাপার অযোগ্য। ‘শান’ পজিশনে দাঁড়িয়ে থেকে তাতে অবগাহন করা ছাড়া আমার তখন কিছু করার ছিলো না। তিনি বললেন: তুমি লে: আশরাফ ‘টিট অব এ সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট’ হয়ে আমার আদেশ অমান্য করার ‘অডাসিটি’ কোথায় পেলে ? প্রথম সুযোগেই বিড়াল মারার জন্য আমি খুব আস্তে করে বললাম: স্যার, আপনার আদেশটি এমপিএমএল (ম্যানুয়াল অব পাকিস্তান মিলিটারি ল’) অনুযায়ী বৈধ ছিলো না। তাই মানা সম্ভব নয়। একজন ক্লাস ওয়ান অফিসার হয়ে আমার পক্ষে একজন ক্লাস টু অফিসারের অধীনে কাজ করা সম্ভব নয়। কাজ হলো না। বিড়াল তো মরলোই না, বরং তিনি আরও রেগে গিয়ে বললেন: হতে পারে মি: হায়দ্রী একজন ক্লাস টু অফিসার। কিন্তু আমি আমার ওথরিটি তাঁকে ডেলিগেইট করেছি। তুমি তার হুকুম মানতে বাধ্য। আমি কোনো প্রকার আবেগ না দেখিয়ে বললাম: আপনি আপনার ওথরিটি একজন হাবিলদারের কাছে ডেলিগেইট করতে পারেন। তাইবলে একজন হাবিলদারের কম্যান্ড আমি মানতে পারি না। পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি আমাকে এমন শিক্ষা দেয়নি। বরং আমাকে বলেছে, কমিশনের প্রতীক হিসেবে তোমার কাঁধে যে ‘পিপ’ দেওয়া হয়েছে, সেটা দেশের মহামান্য প্রসিডেন্ট দিয়েছেন। এটা দেশ ও জাতির গৌরব ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। প্রাণ দিয়ে হলেও এর সম্মান রক্ষা করা তোমার পবিত্র কর্তব্য। এ পর্যন্ত শুনে কম্যানড্যান্ট আরও ক্ষেপে গেলেন। যেনো আগুনে ঘি পড়লো। চিৎকার করে বললেন: ইউ ডাকা ইউনিভার্সিটি চ্যাপস, ইউ ওনলি নো হাউ টু আরগু। বছরের পর বছর তোমার মতো রটেন মাল বের করে ঢাকা ইউনিভার্সিটি দেশের সর্বনাশ করছে। তোমরা শুধু শিখেছো কিভাবে গন্ডগোল পাকাতে হয়। আমি বিনয়ের সাথে বললাম: প্লিজ ক্রিটিসাইজ মি ইফ আই এম রং। বাট, স্যার, প্লিজ ডু নট ক্রিটিসাইজ মাই ইউনিভার্সিটি। ইট ইজ বিক’জ অব ডাকা ইউনিভার্সিটি হোয়াট আই এম টু’ডে। ইট টট মি হাউ টু কীপ মাই হেড হাই এগেইনস্ট অল অডস। ইট ওয়াজ বিক’জ অব ডাকা ইউনিভার্সিটি আই ওয়াজ ফাউন্ড ফিট ফর কমিশন বাই দি আইএসএসবি। আমার প্রাণপ্রিয় ইউনিভার্সিটির সমালোচনা সহ্য করতে না পেরে বেশ কিছুটা ইমোশনাল হয়ে পড়েছিলাম। সব শেষে তিনি গর্জে উঠলেন: ইউ ব্লাডি চ্যাপ, ইউ ডোন্ট নো হোয়াট ইজ অর্মি। আই উইল কিক ইউ আউট অব দি আর্মি। আর্মি ডাজ নট নীড এন ইনডিসিপ্লিড রো’গ লাইক ইউ। নাউ গেট আউট। স্মার্ট একটা স্যাল্যুট দিয়ে বেরিয়ে এলাম।

সেদিন সারাদিন কোনো কাজে মন বসলো না। অবশেষে একাএকাই সিদ্ধান্ত নিলাম, আর্মিতে আর চাকুরি করবো না। মান-ইজ্জত বিসর্জন দিয়ে চাকুরি করার কোনো মানে হয় না। যা হয় হবে, চাকুরি থেকে ইস্তফা দেবো। তখনকার দিনে কম্প্যুটার ছিলো না। ব্যক্তিগত টাইপরাইটারও ছিলো না। সারারাত জেগে আর্মি চীফকে এড্রেস করে, যথাযোগ্য কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পাঠানোর জন্য, নিজ হাতে রেজিগনেশন লেটার লিখলাম। দরখাস্তে পুরো ঘটনা সংক্ষেপে বর্ণনা করলাম। সবশেষে লিখলাম: আমি ঠিক বুঝতে পারছি না কোনটা আর্মির আসল শিক্ষা। একজন আর্মি অফিসারের মর্যাদা সম্পর্কে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি যা আমাকে শিখিয়েছে, নাকি আমার বর্তমান কম্যানড্যান্ট যা শেখাতে চাচ্ছেন। যদি কম্যানড্যান্ট যা শেখাতে চাচ্ছেন তা-ই কারেক্ট হয়, তবে আমি এই আর্মিতে আর চাকুরি করতে চাই না। আমার এই চিঠিকেই পদত্যাগপত্র বলে বিবেচনা করতে সবিনয় অনুরোধ জানাচ্ছি।

আর্মি বিধি অনুযায়ী এধরনের চিঠিকে ‘রিড্রেস অব গ্রীভেন্স’ (দুর্দশার প্রতিকার) চেয়ে চিঠি বলা হয়। কম্যান্ড চ্যানেলের প্রতিজন কম্যান্ডারের হাত হয়ে সর্বশেষে চিঠিটিকে অবশ্যই আর্মি চীফের হাতে পৌছাতে হবে। প্রত্যেক কম্যান্ডারের জন্য নির্ধারিত সময়সীমা বেধে দেওয়া আছে। যদি কোনো কম্যান্ডার নির্ধারিত সময়ের চাইতে বেশি সময় ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় দরখাস্তটি ফেলে রাখেন, তবে আবেদনকারী সরাসরি পরবর্তী সিনিয়র কম্যান্ডারের কাছে তার চিঠি পাঠাতে পারবেন। তবে হ্যাঁ, যদি মাঝ পথে কোনো কম্যান্ডার প্রার্থিত প্রতিকার করে দিতে পারেন, এবং আবেদনকারী অফিসার যদি তাতে সন্তুষ্ট হন, চিঠিটি পরবর্তী সিনিয়র কম্যান্ডারের কাছে আর পাঠনো হয় না। বিষয়টি ওখানেই শেষ হযে যায়। মিলিটারি কলেজ ঝেলামে আমার কম্যান্ড চ্যানেলে প্রথম অফিসার ছিলনে চীফ ইন্সট্রাক্টর মেজর বি এ (বশীর আহমদ) মালিক, এইসি। পরদিন সকাল বেলা তাঁর অফিসে গিয়ে আমার চিঠিটি তাঁর হাতে দিলাম। মুখ দেখে মনে হলো তিনি এমন কিছু আন্দাজ করেছিলেন। আমার জন্য কফির অর্ডার দিয়ে তিনি চিঠিটি মনেমনে পড়তে লাগলেন। পড়া শেষ করে ছোট্ট করে মন্তব্য করলেন, ওয়েল ড্রাফটেড। রেখে যাও। দেখি কী করতে পারি।

দু’তিন দিন পরের কথা। ঊর্দ্ধতন কম্যান্ডারের কাছে আমার দরখাস্তখানা পাঠাবার সময়সীমা তখনও পার হয়নি। একদিন সকাল দশটার দিকে ডাক এলো কম্যানড্যান্টের কাছ থেকে। যেতেযেতে ভাবলাম, যা হবার হবে। নীতির প্রশ্নে আপোষ করবো না। কম্যানড্যান্টের অফিসে পা দিয়ে স্যাল্যুট করতে না করতেই তিনি আন্তরিক কন্ঠে আহ্বান জানালেন, হাঁ ভাই আশরাফ, আ যাও। টেইক এ সীট। হাউ আর ইউ ? ঘরওয়ালে (বাড়ির সবাই) কেয়সে হ্যায় ? কেয়া পিউগে, চায় ইয়া কফি ? একজন সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট স্বঅভাবিক অবস্থায় তাঁর কমান্ডিং অফিসারের কাছ থেকে স্বপ্নেও এমন আচরণ আশা করতে পারে না। আমার বুঝতে বাকী রইলো না, দেয়ার হ্যাজ বীন এ চেইঞ্জ অব হার্ট ! বসতেবসতে বললাম, থ্যাংক ইউ স্যার। এজ ইউ প্লীজ। কম্যানড্যান্ট অর্ডার্লিকে চা আনতে বললেন। তারপর তিনি বললেন: আশরাফ, আই এম সরি। দি আদার ডে আই ওয়াজ হার্শ উইথ ইউ। ইট কুড বি এভয়ডেড। আই শুড হ্যাভ টেকেন ইওর পয়েন্ট। এনি ওয়ে, লেট’স ফরগেট এন্ড ফরগিভ। ফ্রম টু’ডে আই হ্যাভ পুট ইউ ইন টিপু হাউস। দি হাউস মাস্টার ইজ এ সিনিয়র আর্মি অফিসার। এ নাইস ম্যান। ইউ উইল নট হ্যাভ এনি প্রবলেম ইউথ হিম। আমার চা তখনও শেষ হয়নি। থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ স্যার বলে দাঁড়িয়ে স্যাল্যুট করে অত্যন্ত খুশিমনে কম্যানড্যান্টের অফিস থেকে বেরিয়ে এলাম। আল্লাহকে শুকরিয়া জানালাম।

এরপর থেকে কর্নেল মর্তুজা যেনো আমার ব্যক্তিগত বন্ধু হয়ে গেলেন। আমাকে নিজের গাড়িতে বসিয়ে প্রায় উইকএন্ডে ক্লাবে নিয়ে যেতেন। ভালো ছবি হলে ঝেলাম বা রাওয়ালপিন্ডি শহরে সিনেমা দেখাতে নিয়ে যেতেন। গাড়ি চালাতেচালাতে কলেজের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। প্রায় দিন, রাত্রি বার’টার পর আমার রুমের দরজায় টোকা দিয়ে আমাকে বিছানা থেকে উঠিয়ে বলতেন, আশরাফ, চলো যারা চক্কর লাগাতে হে। বাকী সব লোগ (অন্য অফিসাররা) তো বিবি-বাচ্চা লে কে সোগিয়া হ্যায়। এক তরফ (জুনিয়রদের মধ্যে) তোম হো ব্যাচেলর, দু’সরি তরফ (সিনিয়রদের মধ্যে) ম্যায় হুঁ বাচেলর। ঘর মে কোই কাম নেহি হ্যায়। চলো চক্কর লাগাতে হে। আমাকে সাথে নিয়ে হাউসগুলোতে, কলেজ হাসপাতালে রাউন্ড দিতেন। দেখতেন, ছেলেরা ঠিকমত ঘুমাচ্ছে কিনা। কারও গা থেকে কম্বল পড়ে গেলে একজন মায়ের মতো তা ঠিক করে দিতেন, যেনো ঘুমন্ত ছেলেটি জেগে না উঠে। বাথরুমগুলো পরিষ্কার আছে কিনা, পানির কল সব কাজ করছে কিনা, ইত্যাদি। দু’জনের পায়ে থাকতো রাবার সোলের জুতা, যাতে বাচ্চাদের ঘুমের ব্যাঘাত না হয়। গো-খামারের গরুগলো কেমন আছে তা-ও তিনি দেখতে ভুলতেন না। বলতেন, এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ। গরুগুলো ঠিক না থাকলে ছেলেদেরকে খাঁটি দুধ কেমন করে দেবো ? সারা দিন কাজকর্ম, খেলাধুলা করে আমি খুব ক্লান্ত থাকতাম। রাত জেগে কম্যানড্যান্টের সাথে এভাবে ঘুরতে আমার কষ্ট হতো। ছেলেদের প্রতি কতটা মায়া থাকলে একজন প্রিন্সিপাল এতটা নিবেদিতপ্রাণ হতে পারেন, সত্য বলতে কি, তখন বুঝতে পারিনি। হয়তো বয়স কম হবার কারণে। পরবর্তীকালে যখন আমি নিজে ক্যাডেট কলেজের প্রিন্সিপাল হয়েছিলাম তখন পর্যন্ত আমাকে অপেক্ষা করতে হয়েছিলো একথা বুঝতে যে, কেনো কর্নেল মর্তুজা এমন করতেন। বিষয়টি কাউকে বোধ হয় বুঝিয়ে বলা যায় না, ফুলের ঘ্রাণের মতো উপলব্ধি করতে হয়। সত্যিকার অর্থেই কর্নেল মর্তুজাকে আমি গুরু মানি।

Tuesday, August 13, 2013

Corruption and women

Bangladesh is already well known as a corrupt country. It’s because most of its powerful and influential men and women, within and outside the government, practice corruption as a way of life. Sometimes we find names of such allegedly corrupt persons published by the media, though most of the time these people manage the corrupt owners of the media and go unnoticed. What is surprising is that we seldom find names of the women among the corrupt people. Very recently we found the name of only one woman who is allegedly corrupt. She is Mrs. Jasmine, wife of Hallmark boss Mr. Tanvir. Does that mean that the women in our society are all “dhoa tulshipata” (innocent)? Certainly not. I am sure, an intimate study of the corrupt men, will prove that, if not more, at least 95% of them indulge in corrupt practices at the behest of their wives and, in some case, their mothers. In our society we find most of the working and non working women, especially the well to dos, want to live their life as luxuriously as possible. We see them in a rat race for more money and more power. They take a kind of perverted pleasure in living beyond means. They suffer from a mental disease called exhibitionism and are fond of showing off their expensive houses, cars, dresses, ornaments etc. If these women could be motivated to live within their means, if the society could openly question and condemn such exhibitionism, I believe, their men folk would not have run after unearned and ‘haram’ (forbidden by religion) income to meet their wives’ insatiable greed. But the question is: How to motivate these highly ambitious and exceedingly greedy women and bring them to the path of modest living within the means? I have two humble suggestions. Firstly, women organizations of our country can initiate movements to make the women aware of the far reaching ill effects of corruption on their families and on the society as a whole. They can tell the women that every married woman must prevail upon her husband or son to refrain him from acquiring wealth by illegal means by taking bribe or indulging in dishonest business. She must tell her husband or son that she is happy with his honest income; even if it causes her financial hardship. She can also tell her husband that it will never be good for their children if they are brought up with ‘haram’ money. Moreover, when these children will grow up and learn that their father was a corrupt man they will have no regard for the father. Can we expect to see our senior female social workers starting a movement in this line, or in a better line, by addressing our women, especially the ones who are still students and not married, through media, meetings, seminars and symposia? Secondly, the wife of a corrupt man should be made a co-accused as an abettor in a corruption case. She may be acquitted by the court if she can prove that she tried her best to refrain her husband from making money by corrupt means. But the husband must be punished if found guilty. If necessary the existing relevant laws may be amended to involve the wife of a corrupt man in such cases. Before I conclude I must make it clear that I do not write this piece to absolve the corrupt men of their crimes. Under all circumstances they must be punished as per law. They must be condemned by the society every time and everywhere. We don’t any more want to see such persons selected or elected as the chairmen of the local masjid committees or the school committees, not speak of members of the parliament. Let us have the active support of our mothers and sisters to combat corruption.

Wednesday, August 07, 2013

ঘুসখোরদের জন্য

আমাদের সমাজে বর্তমানে ঘুস একটি মহাসংক্রামক ব্যাধি হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছে। সরকারি-বেসরকারি যেকোনো অফিস বা প্রতিষ্ঠানে ঘুস ছাড়া কোনো কাজ হয় না। দাতা কিংবা গ্রহীতা কেউ আর আজকাল ঘুস দেওয়া-নেয়াকে অবৈধ বা অনৈতিক কাজ মনে করেন না। যদিও কাজটি যে কোনো বিবেচনায় যে অবৈধ এবং অনৈতিক তা সকলের জানা আছে। আমার নিজের জীবন থেকে ঘুস সম্পর্কিত দু’টি অভিজ্ঞতার কথা নিচে বর্ণনা করছি। যাঁরা নিশ্চিন্ত মনে এখনও ঘুস খেয়ে চলছেন, বা যাঁরা ভবিষ্যতে ঘুস খাবার পরিকল্পনা করছেন তাঁরা কথাগুলো ভেবে দেখতে পারেন। ১৯৮১ সালের ঘটনা। আমি ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছি। কোনো একটা ভ্যাকেশনের পর ক্যাডেটরা সবে কলেজে ফিরে এসেছে। এমন সময় একজন হাউস মাস্টার, যিনি একটি হাউস বা ছাত্রাবাসের প্রায় এক’শ জন ক্যাডেটের সার্বক্ষণিক দেখভালের দায়িত্বে নিয়োযিত থাকেন, এসে এমন এক খবর দিলেন যা আমাকে ভীষণ চিন্তায় ফেলে দিলো। তিনি বললেন, তাঁর হাউসের ক্লাস এইটের একজন ক্যাডেট, যার বয়স ১৪ বা ১৫ বছর হবে, বাড়ি থেকে ফিরে এসে এই বলে ঘোষণা দিয়েছে যে, পরবর্তী ভ্যাকেশনে সে আর কখনও বাড়ি যাবে না। জোর করে বাড়ি পাঠালে সে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাবে, নয়তো আত্মহত্যা করবে। তার থাকার জন্য কলেজে অথবা কলেজের পক্ষ থেকে অন্য কোথাও থাকার ব্যবস্থা করা হোক। লম্বা ছুটিতে সব ক্যাডেট বাড়ি যাবার জন্য উদগ্রীব থাকে। অথচ সে জিদ ধরেছে বাড়ি যাবে না। কেনো যাবে না, সে প্রশ্নের উত্তরও হাউস মাস্টার বহু চেষ্টা করে বের করতে পারছেন না। হাউস মাস্টারের ধারণা, বাড়িতে এমন কিছু বিব্রতকর বা লজ্জাজনক ঘটনা ঘটেছে যার জন্য সে আর বাড়িতে যেতে চায় না। ঘটনাটি সে কারও কাছে প্রকাশও করতে চায় না। সহযবোধ্য কারণে ছেলেটির আসল নাম প্রকাশ করছি না। ধরা যাক, তার নাম কামাল। সাধারণত জটিল কোনো সামাজিক সমস্যা থেকে কামালের মত বয়সী ছেলেরা ( এবং মেয়েরা) এমন অস্বাভাবিক আচরণ করে থাকে। যার উপর আস্থা আছে কোনো মুরুব্বি সঠিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে ব্যর্থ হলে এমন আচরণের পরিণতি মারাত্মক হতে পারে। কথাটা আমার জানা ছিলো। শোনার পর দিনই বিকেলে গেইমস পিরিয়ডে কামালকে আমার অফিসে ডেকে আনি। অফিসে আর কেউ না, শুধু কামাল আর আমি। একথা-সেকথা বলার পর পরিবেশ কিছুটা হাল্কা হলে তার বাড়ি না যাইতে চাইবার প্রসঙ্গটি উঠালাম। বিষয়টি খোলাখোলিভাবে বলার জন্য অনুরোধ করলাম। সম্পূর্ণ গোপনীয়তার নিশ্চয়তা দিলাম। তাকে আরও বললাম, বিষয়টি কারও সাথে সেয়ার না করে একাএকা মনের মধ্যে চেপে রাখলে তার মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি হবে। পড়াশুনার ক্ষতি হবে। রেজাল্ট খারাপ হবে। আমি তার একজন বন্ধু হিসেবে, একজন হিতাকাঙ্খী হিসেবে তাকে পরামর্শ দিতে চাই। তার সমস্যা সমাধানে সাহায্য করতে চাই। অবশেষে কামাল মুখ খুললো। সে বললো, তার বাবা একজন সরকারি অফিসার। এমন একটি প্রচন্ড বদনাম আছে। তার বিশ্বাস, তার বাবাও ঘুস খান। এবং প্রচুর পরিমানে ঘুস খান। ঠিকাদাররা বাসায় এসে তার বাবা বা মা’র হাতে ঘুসের টাকা ও অন্যান্য সামগ্রী দিয়ে যান। ব্যাপারটা সে ছুটিতে বাসায় থাকার সময় লক্ষ্য করেছে। তার মা প্রতি মাসে প্রায় বিশ হাজার টাকা সংসারের জন্য খরচ করেন, প্রতি মাসে দামিদামি শাড়ি কেনেন। অথচ তার বাবার মাসিক বেতন সব মিলিয়ে ছ-সাত হাজার টাকার বেশি নয়। দাদা-নানারাও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের লোক। সেখান থেকেও কোনো টাকাপয়সা পাবার কথা নয়। এক পর্যায়ে সে বলে ফেললো, আই হেইট মাই ফাদার। আমি ছুটিতে আর বাড়ি যাবো না। বাবার ঘুসের টাকায় কেনা ভাত আর খেতে চাই না। বাড়ি গেলে আমাকে হারাম খেতে হবে। সমস্যা জটিল, সন্দেহ নাই। কোনো মসজিদে অথবা মজলিসে ঘুসখোরদের সম্পর্কে নিন্দনীয় কথা শুনে, অথবা বইতে পড়ে সে আর নিজেকে স্থির রাখতে পারেনি। তার বাবাকে, সেইসাথে মাকেও, ঘৃণা করতে শুরু করে। তাঁদের কাছে আর সে যেতে চাইছে না। পরের দিন আবার একই সময়ে আমার অফিসে আসতে বলে সেদিনের মত কামালকে তার হাউসে ফিরে যেতে বললাম। পরের দিন গেইমস পিরিয়ডে কামালকে আবার আমার অফিসে ডেকে এনে নিভৃতে আলাপ শুরু করি। প্রথমেই তাকে আশ্বস্ত করলাম এই বলে, বিষয়টি নিয়ে আমি নিজে অনেক চন্তা করেছি। ধর্ম, আইন এবং নৈতিকতা সম্পর্কে যাঁদের অনেক জ্ঞান আছে এমন কয়েকজন পন্ডিত ব্যক্তির সাথে আলাপ করেছি। তাঁদের সবার একমত, তোমার বাবা ঘুষ খেয়ে, এবং তোমার মা সে ঘুষের টাকা উড়িয়ে অবশ্যই গুনাহ এবং অন্যায় দু’টোই করছেন। তবে সেজন্য তোমার বা তাঁদের অন্য কোনো সন্তানের কোনো গুনাহ বা অন্যায় হবে না। তোমাকে যথাসাধ্য ভালোভাবে লালনপালন করা তাঁদের পবিত্র দায়িত্ব ও কর্তব্য। একাজের জন্য তাঁরা সত্ না অসত্ উপায়ে অর্থ উপার্জন করলেন, তার জন্য সন্তান হিসেবে তোমার কাছে কোনো কৈফিয়ত চাওয়া হবে না। তাই, ভ্যাকেশনে বাড়ি গিয়ে বাড়ির ভাত খেতে, বাবা-মার দেওয়া কাপড় পরতে তোমরি আপত্তির কোনো কারণ নেই। বরং বাবার ঘুষ খাওয়া এবং মায়ের অর্থ অপচয় করা যে তুমি পসন্দ করো না তা বিনয়ের সাথে কোনো প্রকার বেয়াদবি না করে বাবা-মাকে বলতে পারো। যদি তাঁরা তোমার কথা শোনেন, তবে ভালো। আর যদি না সোনেন, তাহলে এ নিয়ে বাবা-মার সাথে কোনো সংঘাতে যাবে না। তাহলে তাঁরা হয়তো তোমার ক্যাডেট কলেজে পড়াই বন্ধ করে দেবেন। কাজের কাজ কিছু হবে না। মাঝখান থেকে তোমার মত সত্ এবং ঈমানদার একজন মানুষের ভবিষ্যত সেবা থেকে আমাদের দেশ বঞ্চিত হবে। তারচেয়ে বরং ভালোভাবে লেখাপড়া শেষ করে যে পেশাতই যোগ দাও না কেনো, সকল প্রকার দুর্নীতি ও লোভ-লালসা থেকে নিজেকে রক্ষা কোরো। অধ:স্তনদেরকেও ওপথে হাটতে দিও না। নিজের বাবা-মার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করো, আল্লাহ যেনো তাঁদের হেদায়েত করেন। মৃত্যু হলে যেনো অল্লাহ তাঁদের, তোমার অর্জিত নেকির বদলে, গুনাহ মাফ করে দেন। যতক্ষণ কথা বলছিলাম, আমি কামালের মুখের দিকে তাকিয়ে তার ভাবান্তর লক্ষ্য করছিলাম। মনে হলো, আমার কথায় কাজ হচ্ছিলো। যাবার সময় দু’চোখের কোনায় অশ্রুর রেখা দেখেছিলাম। বুঝতে পারিনি, সে অশ্রু আনন্দের না বেদনার। ক’দিন পর ভ্যাকেশন শুরু হলে কামাল আর কোনো কথা না বলে বাড়ি চলে যায়। তারপর বহুদিন হয়ে গেছে। কামাল কোথায় কী করছে জানি না। আমার বিশ্বাস, সে ঘুষ খায় না, সে ভালো আছে। যদি বেঁচে থাকি, আল্লাহ চাইলে, বাংলাদেশে অথবা দেশের বাইরে কোথাও, দেখা হলে দৌড়ে এসে পা ছুঁয়ে বলবে, স্যার, আমাকে চিনলেন না, আমি কামাল। আমি আপনার কথা রেখেছি। আমি ভলো আছি, সত্ আছি। যেমন করে অনেকদিন আগে কলকাতা ডেপুটি হাই কমিশনের সামনে দৌড়ে এসে আমায় কদমবুচি করে মইনুল (আসল নাম নয়) বলেছিলো, স্যার, আমাকে চিনলেন না ! আমি আপনার ক্যাডেট মইনুল, যাকে আপনি অপরাধ করার জন্য ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ থেকে বের করে দিয়েছিলন। ক্যাডেট কলেজ থেকে বের করে দিয়ে আপনি আমার ভীষণ উপকার করেছিলেন। না হলে আমার মধ্যে যে দোষ ঢুকেছিলো তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারতাম না। ক্যাডেট কলেজ থেকে বের হয়ে এসে পৃথিবীকে নতুন করে চিনলাম। নতুন করে চৈতন্য হলো। থাক সে কাহিনী আজ। আর এক দিন বলা যবে। এবার আসা যাক দ্বিতীয় ঘটনায়। ঘটনাটি ঘটেছিলো ১৯৮০ সালের প্রথম দিকে, যখন আমি সবে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে অধ্যক্ষ পদে যোগ দিয়েছি। আমাদের বড় ছেলে রুমনের বয়স তখন মাত্র দশ হয়েছে। ক্লাশ ফোরে পড়ে। হঠাত্ সে একদিন তার মার কাছে বায়না ধরলো, ছোট মাছের তরকারি, শাকপাতা ভাজি, ভর্তা, ডাল, এসব দিয়ে তার ভাত খেতে আর ভালো লাগছে না। তাকে এখন থেকে প্রতি বেলায় গরু-মুরগি-খাসি বা বড় মাছের ঝোল দিয়ে খাবার দিতে হবে। তা নাহলে সে ভাত খাবে না। বিষয়টি আমার স্ত্রী আমাকে জানালেন। তাঁকে এনিয়ে ছেলেরে সাথে কথা বলতে বারণ করলাম। যা বলার আমি নিজেই বলবো। খবর নিয়ে জানা গেলো, ষড়যন্ত্রের মূল হোতা বাসার বুড়ো সরকারি বাবুর্চি আকবর মিয়া। ছোট মাছের তরকারি, শাকপাতা ভাজি, ভর্তা, ডাল, এসব রান্না করতে তার ভালো লাগছে না। তাছাড়া এসব পাকাতে সময় বেশি লাগে। কাজ শেষে তার নিজের বাসায় ফিরতে দেরি হয়। অন্যদিকে আমি পদ্মাপাড়ের ছেলে। ছোটবেলায় মা যা রান্না করে খাইয়েছেন সেসব খেতে এখনও ভালো লাগে। তাছাড়া সরকার যা বেতন দেয় তা দিয়ে সপ্তাহে দু’একদিন হয়তো বড় মাছ বা গোস্ত দিয়ে ভাত খেতে পারি, প্রতিদিন তো নয়। মনে মনে ঠিক করলাম, ছেলেকে বুঝাতে হবে। যে ভাষায় বললে সে ভালোভাবে বুঝবে সে ভাষাতে বলতে হবে। মিলিটারি কায়দায় ‘নো’ বললে কাংখিত ফল পাওয়া যাবে না। বরং ছেলেটি মনে আঘাত পাবে। পরের রবিবার, তখন রবিবার সাপ্তাহিক ছুটি হতো, নাস্তার টেবিলে রুমনের সাথে কথাটা উঠালাম। ওর আম্মাও সামনে ছিলেন। সহজ ভাষায় ছোটছোট প্রশ্নোত্তরের সাহায্যে ওকে বিষয়টি এভাবে বুঝাবার চেষ্টা করলাম: শুনলাম, ছোট মাছের তরকারি, শাকপাতা ভাজি, ভর্তা, ডাল, এসব খেতে তোমার আজকাল ভালো লাগছে না। তোমার আম্মাকে বলেছো প্রতিদিন গোস্ত বা বড় মাছের তরকারি দিতে। জ্বী। তুমি জানো, গোস্ত, মাছ, শব্জি এসব কোথা থেকে, কেমন করে আমাদের খাবার টেবিলে আসে ? শুক্কুর ভাই (বেয়ারার) বাজার থেকে টাকা দিয়ে কিনে আনে। শুক্কুরকে কে বাজার করার টাকা দেয় ? আম্মা টাকা দেন। আম্মা কোথায় টাকা পান ? কেনো, তুমি টাকা দেও, তোমার বেতন থেকে। আমি কি বেহিসাবি অনেক টাকা বেতন পাই ? নাকি, নির্দিষ্ট পরিমানে কিছু টাকা পাই ? তোমার কী মনে হয় ? নির্দিষ্ট পরিমানে টাকা পাও। তুমি কি জানো, সে টাকা কিসেকিসে খরচ হয় ? না, জানিনা। আমাদের সবার খাওয়াদাওয়া, জামাকাপড়, তোমার বই-খাতা-পেন্সিল, ছোট চাচা-ফুফুদের পড়াশুনা, চিকিত্সা ইত্যাদি অনেক কাজে খরচ হয়। প্রতিদিন বেশিবেশি গোস্ত-মাছ ও দামিদামি খাবার খেতে হলে অতিরিক্ত টাকা লাগবে। সে টাকাটা কোথায় পাবো ? কম খরচ করে অন্য খাত থেকে টাকা বাঁচিয়ে এনে খাওয়াদাওয়ার জন্য ব্যয় করা যায়। তুমি বলো, কোন খাতে কম খরচ করা যায়। অনেক্ষণ চুপ থেকে বললো, আমি জানি না। মনে হলো, জমি এবার তৈরি হয়েছে। আমাকে এখনই ওর মনে সততার বীজ বুনতে হবে। আমি বললাম, হ্যাঁ, একটা উপায় আছে। আমি যদি চুরি করি তা’হলে অনেক টাকা উপার্জন করতে পারবো। (ঘুষ কথাটার অর্থ ও তাত্পর্য তখন ওর জানার কথা নয়। তাই ঘুষের বদলে চুরি বলেছিলাম।) তখন আর আমাদের কোনো অভাব থাকবে না। যা খুশি তাই আমরা খেতে পারবো। কিন্তু, মনে করো, তুমি একদিন ফৌজদারহাট বাজারে গেলে। তোমাকে ওখানকার কেউ চিনে না। এমন সময় তুমি শুনতে পেলে, কেউ একজন বলছে, ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের প্রিন্সিপ্যাল কর্নেল আশরাফ একটা মস্ত চোর। সে মানুষের টাকা চুরি করে। তখন তোমার কেমন লাগবে শুনতে ? সাথেসাথে রুমন চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেলো। চিতকার করে যা বলেছিলো, তা আজও আমার পরিষ্কার মনে আছে। সে বলেছিলো, না আব্বা না, তুমি কখনও চুরি করবে না। আম্মা যা টেবিলে দিবেন, তাই খাবো। এরপর রুমন এবং ওর ছোট দু’ভাইবোনকে কোনো দিন এটা খাবো না, ওটা খাবো না বলে বায়না ধরতে শুনিনি। হোটেল-রেস্টুরেন্টে খেতে গেলে খাবার নিয়ে বায়না ধরেনি। ওদের মা যা খাবারের অর্ডার দিয়েছেন তাই সানন্দে খেয়েছে। তিনচার বছর পরের ঘটনা। রুমন সম্ভবত তখন ঢাকার আদমজী ক্যন্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলে ক্লাশ সেভেনে পড়ে। একদিন ওর মা লক্ষ্য করলেন যে সে পা খুড়িয়েখুড়িয়ে হাটছে। ভাবলেন, হয়তো স্কুলে খেলতে সময় পড়ে গিয়ে পায়ে আঘাত পেয়েছে। দেখার জন্য কাছে ডাকলেন। রুমন বললো, না, তমেন কিছু নয়। দু’তিন পর ওর মা জোর করে কাছে বসিয়ে যা দেখলেন তাতে যেকোনো মায়ের মন ব্যথায় ভরে উঠার কথা। জুতা ছোট হয়ে গেছে। দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে গোড়ালিতে ফোষ্কা পড়ে ঘা হয়ে গেছে। মা প্রশ্ন করলেন, জুতা পায়ে লাগছে না, একথা কেনো এতোদিন বলিস নি ? ছেলের জবাব, এখন তো মাসের মাঝামাঝি। আব্বার হাতে যদি টাকা না থাকে। তাই অব্বাকে বিব্রত করতে চাইনি। আর তো মাত্র ক’টা দিন, আগামী মাসের প্রথম দিনেই বলতাম। অফিস থেকে ফিরে এসে স্ত্রীর কাছ থেকে ঘটনাটি শোনার পর চোখে পানি এসে গিয়েছিলো। ছেলেকে ডেকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলাম, তোমার অব্বার অনেক টাকা নেই, একথা সত্য। তাই বলে মাসের মাঝামাঝি সময়ে তোমার জন্য একজোড়া জুতা কিনতে পারবো না, একথা সত্য নয়। ভবিষ্যতে এমন আর করবে না। জামাজুতা ছোট হয়ে গেলে অবশ্যই আম্মাকে বা আব্বাকে বলবে। সেদিনই তাকে নিয়ে বাজারে গিয়ে নতুন জুতা কিনে দেই। আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া। পাঠককে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে জনাচ্ছি, সেই ছেলে আল্লাহর মেহেরবানিতে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর শতকরা একশ’ ভাগ বৃত্তি সহকারে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেশাগত ডিগ্রি নিয়ে সতভাবে জীবন যাপন করছে। যারা ঘুষ খাচ্ছেন, ব্যবসা-বানিজ্যের নামে চুরি করছেন, মানুষকে বা সরকারকে ঠকিয়ে নানাভাবে পয়সা কামাচ্ছেন, অথবা যারা এসব করবেন বলে চিন্তাভাবনা করছেন, তাঁরা যদি বিষয়টা একবার ভেবে দেখেন। তাঁদের ছেলেময়েরা বড় হয়ে নিজেদের বাবা-মা সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করবে। নিজের সন্তানের কাছে কৃত কর্মের জন্য পাপী বা অপরাধী বলে বিবেচিত হবার চাইতে বাবা-মার জন্য অধিক দু’র্ভাগ্যজনক দুনিয়াতে আর কিছু আছে কি ? দশ বা বারো বছর বয়স হলেই ছেলেমেয়েরা বুঝতে পারে বাবা (এবং মা) হালাল রুজি কামাই করছেন, না হারাম রুজি কামাই করছেন। যদিও ভয় অথবা লজ্জায় তারা সেটা নিয়ে কথা বলে না। যদি কেউ মনে করেন, ওরা তো ছোট, ওরা কিছুই বোঝে না। তা’হলে তিনি অবশ্যই বোকার স্বর্গে বাস করছেন।

Friday, July 05, 2013

বংশ পরিচয়

১৯৬৮ সালের শেষ দিকের ঘটনা। আমি তখন পাকিস্তানের কোয়েটা ক্যান্টনমেন্টে একটি ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারে জুনিয়র ক্যাপ্টেন হিসেবে কমর্রত ছিলাম। আজকাল যেমন হয়, তখনও পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে লং কোর্সের ক্যাডেট নির্বাচনের জন্য সবার আগে বিভিন্ন স্টেশনে প্রিলিমিনারি ইন্টারভিউ হতো। প্রতিটি ইন্টারভিউ কমিটির প্রেসিডেন্ট হতেন একজন ব্রিগেডিয়ার। সদস্য থাকতেন দু’জন লে: কর্নেল। একজন সিনিয়র মেজর সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করতেন। সেবার এমন একটি কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে আমাকে নিয়োগ দেয়া হলো। শীতকালীন কালেক্টিভ ট্রেইনিংয়ের জন্য স্টেশনের প্রায় সব অফিসার ক্যান্টনমেন্টের বাইরে ছিলেন। তাই আমার মত একজন জুনিয়র অফিসারের উপর এমন গুরুদায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো বলে আমাকে জানানো হয়েছিলো। জীবনে এই প্রথম এমন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার সুযোগ এলো। স্বভাবতই মনের মধ্যে কিছুটা উত্তেজনা কাজ করছিলো। ইন্টারভিউ শুরু হবার দু’তিন দিন আগে আমার নামে জেনারেল হেডকোর্য়াটার্স, রাওয়ালপিন্ডি থেকে একটি ব্যক্তিগত গোপনীয় সরকারি চিঠি এলো। খামটি খোলার পর দেখা গেলো তার ভেতর একখানা ছোট্ট চিঠি। তার সাথে সিলগালা করা মোটা একটি খাম। চিঠিতে বলা হয়েছে, সিলগালা করা খামটি ইন্টারভিউ শুরু হবার পূর্বমুহূর্তে খুলতে হবে, তার আগে কিছুতেই নয়। সিলগালা করা খামটির ভেতরে প্রদত্ত নির্দেশাবলী ইন্টারভিউ কমিটির প্রেসিডেন্ট ও সদস্যদের পাঠ করে শুনিয়ে, চিঠর উপর তাঁদের দস্তখত নিয়ে, সাথে সাথে প্রদত্ত সেলফ এড্রেসড খামে ভরে প্রেরককে ফেরত পাঠাতে হবে। জেনারেল হেডকোর্য়াটার্সের সেই অতি গোপনীয় চিঠির মূলকথা আমার আজকের লেখার বিষয়বস্তু। ইন্টারভিউর জন্য মোট নম্বর ছিলো ১০০। পাশের নম্বর ৪০। ইন্টারভিউতে আগত প্রার্থীদের কীভাবে প্রশ্ন করতে হবে, কী কী প্রশ্ন করা যাবে, কী কী প্রশ্ন করা যাবে না ইত্যাদির উপর বিশদ নির্দেশনা ছিলো সেই চিঠিতে। সবশেষে, এবং সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা হিসেবে বলা হয়েছিলো, “কমিনা” বংশের কোনো প্রার্থীকে যেনো কোনোভাবেই নির্বাচন না করা হয়। “কমিনা” বংশের ব্যাখ্যায় বলা ছিলো: ধোপা, নাপিত, কসাই, ঢুলি, বেলদার, পাটনি ইত্যাদি তথাকথিত নিচু বংশকে “কমিনা” বংশ বলে বিবেচনা করতে হবে। পক্ষান্তরে প্রার্থীর পরিবারের আপন কোনো সদস্য (বাবা, দাদা, চাচা, মামা, ভাই) যদি বর্তমানে সশস্ত্রবাহিনীতে অফিসার পদে কর্মরত থাকেন, অথবা অতীতে ছিলেন, তাহলে এমন প্রতি সদস্যের জন্য অতিরিক্ত ১০ নম্বর করে প্রদান করতে হবে, তবে একজন প্রার্থীকে এবাবদ ৩০ নম্বরের বেশি দেয়া যাবে না। বয়স তখন নিতান্তই কম ছিলো, পঁচিশেরও নিচে। নির্দেশনাটি মনে মনে পাঠ করে ভীষণ হোচট খেলাম। ভাবলাম, ইসলামিক রিপাবলিকের এ কোন ইসলামী ন্যায় বিচার এবং গণতন্ত্রের রূপ দেখছি ! চিঠিতে অবশ্য স্বীকার করা হয়েছিলো, এই নির্দেশনাটি ইসলামী ন্যায় বিচার এবং গণতন্ত্রের মর্মবাণী উভয়ের সাথে সাংঘর্ষিক। তারপরও বহু বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে সেনাবাহিনীকে বাধ্য হয়ে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। অনেক বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। সংক্ষেপ যা বলা হয়েছে তা হলো: সশস্ত্র যুদ্ধের ময়দান এমন একটি স্থান যেখানে যুদ্ধরত অবস্থায় সকল কমান্ডারকে পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম কঠোরতা ও বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। এখানে তত্বের কচকচানি, রাগ-বিরাগ বা ভাবাবেগের কোনো যায়গা নেই। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, আমাদের উপমহাদেশের “কমিনা” বংশের ছেলেমেয়েরা শৈশব ও বাল্যকালে এক ধরনের বিশেষ আর্থসমাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে বড় হয়ে উঠে। নেতৃত্ব প্রদানের জন্য যেসব মানবিক ও মানসিক (পার্সোনালিটি এন্ড ক্যারাক্টার ট্রেইটস) গুণাবলীর অবশ্য প্রয়োজন, তা সাধারনত: তাদের মধ্যে প্রস্ফুটিত হতে দেখা যায় না। তাদের কেতাবি বিদ্যা যতোই হোক না কেনো। যে ব্যক্তির মধ্যে এসব বিশেষ গুণাবলীর অভাব আছে সে স্বাভাবিক কারণে সশস্ত্রবাহিনীতে, কমান্ডার হলেও, লীডার হতে পারে না। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। এদের মধ্যে অনেকে আবার বড় হয়ে এসব দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সশস্ত্রবাহিনীতে অফিসার নির্বাচনের সময় এ বিষয়ে চান্স নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। আরও একটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। নিজেদের আর্থসমাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যাকগ্রাউন্ডের কারণে এতদাঞ্চলের সাধারন সৈনিকরা “কমিনা” বংশ থেকে আগত কোনো অফিসারকে মন থেকে নিজেদের লীডার হিসেবে মেনে নিতে চায় না। এমন লীডারের হুকুমে স্বেচ্ছায় প্রাণ দিতে রাজি হতে চায় না। প্রথম দিনের ইন্টারভিউ শেষ করে রাতে অফিসার্স মেসে ফেরার পরও মাথার মধ্যে বিষয়টি ঘুরপাক খাচ্ছিল। এমন সময় আমার আব্বার বলা একটা কথা মনে পড়লো। একটি উদার ও প্রগতিশীল মনের মানুষ ছিলেন তিনি। আর্মিতে জয়েন করার আগে যখন ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্র ছিলাম তখন ছুটিতে আব্বার কাছে গেলে এমন অনেক বিষয় নিয়ে আমার সাথে আলাপ করতেন যা তখনকার দিনে পিতা-পুত্রের মাঝে অনুচ্চার্য বিষয় ছিলো। তাঁর আমাকে নিয়ে চিন্তা ছিলো, ছেলেদের স্কুল এবং ছেলেদের কলেজ থেকে পাশ করা ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কো-এডুকেশনে গিয়ে কোনো মন্দ বংশের মেয়ের প্রেমেট্রেমে জড়িয় না পড়ি। তাই তিনি আমাকে কাছে ডেকে বললেন: বাবা, তুই এখন বড় হয়েছিস। এই বয়সে বিয়ে-শাদী বা প্রেম করার জন্য কোনো ময়ে পসন্দ হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। মনে তেমন কোনো ভাবনা উদয় হলে একটা কথা অবশ্যই মনে রাখবি। মেয়েটি যেনো আজেবাজে ফ্যামিলির না হয়। আজেবাজে ফ্যামিলি বলতে তিনি দরিদ্র পরিবারকে বুঝাননি। বুঝিয়েছিলেন সাংস্কৃতিকভাবে নিম্নমানের, নিম্নরুচির পরিবারকে। তাঁর কথার পক্ষে অনেক যুক্তি ও উদাহরণ দিয়েছিলেন। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইস্ট পাকিস্তান স্টুডেন্টস ইউনিয়নের একজন সক্রিয় কর্মী। চেতনায় উদার এবং বামপন্হী। আব্বার কথাগুলু মনে হচ্ছিল প্রচন্ড প্রতিক্রিয়াশীল। তবে প্রতিবাদ করে বলার অনেক কিছু থাকলেও কিছু বলতে সাহস হয়নি। অনেক কাল পর আমার নিজের ছেলেমেয়ের যখন বিয়ে দেওয়ার সময় হলো তখন আব্বার কথার তাত্পর্য পুরোটা বুঝতে পেরেছিলাম। ২৮ বছর পর ১৯৯০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে, বাংলাদেশ ইন্টার সার্ভিসেস সিলেকশন বোর্ডের (আইএসএসবি) প্রেসিডন্ট হিসেবে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর একাডেমিগুলোর জন্য ক্যাডেট সিলেকশনের চূড়ান্ত দায়িত্ব আমার ঘাড়ে এসে পড়ে। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তানের জেনারেল হেডকোর্য়াটার্সের পাঠানো সেই অতি গোপনীয় চিঠির কথা মনে পড়লো। খুঁজে দেখলাম, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের আইএসএসবি-কে তেমন কোনো নির্দেশনা দিয়ে চিঠি কখনও দেওয়া হয়নি। কারণ সহজবোধ্য। নীতিগতভাবে সরকার সঠিক কাজটিই করেছেন, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ যেতেই সন্দেহ দেখা দিলো। কোনো এক ইউনিটের এক মেজর, ধরা যাক তার নাম তানিম (সঙ্গত কারণে আসল নাম-ঠিকানা গোপন রাখা হলো), এমন কান্ড ঘটিয়ে ফেললেন যাতে সবাই স্তম্ভিত হয়ে গেলো। গভীর রাত্রে, ছোট দু’টি বাচ্চা যখন ঘুমিয়ে ছিলো, নিজের বাসার জিনিষপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে লন্ডভন্ড করে, লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে নিজের স্ত্রীকে হত্যা করলেন মেজর তানিম। হৈ-চৈ করে পাড়ার সবাইকে ডেকে এনে বললেন তাঁর বাসায় ডাকাতি হয়েছে। ডাকাত তার স্ত্রীকে মেরে ফেলে ঘরের সব মূল্যবান জিনিষপত্র নিয়ে গেছে। যথাযথ তদন্তের পর এসব তথ্য বেড়িয়ে আসে। স্ত্রীটি ছিলেন অত্যন্ত ধনী পিতামাতার একমাত্র সন্তান। পিতামাতার মৃত্যুর পর তিনি স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের সকল সম্পত্তির মালিকানা লাভ করেন। শ্বশুর বাড়ির সম্পত্তি আত্মসাত করার জন্য মেজর তানিম এমন জঘণ্য অপরাধ করেছিলেন। বিচারে দীর্ঘ দিনের কারদন্ড হয়েছিলো। সম্ভবত শিশু সন্তান দু’টির কথা বিবেচনা করে বিচারক প্রাণদন্ড দেননি। বিষয়টি নিয়ে আর্মি হেডকোর্য়াটার্সে প্রচন্ড আলোড়ন সৃস্টি হলো। চিঠি দিয়ে আমার কাছে জানতে চাওয়া হলো, কেমন করে এমন জঘণ্য ক্রিমিনালকে আইএসএসবি কোয়ালিফাই করেছিলো। ১২/১৪ বছর আগের ফাইলপত্র খুঁজে যা পাওয়া গেলো তা সংক্ষেপে এরকম: মেজর তানিমের জন্ম হয়েছিলো বাংলাদেশে দুর্নীতি ও দুষ্কর্মের জন্য অতি বিখ্যাত একটি ডিপার্টমেন্টের সর্বনিম্ন পর্যায়ের এক কর্মচারির ঘরে। দুর্নীতি ও দুষ্কর্মের পরিবেশে সেখানেই তাঁর বেড়ে উঠা। সদ্য উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে যখন তিনি আইএসএসবি-তে এসেছিলেন তখন তাঁর ক্রিমিনাল মেন্টালিটি টেস্টিং অফিসারদের কাছে ঠিকই ধরা পড়েছিলো। তখন বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে ক্যাডেটদের এতটা অভাব ছিলো যে একডেমি, তথা আর্মি, চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিলো। তাই অনেকটা আপোস করে উক্ত মেজরকে, তার রিপোর্টে দুর্বল দিকগুলো উল্লেখ করে, একাডেমিতে পাঠানো হয়েছিলো। আশা করা হয়েছিলো, একাডেমিতে দীর্ঘ ট্রেইনিংয়ের সময়ে তিনি তাঁর দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারবেন। না পারলে, কমিশন না দিয়ে একাডেমি থেকে বহিস্কার করা হবে। কে জানে, বিধাতা তখন হয়তো মানুষের দুরাশা দেখে মুচকি হেসেছিলেন। ক’দিন আগে, ২০১৩ সনের জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ অধিবেশনে কয়েকজন মাননীয় সংসদ সদস্য যে কদর্যতম অশ্লীল ভাষায় একে অপরকে গালাগাল করলেন, তা সুদূর আমেরিকার স্যান হোসেতে বসে ঢাকার টেলিভিশনের বদৌলতে আমার দেখা এবং শোনার বদকিসমত হয়েছে। শুনতে শুনতে মনে পড়ে গেলো ১৯৬৮ সালে পাওয়া পাকিস্তানী জেনারেল হেডকোর্য়ার্টাস থেকে পাওয়া চিঠির কথা। কপি হাতে থাকলে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল দু’টির সর্বোচ্চ নেতা-নেত্রীদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া যেতো। আরও মনে পড়ে গেলো আমার মরহুম আব্বার কথা। আমার সাত বছর বয়সী নাতনি, যার জন্ম ও বেড়ে উঠা আমেরিকাতে, আমার পাশে বসে ঢাকার টিভি দেখে। সেখান থেকে অতি উত্সাহ নিয়ে বাংলাভাষা শেখার চেস্টা করে। খুব ভালো বাংলা বলতে পারে। অপিরিচিত কোনো শব্দ বা বাক্য শুনলেই সে আমাকে সাথে সাথে প্রশ্ন করে, “দাদা, এই কথাটার অর্থ কী ?” সেদিন খবর শোনার সময় মাননীয় সংসদ সদস্যদের কুত্সিততম কথাবার্তা শুনে সে আমাকে একই প্রশ্ন করলো। সহৃদয় পাঠক, আপনিই বলুন এই কচি শিশুটিকে আমি কী জবাব দেবো ? বাধ্য হয়ে মিথ্যা কিছু বলে তাকে শান্ত করেছিলাম। একজন সংসদ সদস্য, তা তিনি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যেভাবেই নির্বাচিত হয়ে এসে থাকুন না কেনো, তিনি তো আমাদের, আ’ম জনতার, লীডার। আর সেজন্যই আমরা “মাননীয়” বলে সম্বোধন করি। না করলে বেয়াদবি হয়। একজন সংসদ সদস্য নিজে নিজে সংসদে আসেননি। তাঁকে তো তাঁর দলের সর্বোচ্চ নেতা বা নেত্রী মনোনয়ন দিয়ে সংসদে এনেছেন। ইংরেজিতে একটা বহুল প্রচলিত কথা আছে যার বাংলা করলে এমন হয়: একজন মানুষের সঙ্গী-সাথীদের কথা-বার্তা, স্বভাব-চরিত্র, অভ্যাস-রুচি দেখে মানুষটির নিজের কথা-বার্তা, স্বভাব-চরিত্র, অভ্যাস-রুচি সম্পর্কে ধারণা করা যায়। এসব কুত্সিত কথা বলা “মাননীয়দের” যেসব বড় নেতা-নেত্রীরা আদর করে সংসদে ঠাঁই দিয়েছেন, আমরা তাঁদেরকেই বা কতটা প্রাপ্য সম্মান দিতে পারি ? কথাটা ভাবার সময় কি এখনও হয়নি ?

Sunday, August 12, 2012

বন্ধ হোক গায়ের জোরে গুরুগিরি

১। বহু বছর আগে, আধাশতাব্দিরও বেশি হবে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের লেখায় একটা কথা পড়েছিলাম। কোনোকোনোগুরুজনের আচরণে মাঝেমধ্যে কথাটা যে মনে হয়নি, তা নয়। কিন্তু বাংলাদেশেরশিক্ষাঙ্গণের, বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালসমূহের বতর্মান হালহকিকত দেখে কথাটাভীষণভাবে মনে পড়ছে। উচ্চ শিক্ষার এসব প্রতিষ্ঠানগুলোতে দু’তিন দশক ধরে যেনৈরাজ্যকর অবস্থা বিরাজ করছে তাতে যে কোনো বিবেকবান ব্যব্ক্তি দেশের ভবিষ্যতচিন্তা করে বিচলিত বোধ করবেন। বহুদিন আগে পড়েছি বলে কবিগুরুর কথাটা স্মৃতি থেকেহুবহু উদ্ধৃত করতে পারছি না। পারিবারিক কারণে দেশ থেকে অনেক দূরে যুক্তরাস্ট্রেবাস করতে হচ্ছে। হাতের কাছে বাংলা রেফারেন্স বই নেই। তাই পাঠকের কাছে ক্ষমা চেয়েনিয়ে ঘুণেধরা স্মৃতিশক্তিকে ভরসা করছি। কবিগুরু যা বলেছিলেন তার মর্মকথা হলো,গায়ের জোরে আর সব হওয়া গেলেও গুরু হওয়া যায়না। আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশের মানুষ,বিশেষ করে যাঁদের ছেলেমেয়ে স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে, গত দু’তিনদশক ধরে কথাটা হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছেন। প্রাইমারি স্কুলের শিশু থেকে বিশ্ববিদ্যালয়েরতরুণ পর্যন্ত সকল বয়সের শিক্ষার্থীদের উপর এমন সব লোকদের গুরু হিসেবে চাপিয়ে দেওয়াহচ্ছে যাঁদের বেশির ভাগেরই, শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলেও, গায়ের জোর ছাড়া শিক্ষক হবারমত আর কোনো যোগ্যতা নেই। এখানে গায়ের জোর বলতে শারীরিক শক্তিকে বোঝানো হচ্ছেনা। (যদিওএমন উদাহরণ বিরল নয় যেখানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের কোনোকোনো শিক্ষকশিশুকিশোর ছাত্রছাত্রীকে শারীরিক শক্তি প্রয়োগ করে রক্তাক্ত করছেন, এমনকি হাসপাতালেপাঠাচ্ছেন।) কোনোকোনো অধ্যক্ষ এবং উপাচার্য সারাক্ষণ বাড়িতে এবং অফিসে পুলিশিপ্রহারায় আবৃত থেকে নিজ প্রতিষ্ঠানের স্বার্থবিরোধী কর্মকান্ড চালাচ্ছেন। এমনকিকেউকেউ নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষককে অমর্যাদাকারী, ছাত্রের হত্যাকারী কিংবা ছাত্রীরনির্যাতনকারীদের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন। প্রতিবাদী ছাত্র ও শিক্ষকদের উপর নির্যাতনচালাচ্ছেন, কখনও অতি লজ্জাজনকভাবে পুলিশের সাহায্য নিয়ে। ছাত্রদেরকে শাসন ওপরিচালনা করার জন্য প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কিছু বিধিবদ্ধ আইনকানুন এবংবিধিবিধান অবশ্যই থাকা দরকার, এবং তা আছেও। প্রতিষ্ঠানের মহাগুরু, যাকে আমরাপ্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ অথবা উপাচার্য বলে থাকি, তিনিসহ সকল গুরু বা শিক্ষকপ্রয়োজনবোধে এসব আইনকানুন এবং বিধিবিধান, যাকে অন্যভাবে গায়ের জোর বলা যায়, প্রয়োগকরতে পারেন। কিন্তু সমস্যা হলো, একজন শিক্ষক চাইলেও একজন থানার দারোগার মত শুধুমাত্রআইনকানুনের ডান্ডা দেখিয়ে, গায়ের জোরে, ছাত্রদেরকে সুশিক্ষিতরূপে আলোকিত করে গড়েতুলতে পারেন না। একাজ নিষ্ঠা, সততা এবং দক্ষতার সাথে করতে হলে একজন মহাগুরু অথবাগুরুকে, আনুষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়া, আরও কিছু অত্যাবশ্যকীয় মানবিক ও মানসিক গুণাবলীসম্পন্নহওয়া অপরিহার্য। আমার বিশ্বাস, কবিগুরু তাঁর কথায় সে দিকেই ইঙ্গিত করেছেন।

২। বর্তমানে আমাদেরপাবলিক বিশাববিদ্যালয়গুলোতে ভয়াবহ অনিয়ম, দাঙ্গা, সন্ত্রাস, অগ্নিসংযোগ ওছাত্রীনির্যাতনসহ যেসব দুষ্কর্ম চলছে তা এককথায় নজিরবিহীন। ইতোপূর্বে জাহাঙ্গীরনগরবিশ্ববিদ্যালয়ও অশান্ত, অরাজক হয়ে উঠেছিলো। সরকার অযথা দীর্ঘ কালক্ষেপণের পর,শিক্ষার্থীদের লেখপড়ার প্রভূত ক্ষতি সাধনের পর পুরানো উপাচার্যকে বিদায় করে একজননতুন উপাচার্য নিয়োগ করেছেন। মনে হয় না, তাতেও সমস্যার সমাধান হবে। কিছুদিন যাবত বুয়েটেরভিসি এবং প্রোভিসির প্রশাসনিক যোগ্যতা এবং সততা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় সাধারন শিক্ষক এবংছাত্ররা তাঁদের পদত্যাগ দাবি করে ধর্মঘট করছেন। রাজশাহি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাঁদারটাকা ভাগাভাগি নিয়ে একই ছাত্র সংগঠনের দুই অংশের মধ্যে সংঙ্ঘর্ষে একজন ছাত্র নামধারীচাঁদাবাজ নিহত হয়েছে। ২২ বছর যাবত ডাকসুর ইলেকশন না হওয়াতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরসাধারণ ছাত্রসমাজ অস্থির হয়ে উঠছে। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজে একদল দাঙ্গাবাজছাত্র একটি ছাত্রাবাস আগুন লাগিয়ে ভস্মীভূত করেছে। সাম্প্রতিক কালের ইতিহাসসাক্ষ্য দেয়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়, কিন্তু তার কোনোবিচার হয় না। অন্য কারণ থাকলেও, এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মহাগুরুদের অযোগ্যতা,অদক্ষতা এবং অনেক ক্ষেত্রে অসততা এমন পরিস্থিতির জন্য বহুলাংশে দায়ি। অথচ তাঁদেরকেউই নিজ অক্ষমতা স্বীকার করে আত্মমর্যাদা নিয়ে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন না। পরিস্থিতিরচরম অবনতি হবার পর সরকার কর্তৃক অপসারিত না হওয়া পর্যন্ত বেহায়ার মত পদ আকড়েথাকেন। তাঁরা ভুলে যান যে, তাঁরা সরকার কর্তৃক নিয়োজিত আর দশজন কর্মকর্তার মত নন।ডিসি, এসপি বা দারোগার মত সরকারি কর্মকর্তারা আত্মমর্যাদার তোয়াক্কা না করেও চাকরিকরেন, বা করতে হয়। কিন্তু একজন শিক্ষকেরপক্ষে আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে নিজ দায়িত্ব পালন করা কখনও সম্ভব নয়।আত্মমর্যাদাহীন কোনো ব্যক্তি আর যা-ই হোন না কেন, তাঁর পক্ষে গুরু হওয়া সম্ভব নয়।তিনি কখনও শিক্ষার্থীদের মাঝে উন্নত মানুষ হবার জন্য প্রয়োজনীয় আলোক ছড়াতে পারেননা। একজন মহাগুরুর কী কী গুণ থাকলে তাঁকে যোগ্য, দক্ষ, সৎ এবং আত্মমর্যাদাসম্পন্নবলা যাবে সে সম্বন্ধে পরে আলোচনা করছি। তার আগে নবীণ পাঠকদের সাথে আমার নিজেরবিশ্ববিদ্যালয় জীবনের দু’টি অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাই।

৩। ১৯৬২ সনেরফেব্রুয়ারি মাস। ঢাকা কলেজ থেকে সবে আইএসসি পরীক্ষা দিয়েছি। তখনও রেজাল্ট আউটহয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তুমুল আয়ুববিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলছে। পরীক্ষার পরপড়াশুনা বা ক্লাশ নেই। তাই প্রতিদিন সকাল বেলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এসেমিটিং-মিছিলে যোগ দিতাম। তখনও আমি কোনো ছাত্র সংগঠনের সদস্য হইনি। নিজের বিবেকেরতাড়নায় বাসা থেকে ফাঁকি দিয়ে এসে মিটিং-মিছিলে যোগ দিতাম। একদিন, সঠিক তারিখ মনে নেই,সকাল দশটা-এগারটার দিকে কার্জন হল এলাকার উত্তরপূর্ব দিকের মেইন গেটের ভিতরেদাঁড়িয়ে আমরা বেশ কিছু ছাত্র বিক্ষোভ করছিলাম। সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ। হঠাৎসামনের বড় রাস্তা ধরে উত্তর (হাই কোর্টের) দিক থেকে একটি ইপিআর-এর জিপগাড়ি দ্রুতদক্ষিণ দিকে যাবার সময় চালকের পাশে বসে থাকা পাকিস্তানি অফিসারটি তাঁর পিস্তল দিয়েবিক্ষোভরত ছাত্রদের দিকে এক রাউন্ড গুলি করে বসলো। আমারই পাশে দাড়ানো একজনবিক্ষোভরত ছাত্রের উরুতে গুলিটি লাগার ফলে সে রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে পড়ে গেলো।তিন-চার জন ছাত্র মিলে দ্রুত আহত ছাত্রটিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়েগেলো। তুমুল উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। কয়েক মিনিটের মধ্যে উপাচার্য ড.মাহমুদ হোসেন (ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি ড. জাকির হোসেনের ভাই) পরিস্থিতি সামালদেওয়ার জন্য অকুস্থলে হাজির হলেন। জীবনে এই প্রথম একজন উপাচার্যকে সামনাসামনিদেখলাম। এতদিন দূর থেকে শুধু তাঁর নিজ বিষয় ইতিহাসের উপর অগাধ পান্ডিত্য, প্রশাসনিকদক্ষতা, সততা, সবোর্পরি ছাত্রদের প্রতি অপার ভালোবাসা ইত্যাদি মানবিক ও মানসিকগুণাবলীর কথা শুনে এসেছি। আজকে সামনাসামনি হয়ে আর সবার মত আমারও মাথা এমনিতেশ্রদ্ধায় নত হয়ে এলো। তিনি কার্জন হল ভবনের উত্তরমুখি প্রধান ফটকের সামনের বারান্দায়এসে দাঁড়ালেন। পেছনে অন্যান্য অধ্যাপকবৃন্দ। তাঁর চোখ বেয়ে অঝরে পানি ঝরছিলো। মনেহলো, একজন স্নেহময় পিতা তাঁর রক্তাক্ত পুত্রের জন্য কাঁদছেন। অথচ তিনি বাঙ্গালিসমাজের কেউ ছিলেন না। উর্দুভাষী এই পন্ডিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োজিতহবার পূর্বে করাচি বিস্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছিলেন। মনে হলো, একজন দেবদূতের সামনেদাঁড়িয়ে আছি। ডান হাত সামান্য উচু করেসবাইকে শান্ত হতে ইশারা করলেন। মুহূর্তে পিনপতন নিস্তব্ধতা। ছাত্রদের উদ্দেশ্য করেতিনি যা বললেন তার মর্মার্থ হলো, তাঁর একজন প্রিয় ছাত্র আহত হওয়াতে তিনি অত্যন্ত ব্যথিতএবং ক্ষুদ্ধ। ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার মধ্যে থেকে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভকরছিলো। সরকারি বাহিনীর কোনো প্রয়োজন ছিলো না তাদের প্রতি গুলি করার। তিনি বিষয়টিনিয়ে জরুরিভিত্তিতে মাননীয় চ্যান্সেলরের (কুখ্যাত গভর্নর মোনেম খানের) সাথে আলাপকরবেন। সন্তোষজনক জবাব না পেলে তিনি পদত্যাগ করবেন। একই বছর আমি বিশ্ববিদ্যালয়েভর্তি হবার কিছুদিন পর শুনলাম ড. মাহমুদ হোসেন পদত্যাগ করে চলে গেছেন। মোনেম খানেরমত নোংরা রাজনীতিবিদের সাথে ড. মাহমুদের মত আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ভদ্রলোকের মানিয়েচলা সম্ভব ছিলো না।

৪। এর পরের ঘটনা ১৯৬৫সনের সেপ্টেম্বর মাসের। ততদিনে ময়মনসিংহের ড. ওসমান গনি ড. মাহমুদ হোসেনের পরউপাচার্য হয়ে এসেছেন। ড. ওসমান গনিকে গুটিকয়েক এনএসএফ-পন্থী ছাত্র ও মুসলিমলীগপন্থী শিক্ষক ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউই মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারেননি। আমিওপারিনি। হঠাৎ সেপ্টেম্বর মাসের ৬ তারিখ সকালে আমি যে হলে থাকতাম সে হলে একদুর্ঘটনা ঘটে। আমি ওয়েষ্ট হাউসে তিন তলার যে রুমে থাকি তার পাশের গোসলখানার লেট্রিনেরমধ্যে একজন আগন্তুক অতিথি ব্লেড দিয়ে নিজের গলার একপাশ ও শরীরের অন্যান্য কিছুঅঙ্গ কেটে আত্মহত্যা করে। ঠিক একই সময়ে আমি এবং আরও দু’জন ছাত্র পাশের গোসলখানায়শাওয়ার নিচ্ছিলাম। একজন ছাত্র শেভ করছিলো। স্বাভাবিকভাবেই হৈচৈ ও চাঞ্চল্য হলো।পুলিশ এলো, কেইস হলো। এসব কেইসে আজকের অনেক পুলিশের মত তখনকার পুলিশও আমরা যারাঘটনার সময় গোসলখানায় ছিলাম তাদেরকে আসামি বানিয়ে হত্যা মামলা ঠুকে দিলো। শুরু হলোপুলিশি হয়রানি। কথাটা প্রভোস্টের মাধ্যমে উপাচার্য ড. ওসমান গনির কানে গেলো। উপাচার্যনিজ উদ্যোগে ঢাকার তৎকালীন বাঙ্গালি পুলিশ সুপারের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করেন। আরক’দিন বাদেই আমাদের অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা। থানার দারোগারা যেন আমাদের হয়রানি নাকরে সেদিকে নজর রাখার জন্য তিনি পুলিশ সুপারকে অনুরোধ করেন। একদিন সন্ধ্যাবেলাপুলিশ সুপার সিভিল কাপড়ে আমাদের হলে এসে আমাদের সাথে দেখা করলেন। উপাচার্য তাঁকেকি বলেছেন, তা জানালেন। দারোগারা কোনো হ্যারাস করবে না বলে নিশ্চয়তা দিলেন।নিশ্চিন্তভাবে পরীক্ষার পড়া চালিয়ে যাবার জন্য বড় ভাইয়ের মত উপদেশ দিয়ে চলে গেলেন।এরপর মামলার কি হয়েছিলো জানি না, তবে দারোগারা আর আমাদের ধারেকাছে আসেনি। রাজনৈতিকবিবেচেনায় ড. ওসমান গনিকে ভিসি হিসেবে মেনে নিতে না পারলেও আভিভাবক হিসেবে তাঁরঅবদান কখনও অস্বীকার করা যাবে না।

৫। পৃথিবীর সকলপ্রাণীর সন্তান জন্ম নেবার পর খাদ্য ও নিরাপত্তা পেলে নিজেনিজে বেড়ে উঠে বাবামারমত প্রাণীতে পরিণত হয়। একমাত্র মানুষের সন্তান এর ব্যতিক্রম। সে জন্ম নিয়ে একাএকাবড় হয়ে ‘মানুষ’ হতে পারে না। তাকে মানুষ হতে হলে খাদ্য ও নিরাপত্তা ছাড়া আরও কিছুরপ্রয়োজন। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে এই আরও কিছুর কিছুটা সে পায় তার বাবামার কাছথেকে, অনেকটা পায় শিক্ষক বা গুরুর কাছ থেকে, আর কিছুটা পায় সমাজ ও পরিবেশ থেকে।প্রাচীণ গ্রীক দার্শনিক এরিস্টটল বলেছেন: “Those who educate children well are more to be honored thanthey who produce them; for these only gave them life, those the art of livingwell.” (যাঁরা মানবসন্তানকে সুশিক্ষা প্রদান করেন তাঁদেরকে সন্তানের জন্মদাতাদের চাইতে বেশি সন্মানকরতে হবে। কেননা, জন্মদাতরা সন্তানকে কেবল জীবন দান করেন, শিক্ষকরা দান করেন উন্নতজীবন যাপনের কৌশল।) এজন্যই আদিকাল থেকে আজপর্যন্ত পৃথিবীর সব সমাজে গুরুর কাজটি এত কঠিন, গুরুত্বপূর্ণ এবং মর্যাদাসম্পন্ন। একজনছাত্র, তা সে প্রাথমিক অথবা বিশ্ববিদ্যালয় যে পর্যায়ের হোক না কেন, নিজের গুরুনিজে নির্বাচন করে না। পিতামাতা, সমাজপতি এবং রাষ্ট্র তার জন্য কাজটি করে দেয়। আমাদেরদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করছে তার সবগুলোরউপাচার্যকে চূড়ান্ত পর্যায়ে সরকার নিয়োগ দিয়ে থাকেন। পিতামাতা, অভিভাবক ও সমাজেরপক্ষ থেকে সরকার এ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেন। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, আমাদেরনির্বাচিত সরকার প্রধানরা, অন্য প্রায় সব রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যেমন,পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রধান নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তেমন নিজ দলীয় প্রভাব থেকেনিজেকে মুক্ত রাখতে পারছেন না। দেশের স্বার্থের উপর নিজের দলের স্বার্থকে স্থানদিচ্ছেন। নিজ দলের সমর্থক যোগ্য, দক্ষ এবং আত্মমর্যাদাসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েরসিনিয়র অধ্যাপক, যাঁরা সফল উপাচার্য হতে পারতেন, থাকতেও অযোগ্যদের একের পর একউপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এর একটাই কারণ হতে পারে। আর তা হলো, প্রত্যেক সরকারপ্রধানই (যিনি নিজ দলেরও প্রধান বটেন) চান একমাত্র দলবাজ, তল্পিবাহক, মোসাহেব জাতীয়অধ্যাপকরা উপাচার্য নিযুক্ত হন। যাতে করে তাঁরা উপাচার্যদের মাধ্যমে পাবলিকবিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতি এবং শিক্ষক রাজনীতি নিজ দলের নিয়ন্ত্রণে রাখতেপারেন।

৬। সকল সিনিয়র অধ্যাপকউপাচার্য হবার জন্য উপযুক্ত নন। তবে সকল উপাচার্যকে অবশ্যই মেধাবী অধ্যাপক, গবেষকএবং পন্ডিত হতে হয়। কথাটার একটু ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন, নইলে ভুল বোঝাবুঝি হতেপারে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় অন্য যেকোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আলাদা ভূমিকা পালনকরে। অন্য সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাজ প্রধানত: জ্ঞান বিতরণ করা, শিক্ষার্থীকেআলোকিত করা। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ প্রথমত: গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞান সৃষ্টিকরা, সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। দ্বিতীয়ত: শিক্ষার্থীকে জ্ঞান বিতরণের মাধ্যমে শিক্ষিতকরা, এবং আলোকিত করে গড়ে তোলা। এসব কাজে একজন অধ্যাপক চমৎকার নৈপুণ্য অর্জন করতেপারেন। তারপরও তিনি উপাচার্য হবার জন্য উপযুক্ত না-ও হতেপারেন। একজন উপাচার্যকেসফল অধ্যাপক হবার পাশাপাশি একজন দক্ষ প্রশাসক হতে হয়। তাঁর পক্ষে একদিকেবিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যে একাডেমিক নেতৃত্ব প্রদান করে জ্ঞান সৃষ্টিতে ভূমিকাপালন করা জরুরি। তিনি যদি তা না পারেন, বা না করেন, তাহলে তাঁর অধীনস্ত শিক্ষকরাএবং ছাত্ররা তাঁর নেতৃত্ব মন থেকে মেনে নিবেন না। অন্যদিকে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়েরসার্বিক প্রশাসনকর্ম তদারকি করার জন্য একজন দক্ষ প্রশাসক হতে হয়। না হলে,বিশৃঙ্খলা এবং অব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রার দ্বার রুদ্ধ করে দেয়। একজনউপাচার্যকে তাই পান্ডিত্য এবং প্রশাসন উভয় ক্ষেত্রেই দক্ষ হওয়া প্রয়োজন। এযুগেএকজন সফল প্রশাসককে একজন সফল নেতা হতে হয়। সফল নেতা হবার জন্য কী কী গুণ থাকাপ্রয়োজন তা ম্যানেজমেন্টের যেকোনো পাঠ্য বইয়ে পাওয়া যাবে। দক্ষতা, যোগ্যতা ওঅভিজ্ঞতার পাশাপাশি জ্ঞান-বুদ্ধি, বিবেক-বিবেচনা, সততা-সত্যশীলতা,মহানুভবতা-উদারতা এসব গুণের অন্যতম।

৭। আজকাল সরকার বা দলপ্রধানরা মনে করেন, যেসব শিক্ষক তাঁর দলের প্রতি অনুগত থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরাজনীতিতে সফলতা দেখিয়ে শিক্ষক সমিতির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ইত্যাদি পদেনির্বাচিত হন তাঁরা তাঁদের নেতৃত্বের গুণে সফল উপাচার্য হবেন। বিশ্ববিদ্যালয়েশিক্ষক রাজনীতি করে নেতা হতে গেলে যে কতটা দলবাজী,ধোকাবাজী ও মোসাহেবী করতে হয়, তাতাঁরা বিবেচনায় রাখেন না। তাই আমরা দেখতে পচ্ছি, সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একরেপর এক আত্মমর্যাদাহীন দলবাজ, মোসাহেব শিক্ষক উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছেন।ফলশ্রুতিতে অনেক অধ্যাপক পেশাগত কাজে মনোনিবেশ না করে উপাচার্য হবার আশায় শিক্ষকরাজনীতিতে মত্ত হয়ে থাকছেন। যাঁদের বিরুদ্ধে পাঠদান এবং গবেষণাকর্মে ফাঁকি দেওয়া,থিসিস নকল করা, ছাত্রদের পরীক্ষার রেজাল্ট হেরফের করা, ছাত্রী নির্যাতন করাইত্যাদি অভিযোগ শোনা যায়, তাঁদের বেশিরভাগই এমন দলবাজ শিক্ষক। এদের মধ্য থেকে যারাউপাচার্য হন তাঁরা নিজ দলের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের, যাঁরা এসব অপরাধ করেন তাঁদের,কোনো বিচার তো করেনই না, বরং দেখা যায় প্রশ্রয় দিচ্ছেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেদিনদিন বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য ও অপরাধ বেড়ে চলছে।

৮। একটা সময় ছিলো যখনকিছুকিছু গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে, যেমন হাইকোর্টের বিচারপতি, রাষ্ট্রদূত,উপাচার্য ইত্যাদি পদে, নতুন নিয়োগ পাওয়ালোকদের সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত সরকারি উদ্যোগে পত্রিকায় ছাপা হতো। আজকাল তেমনটাআর চোখে পড়ে না। হয়তো আজকাল যাঁরা এসব পদে নিয়োগ পাচ্ছেন তাঁদের পক্ষে রাজনৈতিকবিবেচনা ছাড়া আর কিছুই কাজ করে না। তাঁদের না আছে তেমন যোগ্যতা, গৌরব বা সৌরভ যাজানতে পেরে জনগণ তুষ্টি লাভ করতে পারে। অন্যদের বেলায় না হোক, অন্তত: উচ্চ আদালতেরবিচারপতি ও উপাচার্যদের জীবনবৃত্তান্ত এখনও পত্রিকায় প্রকাশ হওয়া উচিত বলে আমি মনেকরি। বিচারপ্রার্থী ও শিক্ষার্থীদের বিশ্বাস ও আস্থা বাড়াবার জন্য এটার প্রয়োজনকখনও ফুরিয়ে যাবে না।

৯। আমাদের সমাজেআবহমানকাল ধরে সিনিয়র শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের কাছে পিতামাতার মত পূজনীয়। পিতামাতাতাঁর সন্তানকে কোন আইনের বলে শাসন করবেন তা কোনো আইনের বইতে লেখা নেই। এ নিয়েপার্লামেন্টেও আইন পাশ হয় না। তাই বলে কোনো পিতামাতা প্রয়োজনে সন্তানকে শাসন করাথেকে বিরত থাকেন না। কোনো সুসন্তানও সে শাসনের অবাধ্য হয় না এই বলে যে, কোন আইনেলেখা আছে যে তোমরা আমায় শাসন করবে? একইভাবে শিক্ষকরা আমাদের যুগযুগ ধরে আদরেরসাথেসাথে প্রয়োজনে শাসন করে আসছেন। শিক্ষক দু’ভাবে এ শাসন করতে পারেন। পিতামাতারজন্য আইনের বই না থাকলেও, শিক্ষকের জন্য রাষ্ট্র আইনের বই বানিয়ে দিয়েছে। তিনিইচ্ছে করলে আইনের বই দেখিয়ে, গায়ের জোরে, শিক্ষার্থীকে শাসন করতে পারেন। অথবা,তিনি পিতামাতার মত আইন না দেখিয়ে শাসন করতে পারেন। এজন্য পিতামাতা যে কর্তৃত্ববলেসন্তান শাসন করেন শিক্ষককে সে কর্তৃত্ব অর্জন করতে হয়। এ কর্তৃত্ব হচ্ছে পিতামাতারমরাল অথারিটি। অনেকে বলেন ডিভাইন অথারিটি। যা প্রবাহিত হয় পিতামাতার নৈতিক অবব্থান থেকে। একজন শিক্ষক যদি নিজ মানবিকগুণের বলে সে অবস্থানে পৌছতে পারেন, তাহলে শিক্ষার্থী শাসন করার জন্য তাঁকে আইনেরবইয়ের পাতা ঘাটতে হয় না, যেমনটি আজকাল হচ্ছে। আমার সৌভাগ্য, প্রাথমিক বিদ্যালয়থেকে বিশ্ববিদ্যালয জীবনে নৈতিক কর্তৃত্ববান অনেক শিক্ষক আমি পেয়েছি, যাঁরা আমাকেপিতামাতার মত আদর দিয়ে শাসন করেছেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আজও তেমন শিক্ষক আমাদেরবিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আছেন। তবে তাঁরা আত্মমর্যাদা বিসর্জণ দিয়ে দলবাজী করেন না, পদও পদবীর লোভে রাজনৈতিক নেতাদের মোসাহেবী করেন না। কোনো সরকার প্রধান যদি, দলবাজীরউর্ধে উঠে, দলের উপর দেশের স্বার্থকে স্থান দিয়ে, যথাযথ সম্মানের সাথে তাঁদেরকেবিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হবার জন্য আহ্বান করেন তাহলে, সবাই না হলেও, দেশেরস্বার্থের কথা বিবেচনা করে অনেকেই এগিয়ে আসবেন। একমাত্র এভাবেই আমাদেরবিশ্ববিদ্যালয়গুলো বর্তমান অচলাবস্থা থেকে মুক্তি পেতে পারে। বর্তমান ও ভবিষ্যতেরসকল সরকার প্রধানদের কাছে বিনীত প্রার্থনা, যথেষ্ট হয়েছে, আর না। যাঁর কাজ তাঁকে করতেদিন। উপযুক্ত ব্যক্তিদেরকে উপাচার্য নিয়োগ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রক্ষা করুন।জনগণের নির্বাচিত সরকার প্রধান হিসেবে কেবল আপনারাই পারেন দেশটাকে পচন থেকে, ধ্বংশথেকে রক্ষা করতে। (লেখক ঝিনাইদহ ক্যাডেটকলেজ এবং ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ)