Ashraf’s Column

Tuesday, June 10, 2014

ক্যাডেট কলেজের টুকরো স্মৃতি: ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ: পর্ব ১১: কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা

(এক) আর্মিতে অনেক মজার মজার জোক বা চুটকি প্রচলিত আছে। জোকগুলেো সৃষ্টি হয়েছে মূলত: আর্মি জীবনের সুখদু:খের অভিজ্ঞতা থেকে। প্রায় প্রতিটি জোকেরই কিছু-না-কিছু শেখার বিষয় থাকে। এমন একটি বহুল প্রচলিত জোক: One can do a job in three ways. They are the right way, the wrong way, and the army way. The last one is neither right nor wrong but serves the purpose. যার সরল অর্থ করলে দাঁড়ায়, যেকোনো কাজ তিনভাবে করা যেতে পারে। শুদ্ধভাবে, ভুলভাবে এবং আর্মির মতো করে। শেষের প্রক্রিয়াটি শুদ্ধও নয়, ভুলও নয়, তবে কাজ চলে যায় ! সেবার তেমন একটি অভিজ্ঞতা হলো। সকল শ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারিদের নিয়ে কলেজ চত্বরে অন্যান্য গাছের চারার সাথে অনেক কাঁঠাল গাছের চারা লাগিয়েছিলাম। ছোটোবেলা থেকে কাঁঠাল গাছের প্রতি আমার প্রচন্ড রকমের দূর্বলতা ছিলো, এখনও আছে। কাঁঠাল, কাঁচা অথবা পাকা, খাদ্য হিসেবে মানুষের জন্য অত্যন্ত পুষ্টিকর। এর ‘বুচরা’ দুগ্ধবতী গাভীর জন্য খুব পুষ্টিকর। ঘরবাড়ি, ফার্নিচার এমনকি কাঠের সিন্দুক বানাবার জন্য মজবুতি, আঁশ এবং টেক্সচারের দিক থেকে সেগুনের পরই এর স্থান। আর কাঁঠালের পাতা তো গরু এবং ছাগল, বিশেষ করে ছাগলের জন্য প্রবাদসম খাদ্য। ঝিনাইদহ অঞ্চলের মাটি ও জলবায়ু কাঁঠাল গাছের জন্য খুবই উপযোগী। কর্মকর্তা-কর্মচারিদের প্রায় সবাই গরু-ছাগল পুষতেন। তাই সবাইকে ‘দরবারে’ কঠোরভাবে সতর্ক করে দিলাম যেনো কারও গরু-ছাগল দ্বারা কাঁঠালের চারার কোনো ক্ষতি না হয়। মালি ও চৌকিদারদের আদেশ দেওয়া হলো কড়া নজর রাখার জন্য। কয়েকদিন না যেতেই হেড মালি দৌড়ে এসে জানালো অমুক সিনিয়র শিক্ষকের ছাগলকে কাঁঠাল চারার পাতা ভক্ষণরতো অবস্থায় আটক করা হয়েছে। পরবর্তী আদেশ চাই। কলেজের দেয়ালের বাইরে স্থানীয় পৌরসভা পরিচালিত খোঁয়াড় আছে। ধৃত ছাগলটি সেখানে জমা দিলে কিছু নগদ টাকা জরিমানা দিয়ে মালিক সেটা ছাড়িয়ে আনতে পারবে। এতো কিছু বলার পরেও ছাগলের (মালিকের নয়) এমন বেয়াদবি সহ্য হলো না। মনেমনে ভবালাম, এখনই সুযোগ ! বিড়াল পহেলা রাতেই মারতে হবে ! এমন এক্সাম্পল সেট করতে হবে যাতে ক্যাম্পাসের সব গরু-ছাগলের মালিক হেদায়েত হয়ে যায়। হুকুম দিলাম, এখনই জবাই করে ছাগলের গোস্ত পুরোটা ক্যাডেট মেসে দিয়ে দাও। চামড়া বাজারে বিক্রি করে টাকাটা ক্যাডেট মেসের পেটি ক্যাশে জমা করে দাও। যেই কথা সেই কাজ। ছাগলের মালিক বিষয়টি জানার আগেই ছাগলটি গোস্ত হয়ে মেসের ফ্রিজে স্থান পেলো। ছাগলের মালিক যখন জানলেন তখন তিনি আর এ নিয়ে কোনো রা করলেন না। তবে ঘটনাটি ওয়াইল্ড ফায়ারের মতো মানুষের মুখেমুখে শুধু ক্যাম্পসে নয়, ঝিনাইদহ শহরে পৌছে গেলো। সপ্তাহ দু’য়েক পরে মেস ম্যানেজারকে ডেকে জব্দকৃত ছাগলের গোস্তের পরিমান এবং কনট্র্যাক্ট রেটে তার দাম, এবং চামড়ার বিক্রয় মূল্য জেনে নিয়ে পুরো টাকাটা ছাগলের মালিককে দিয়ে দিতে বললাম। টাকাটা পাবার পর ছাগলের মালিক ভদ্রলোক একদিন এসে অতি লজ্জিতভাবে আমার সাথে দেখা করে ক্ষমা চাইলেন। ততোদিনে আমার উদ্দেশ্য হাসিল হয়ে গেছে। এর পর যতোদিন ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজে ছিলাম, কারও গরু বা ছাগলে ক্যাম্পাসের কোনো ফুল বা ফল গাছের পাতা খেয়েছে, এমন খবর কানে আসেনি। (দুই) ১৯৮০ এর দশকের মাঝামাঝি সময়ের কথা। আমি তখন আর্মি হেডকোয়ার্টার্সে কাজ করি। একদিন দুপুর বেলা, তখনও অফিস ছুটি হতে কিছুটা সময় বাকি, আমার স্ত্রী বাসা থেকে টেলিফোন করে জানালেন, ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ থেকে একজন স্টাফ একটি বিশাল পাকা কাঁঠাল নিয়ে এসেছে। বলছে, প্রিনসইপিাল সাহেব পাঠিয়েছেন। এখন কী করবো ? এখানে উল্লেখ্য যে, আমার পুরো চাকুরি জীবনে নিজের ভাইবোন বা নিকট আত্মীয় ছাড়া অন্য কারও আমার বাসায় কোনো মিষ্টির প্যাকেট, ফলের ঝুড়ি বা অন্য কিছু নিয়ে আসা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিলো। না জেনে যদি কেউ এনে ফেলে তবে তা বিনয়ের সাথে প্রত্যাখ্যান করা হতো, আমি বাসায় থাকি বা না থাকি। বাংলাদেশের প্রক্ষিতে এর কারণ ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। আমার ছেলেমেয়েদের বিয়ের অনুষ্ঠানে বা জন্মদিনে আমি সতর্কতার সাথে সেসব লোকদের আমন্ত্রণ জানাতে বিরত থেকেছি যাদের সাথে আমার অফিসের দূরতম কোনো ব্যাবসায়িক সম্পর্ক ছিলো। কাঁঠাল বহনকারিকে বারান্দায় বসিয়ে রাখতে বলে আমি টেলিফোনে ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের তৎকালীন প্রিন্সিপাল লে: কর্নেল নূরুন্নবীকে (পরে কর্নেল, বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। ঢাকার মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজের প্রতিষ্ঠাতা।) টেলিফোন করে বিষয়টি জানতে চাইলাম। প্রিন্সিপাল আমারই কোরের অতি ঘনিষ্ট জুনিয়র কলিগ ছিলো। টেলিফোনে প্রথমেই তাকে প্রচন্ড কিছু বকা (ঝাড়ি) দিলাম। বললাম, তুমি তো ভালো করে জানো আমি আমার বাসায় কারো এসব আমকাঁঠাল আনা একেবারে অনুমেোদন করি না। তারপরও সব জেনেশুনে কেনো আমার বাসায় কাঁঠাল পাঠিয়েছো ? পাঠাবার আগে কেনো আমার অনুমতি নেওনি ? আমার পক্ষ থেকে বকাঝকা শেষ হলে নবী বললো, স্যার, আপনার সব কথা মেনে নিলাম। এবার দয়া করে আমার কথা একটু শুনুন। আপনি প্রিন্সিপাল থাকার সময় যে কাঁঠালের চারা লাগিয়ে গিয়েছিলেন সেগুলোতে এবার প্রথম ফল ধরেছে। কলেজের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারিদেরকে তাদের পরিশ্রমের স্বীকৃতি হিসেবে প্রথম ফলনের সব কাঁঠাল নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিতে বললাম। তারা সবাই এক বাক্যে বললো, এসব কাঁঠাল গাছ প্রাক্তন প্রিন্সিপাল আশরাফ স্যার নিজ উদ্যোগে আমাদের উৎসাহ ও প্রেরণা দিয়ে লাগিয়েছিলেন। এর মধ্যে আনেক গাছ তিনি নিজ হাতে লাগিয়েছিলেন। এসব গাছের কাঁঠাল তাঁকে না দিয়ে আমারা খেতে পারবো না। উনি এখন ঢাকায় আছেন। ওনার জন্য অন্তত: একটি কাঁঠাল হলেও পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক। নবী আরও বললো, এটা কর্মচারিদের আন্তরিক আনুরোধ ছিলো, যা ফেলে দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিলো না। আপনার প্রাক্তন কর্মচারিদের আপনার প্রতি সম্মান ও ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে কাঁঠালটি আপনাকে পাঠিয়েছে। এতে আমার কোনো ভূমিকা নেই। এখন রাখা না রাখা আপনার ইচ্ছে। রাখতে না চাইলে বহনকারির হাতে ফেরত পাঠিয়ে দিন। আমি কর্মচারিদের সেভাবে বলে দেবো। আর পূর্বানুমতির কথা যদি বলেন, তাহলে বলবো, কাজটি আমি জেনেশুনে করেছি। অনুমতি চাইলে আপনি কখনও তা দিতেন না। এরপর আমার পক্ষে কাঁঠালটি ফিরিয়ে দেওয়া আর সম্ভব হলো না। ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের কর্মচারিদের প্রতি কৃতজ্ঞতায় আমার মন ভরে গেলো। নবীকে বললাম, কাঁঠাল রেখে দিলাম। ওদেরকে আমার কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানিয়ে দিও। আমার ও আমার পরিবারের সদস্যদের জন্য দোয়া করতে বলো। অফিস থেকে বাসায় এসে কাঁঠাল বহনকারিকে নিয়ে একসাথে লাঞ্চ করে একই কথা বলে তাকে বিদায় জানালাম। জীবনে অনেক কাঁঠাল খেয়েছি। কন্তু সেদিনের মতো তৃপ্তি নিয়ে কোনো কাঁঠাল খেয়েছি বলে মনে পড়ে না। (তিন) তখনকার ক্যাডেট কলেজের ক্যাডেটদের জন্য নির্ধারিত দন্ডবিধিতে অপরাধকে দুই শ্রেণীতে ভাগ করা ছিলো। এক, মেজর অফেন্স অর্থাৎ বড় অপরাধ। দুই, মাইনর অফেন্স অর্থাৎ ছোটো অপরাধ। কোনো ক্যাডেট বড় কোনো অপরাধ করলে তাকে কলেজ থেকে অবশ্যই ‘উইথড্র’ বা বহিস্কার করার হুকুম ছিলো। ধূমপান বড় অপরাধ বলে গণ্য হতো। একাদশ শ্রেণীর একটি ছেলে ধূমপান করে ধরা পড়লো। দন্ডবিধি অনুযায়ী তাকে কলেজ থেকে ‘উইথড্র’ করার আদেশ দিলাম। ছেলেটির বাবা নিকটস্থ কোনো এক জেলা বারের এডভোকেট ছিলেন। তিনি এসে ভাইস প্রিন্সিপাল মি: রবকে এসে ধরলেন। যখন দেখলেন কোনো যুক্তিতে কাজ হচ্ছে না তখন তিনি এক মজার যুক্তি দেখালেন। বললেন, আজকাল পৃথিবীর সবাই সিগারেট খায়। আমার ছেলে না হয় একটু খেয়েছে। তাতে এমন কী হয়েছে ? তাই বলে আপনারা তাকে কলেজ থেকে বের করে দেবেন ! এটা অন্যায়। মি: রব জবাবে যা বলেছিলেন তা আজও আমার মনে আছে। তিনি বলেছিলেন, পৃথিবীর সবাই বিয়ে করে। যান, আপনার ছেলেকেও এখনই বিয়ে দিয়ে দিন ! (৪) বেয়াদবি করার জন্য হাউস মাস্টার একটি ছেলেকে বকা দিলেন। ছেলেটি ক্ষেপে গিয়ে হাউস মাস্টারকে খুব অভদ্র ভাষায় পাল্টা গালি দিলো। ছেলেটির আপন চাচা আর্মির সিনিয়র অফিসার ছিলেন। সে ভেবেছিলো তাকে কোনো কঠোর সাজা দেওয়া যাবে না। ছেলেটিকে পত্রপাঠ ‘উইথড্র’ বা বহিস্কার করে বাড়ি পাঠিয়ে দিলাম। ছেলেটির চাচা, যিনি আমার সিনিয়র এবং পরিচিত ছিলেন, আমাকে টেলিফোনে বহুবার অনুরোধ করলেন ‘উইথড্রয়াল’ বাতিল করার জন্য। তাঁকে আমি বুঝালাম, ক্যাডেট কলেজ বিধি অনুযায়ী একবার কোনো ক্যাডেটকে কলেজ থেকে বহিস্কার করা হলে তাকে ফিরিয়ে আনার কোনো বিধান নেই। ছেলেটির বাবা যিনি যশোর জেলা বারের উকিল ছিলেন জেলা জজের আদালতে আমার বিরুদ্ধে মামলা করে দিলেন। প্রথমে আমি মামলার খবর জানতাম না। একদিন অন্য আর একজন যশোরের গার্ডিয়ান, যিনি নিজে উকিল ছিলেন, আমার অফিসে এসে মামলার খবর জানিয়ে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলেন। সব শোনার পর তিনি খুব দু:খ প্রকাশ করে মামালার জন্য কোনো চিন্তা না করতে বললেন। মামলার দিন আমার আদালতে হাজির হবার প্রয়োজন নেই। আমার পক্ষ নিয়ে তিনি বিনা পারিশ্রমিকে মামলায় লড়বেন বলে আশ্বস্ত করলেন। পরে শুনেছিলাম জজ সাহেব মামালা কোনো শুনানি না করে এই বলে খারিজ করে দেন যে, কোনো শিক্ষক যদি তাঁর ছাত্রকে বেয়াদবির জন্য শাস্তি দিয়ে থাকেন তাহলে যথার্থ কাজটিই করেছেন। এজন্য শিক্ষকদেরকে যদি আমরা বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে শুরু করি তাহলে দেশটি শিক্ষিত বয়াদবে ভরে যাবে। সমাজে শিক্ষিত ভদ্রলোক আর পাওয়া যাবে না। (৫) দুর্ঘটনায় স্থানীয় সরকার পক্ষীয় এম পি সাহেবের ভাগ্নে আহত হয়েছে। তাকে যশোর সদর হাপাতালে নিয়ে যেতে হবে। ভাইস প্রিন্সিপাল মি: রব তাঁর পরিচিত হওয়ায় এম পি সাহেব টেলিফোন করে কলেজের এম্বুলেন্স দ্রুত পাঠাতে বললেন। মি: রব জানালেন, কলেজের এম্বুলেন্স শুধুমাত্র অসুস্থ ক্যাডেটদের পরিবহনের জন্য। বিধি অনুযায়ী অন্যদের প্রয়োজনে এটা ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। তারপরও এম পি সাহেব আমাকে টেলিফোন করলেন। আমিও একই জবাব দিলাম। এম পি সাহেব ভীষণ ক্ষেপে গিয়ে আমাকে অভদ্র ভাষায় গালি দিয়ে বললেন, আমাকে তিনি দেখে নিবেন। মহামান্য প্রেসিডেন্টের কাছে আমার বিরুদ্ধে নালিশ করবেন। আমি তাঁকে ঠান্ডা মাথায় স্মরণ করিয়ে দিলাম, মহামান্য প্রসিডেন্ট আমাকে কাকুল মিলিটারি একাডেমি থেকে চিনেন। উনিই আমাকে প্রিন্সিপাল হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। আমাদের দুর্ভাগ্য শুধুমাত্র রাজনীতি করার জন্য তাঁর মতো একজন ভালো মানুষকে আপনার মতো একজন বাজে লোকের সাথে রাজনৈতিক সম্পর্ক রাখতে হচ্ছে। যাহোক, বিষয়টির এখানে সমাপ্তি ঘটে। মহামান্য প্রেসিডেন্টের অফিস থেকে কেউ কোনো দিন এ নিয়ে আমাকে কোনো প্রশ্ন করেনি। (৬) আমার বড় মামার ছোটো ছেলে ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হবার জন্য লিখিত পরীক্ষা দিলো। তখনকার রেওয়াজ অনুযায়ী ৫০ জন প্রার্থীকে চূড়ান্তভাবে সিলেক্ট করার জন্য লিখিত পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে কমবেশি ১৫০ জন প্রার্থীকে মৌখিক পরীক্ষা এবং মেডিক্যাল টেস্টের জন্য ডাকা হতো। দেখা গেলো আমার মামাতো ভাইটি মাত্র তিন নম্বর কম হবার কারণে মৌখিক পরীক্ষার জন্য কোয়ালিফাই করছে না। এখানে বলা যেতে পারে, তখনকার দিনে আমাদের কোনো কম্প্যুটার ছিলো না। দাদার আমলের টাইপরাইটার ছিলো সকল দাপ্তরিক কাজের জন্য একমাত্র ভরষা। ভর্তি পরীক্ষার টেবুলেশন করা, মেধা তালিকা প্রস্তুত করা, ইত্যাদি সকল কাজ নিরাপত্তা বজায় রেখে নিজ দায়িত্বে প্রিন্সিপালকে করতে হতো। সাধারণত: এ কাজে কেরানিদের সম্পৃক্ত করা হতো না। প্রিন্সিপাল নিজে অতি বিশ্বস্ত এক-দুজন শিক্ষককে সাথে নিয়ে কাজটি করতেন। সেবার আমার মামাতো ভাই ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিলো, এ কথা আমি ছাড়া আর কারও জানা ছিলো না। আমি ইচ্ছে করলে লিখিত পরীক্ষার মেধা তালিকায় তিন নম্বর নিচে নেমে আমার ভাইকে মৌখিখ পরীক্ষার জন্য ডাকতে পারতাম। সেটা করলে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ১৫০ জনের বদলে ১৫৭/১৫৮ জন কোয়ালিফাই করতো। কখনও কখনও, বিশেষ যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীকে (যেমন ভালো খেলোয়াড়, অভিনেতা ইত্যাদি) সুযোগ দেওয়ার জন্য, এমন করা যে হতো না, তা নয়। প্রক্রিয়াগত দিক থেকে কাজটা করা তেমন অনিয়ম বা অন্যায় হতো না। কারও চোখেও পড়তো না। পরে মৌখিক পরীক্ষায় অনেক বেশি নম্বর প্রদান করে ভাইকে চূড়ান্তভাবে সিলেক্ট করা যেতো। কিন্তু আমার বিবেক সায় দিলো না। সবাইকে না হয় ফাঁকি দিলাম, আল্লাহকে তো ফাঁকি দেওয়া যাবে না ! যাহোক, কাজটি করিনি। এ নিয়ে কারও সাথে কথাও বলিনি। আমার কোনো অনুশোচনাও ছিলো না। রেজাল্ট বের হবার পর বড় মামা যখন দেখলেন তাঁর ছেলে পাশ করেনি, তখন তিনি মনে খুব আঘাত পেয়েছিলনে। গ্রামের লোকেরা ইতোমধ্যে মামাকে কংগ্রাচ্যুলেট করতে শুরু করেছিলো। আপন ভাগ্নে ক্যাডেট কলেজের প্রিন্সিপাল। তাঁর ছেলেকে আটকায় কে ? এ ঘটনার পর মামা আমার উপর অভিমান করে প্রায় এক বছর আমার বাসায় আসেননি। পরবর্তী কালে আমার সেই মামাতো ভাইটি ঢাকা কলেজ থেকে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে এইচ এস সি পাশ করে আর্মিতে কমিশন লাভ করে। বর্তমানে সে একজন কর্মরত সিনিয়র অফিসার।

Monday, June 02, 2014

ক্যাডেট কলেজের টুকরো স্মৃতি: ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ: পর্ব ৮: দুষ্টামির পক্ষে ওকালতি !

ক্যাডেট কলেজের টুকরো স্মৃতি: ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ: পর্ব ৮ দুষ্টামির পক্ষে ওকালতি ! আমাকে যাঁরা ব্যক্তিগতভাবে চেনেন তাঁরা হয়তো এই লেখার শিরোনাম দেখে বলবেন, বুঝেছি, নিজে দাদা-নানা হয়েছো তো, তাই ছোটোদের হয়ে ওকালতি করতে এসেছো ! কথাটা পুরো না হলেও অনেকটা সত্যি। বিষয়টি গভীরে গিয়ে বুঝার জন্য আমাকে কিছুটা বুড়ো হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে বৈ কি! কিছুটা নিজের নাতিনাতনিদের দেখে, কিছুটা মাস্টারি জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে এবং বাকিটা পড়াশুনা করে যা জেনেছি, আজকে তা-ই পাঠকদের সাথে শেয়ার করতে চাই। ছোটোদের যে ক’টি সহজাত প্রবৃত্তি আছে তার মধ্যে দুষ্টামি অন্যতম। মোটামুটি পাঁচ বছর বয়স থেকে শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ঘটে। এজন্য শিক্ষা মনোবিজ্ঞানীরা পাঁচ বছর বয়স হবার আগে বাচ্চাদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষাদান অনুমোদন করেন না। পাঁচ বছর বয়স থেকে শিশুরা অল্পঅল্প ভালোমন্দ, কী করলে কী হতে পারে এসব বুঝতে শেখে। আর তখন থেকে দুষ্টামি করা শুরু হয়। দুষ্টামি করার নানা উদ্দেশ্য হতে পারে। নির্দোষ আনন্দ বা তামাসা করার জন্য হতে পারে। কোনো কঠিন কাজ বা চালাকি করে নিজের বাহাদুরি দেখাবার জন্য হতে পারে। কখনও বড়দের উপর রাগ প্রকাশ করার জন্য, বা প্রতিশোধ নেবার জন্য হতে পারে। মায়ের উপর রাগ করে সব আচার খেয়ে ফেলে বয়াম খালি করে ফেলা আমাদের ছোটোবেলায় খুব কমন দুষ্টামি ছিলো। উদ্দেশ্য যা-ই হোক, দুষ্টামি করতে হলে বুদ্ধি লাগে। দুষ্টামি করতে হলে লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হয়। প্ল্যান করতে হয়। প্ল্যান কার্যকর করার একাধিক পন্থা থেকে সবচাইতে কার্যকরটি বেছে নিতে হয়। এসব কিছু করার জন্য চিন্তাধারার মধ্যে সংগতি (coherence) ও ধারাবাহিকতা (continuity) রাখতে হয়। দুষ্টামির পরিণতি দেখার জন্য বা উপভোগ করার জন্য অবশ্যই কাউকে না কাউকে টার্গেট বা লক্ষ্য স্থীর করা হয়। বোকারা দুষ্টামি করতে পারে না। করলেও তা দুষ্টামি না হয়ে বোকামি হয়। ছোটোদের মধ্যে যার যতো বেশি বুদ্ধি তার দুষ্টামি ততো তীক্ষ্ন ও ফলপ্রসূ হয়। বড়দের উচিত হবে, দুষ্টামি যাতে নিরাপত্তা ও ভদ্রতার সীমার মধ্যে থাকে সে সম্পর্কে ছোটোদের সচেতন করা। এজন্য মারধর বা বকাঝকা না করে বন্ধুর মতো প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও উৎসাহ দেওয়া। একটা কথা মনে রাখা জরুরি, দুষ্টামি বখাটে হবার লক্ষণ নয়, বুদ্ধিমত্তার লক্ষণ। ইস্, আমাদের ছোটো বেলায় মাবাবারা যদি বিষয়টা জানতেন! তাহলে অনেক মারপিট থেকে রক্ষা পেতাম ! ছোটোবেলায় লেখাপড়ার জন্য মারপিট খেতে হয়নি। যা খেয়েছি তার সবটাই ছিলো দুষ্টামি করার জন্য। এখন কথা হলো, ছোটোরা কতো বয়সে বড় হয় ? এ প্রশ্নের কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর নেই। স্থান, কাল, সমাজ ভেদে ছোটোদের মধ্যে বুদ্ধি বিকাশের তারতম্য ঘটে। বাংলাদেশের বারো বছর বয়সী একটি ছেলে একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সাধারনভাবে যে প্রতিক্রিয়া দেখাবে, ইউরোপ, আমিরিকা বা আফ্রিকার একই বয়সী একটি ছেলে অভিন্ন পরিস্থিতিতে সে প্রতিক্রিয়া দেখাবে না। আমাদের সমাজে বর্তমানে ছোটোদের বয়স কমবেশি ১৫/১৬ বছর হয়ে গেলে তারা দুষ্টামির বয়স পার করে ফেলে বলে মনে করা হয়। এবার আসা যাক দুষ্টামির সীমানা কতদূর গিয়ে শেষ হয়ে সেটা বদমাশির পর্যায়ে চলে যায়। দুষ্টামির উদ্দেশ্য যদি হয় কাউকে শারীরিক বা মানসিকভাবে কষ্ট দেওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত করা তাহলে সেটা আর দুষ্টামি থাকে না, বদমাশি হয়ে যায়। বদমাশিকে কখনও হাল্কাভাবে নেবার উপায় নেই। কেউ বদমাশি করলে তাকে সেজন্য কমবেশি সাজা পেতে হবে। সে সাজা সামান্য ভর্ৎসনা থেকে শুরু হতে পারে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর থেকে আমাদের উঠতি বয়সের ছেলেরা অনেকে একটি বিশেষ ধরনের বদমাশি কাজ করে আসছে। আর তা হলো মেয়েদের নানাভাবে উত্যক্ত করা। এমনকি রাস্তাঘাটে প্রকাশ্যে মেয়েদের কাছে জোর করে প্রেম নিবেদন করা, তাদের গায়ে হাত দেওয়া, মেরে জখম করা, ডিজিটাল টেকনোলজির মাধ্যমে ইন্টারনেটে আপত্তিকর ছবি প্রকাশ করা ইত্যাদি। আমাদের সময়ের দেখেছি, উঠতি বয়সের ছেলেরা কেউকেউ খেলাধুলা, লেখালেখি, গানবাদ্য, নাটক-থিয়েটার, বিতর্ক-আবৃত্তি প্রতিযোগিতা, এসব বিভিন্ন কর্মকান্ডসহ নানা সৃজনশীল কর্মে অংশ গ্রহণ করে এবং তাতে উৎকর্ষ অর্জন করে সমবয়সী মেয়েদের মন জয় করার চেষ্টা করতো। তাতে কপাল ভালো হলে কোনো কোনো মেয়ে পটে যেতো, প্রেমে পড়ে যেতো। কোনো একজন মেয়ে প্রেমে না পড়তে চাইলে, তার পিছে ঘুরে সময় নষ্ট না করে, ছেলেটি অন্য মেয়ের কাছে প্রেম নিবেদন করতো। কিন্তু প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার কারণে একটি মেয়ের সর্বনাশ করা, জীবননাশ হোক এমন বদমাশি করা তো দূরের কথা, কাউকে এমন ভাবতেও দেখিনি। একটি ছেলে যদি নিজের ব্যক্তিগত সাফল্য এবং অর্জন দিয়ে কোনো মেয়ের মন জয় করার যোগ্যতা লাভ করে তাহলে তাকে কোনো মেয়ের মন পাবার জন্য মেয়েদের স্কুল-কলেজের গেইটে তীর্থর কাকের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে হতো না। অথবা, মোটর সাইকেলে চড়ে মেয়েদের রিক্সার পেছনে ঘুরঘুর করতে হতো না, রিক্সার ফাক দিয়ে বেড়িয়ে আসা মেয়েদের ওড়না ধরে টানাটানি করতে হতো না। এসব কারণে আমরা বড়রা শুধু ছেলেদের মন্দ বলি, গালাগালি করি। কিন্তু বয়সের কারণে জাগ্রত তাদের প্রেমের বাসনা চরিতার্থ করার কোনো সুস্থ শালীন আউটলেটের বা পথের সন্ধান দিতে পারছি না। যাঁরা রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার দায়িত্বে আছেন, আশা করি, বিষয়টি ভেবে দেখবেন। স্কুল-কলেজগুলিকে শুধুমাত্র জিপিএ ফাইভ পাবার কারখানা না বানিয়ে সেখানে যাতে সকল প্রকার কো-কারিকুলার এক্টিভিটির চর্চা করা হয় তার ব্যবস্থা করলে এসব বদমাশি বহুলাংশে কমে যাবে। তারুণ্যের অমিত শক্তি ও সম্ভাবনাকে শুধু লেখাপড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাকে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ করে দিতে হবে। ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজে আমার থাকাকালীন সময়ে সংঘটিত ছেলেদের একটি দুষ্টামির ঘটনা বলে এবারের লেখা শেষ করতে চাচ্ছি। ক্যাডেট মেসের সামনে একটি ছোট্ট সবুজ লন ছিলো। ক্যাডেটদের মনোরঞ্জনের জন্য তাতে বিভিন্ন রংয়ের কিছু গার্ডেন লাইট লাগিয়েছিলাম। একদিন সকাল বেলা হঠাৎ রিপোর্ট পেলাম কে বা কারা সবগুলো লাইট ভেংগে ফেলেছে। বুঝতে অসুবিধা হলো না, ছেলেরা প্রশাসনের কারো কোনো কথায় বা কাজে রুষ্ট হয়ে এমনটি করেছে। ছেলেরা ভাবলো, প্রিন্সিপাল সাহেব নিশ্চয়ই রেগেমেগে ভয়ংকর কিছু একটা করবেন। পক্ষান্তরে আমি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালাম না। ভাবখানা এমন দেখালাম যে কিছুই হয়নি। খবর পেলাম, একাদশ শ্রেণীর ক্যাডেটরা মেসের ভারপ্রাপ্ত অফিসারকে অনুরোধ করেছিলো মেনুর বাইরে কিছু খাবার আইটেম দেওয়ার জন্য, যা তিনি যথার্থ কারণে দিতে অস্বীকার করেন। যাহোক, পরবর্তী সাপ্তাহিক সমাবেশে আমি বিষয়টি উল্লেখ করে ক্যাডেটদের উদ্দেশ্যে বললাম, আমি তোমাদের মনোরঞ্জনের জন্য মেসের লনে গার্ডন লাইট লাগিয়েছিলাম। তোমাদের কেউকেউ সেটা পসন্দ করোনি। তাই ভেংগে ফেলেছো। কষ্ট করে ভাংগার দরকার ছিলো না। আমাকে বললে আমিই খুলে ফেলতাম। আর যদি তোমাদের মধ্যে কারো আত্মীয়ের ঝিনাইদহ শহরে ইলেকট্রিক সরঞ্জামের দোকান থেকে থাকে, এবং তার পৃষ্ঠপোষকতা করার জন্য কেউ লাইটগুলো ভেংগে থাকো, তাহলে জেনে রাখো, আমি নতুন করে আর এসব লাইট লাগাবো না। তাছাড়া নতুন লাইট লাগাবার জন্য যে টাকা খরচ হবে সে টাকা নতুন করে সরকার কলেজকে দেবে না। বাজেটে যা টাকা দেওয়া হয়েছে সেখান থেকে এ অতিরিক্ত খরচ মেটাতে হবে। তাতে তোমাদের অন্যান্য প্রয়োজন মেটাবার জন্য যেমন খাবার, জামাকাপড়, বইপত্র, খেলার সামগ্রী ইত্যাদি ক্রয়ের জন্য যে টাকা বরাদ্দ আছে সেটাতে টান পড়বে। কোনোরকম চমক ছাড়া সেদিনের সমাবেশ শেষ হলো। তিনচার দিন পরের কথা। একাদশ শ্রেণীর পক্হ থেকে পাঁচছ’জন ক্যাডেট এলো আমার অফিসে দেখা করতে। তারা বললো, স্যার, গার্ডেন লাইটগুলো আমরা ভেংগেছি। মেসের ভারপ্রাপ্ত আফিসারকে আমরা একটা অনুরোধ করেছিলাম। তিনি তা রাখেননি। আমরা খুব ক্ষুদ্ধ হয়ে লাইটগুলো ভংগেছি। কাজটি করা আমাদের উচিত হয়নি। আমরা দু:খিত। এবারের মতো আমাদের মাফ করে দিন। দয়া করে লাইগুলো লাগিয়ে দিন। ভবিষ্যতে আর এমন হবে না। আমি ছেলেদের চোখেমুখে আন্তরিক অনুতাপের ছায়া দেখলাম। হেসে দিয়ে বললাম, বিষয়টি বুঝতে পারার জন্য ধন্যবাদ। মন্দ কাজ করার পর নিজ থেকে অনুতপ্ত হওয়ার পর আর বলার কিছু থাকে না। এবার ক্লাসে যাও। আগামীকালের মধ্যে লাইটগুলো যাতে লেগে যায় সে ব্যবস্থা করা হবে। এ ঘটনার পর কোনো ক্যাডেট সচেতনভাবে কলেজের কোনো সম্পত্তি বিনষ্ট করেছে বলে শুনিনি।

ক্যাডেট কলেজের টুকরো স্মৃতি: ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ: পর্ব ১০: ক্যাডেটের কান্না

রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি’ নামক ছোটো গল্পটি যাঁরা পড়ছেন তাঁদের গল্পেটির প্রধান চরিত্র ফটিকের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে। ক্যাডেট কলেজে ছেলেরা যখন প্রথম এসে ভর্তি হয় তখন তাদের বয়স, স্বভাব এবং অনুভূতি ফটিকের মতোই থাকে। এই বয়সের বাচ্চারা ভীষণ স্নেহের কাংগাল হয়। মাবাবা, ভাইবোন থেকে দূরে চলে গেলে অল্প দিনের মধ্যেই তাদের জন্য কাতর হয়ে পড়ে। ক্যাডেট কলেজে রাত্রি সারে দশটায় (শীতকালে দশটায়) লাইটস আউট হয়। অর্থাৎ হাউসের সিকিউরিটি লাইট ছাড়া বাকি সকল বাতি নিভিয়ে ফেলতে হয়। ডিউটি মাস্টাররা একটা রাউন্ড দিয়ে যারযার ঘরে ফিরে যান। নাইটগার্ডরা পাহারায় থাকে। প্রায় প্রতি রাত্রে এগারোটার দিকে আমি পায়ে হেঁটে রাউন্ড দিতে বের হতাম। সংগে কাউকে রাখতাম না। ঝিনাইদহে রাতের বেলা সাঁপের খুব উপদ্রব ছিলো। সাঁপের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য হাতে একটি টর্চ এবং ছোটো লাঠি রাখতাম। কারও ঘুমের যাতে ব্যাঘাত না হয় সেজন্য পায়ে নরম রাবার সোলের জুতা থাকতো। ক্যাডেটদের ডর্মিটরির ভেতর দিয়ে হেটে যাবার সময় লেপের তল থেকে প্রায়ই জুনিয়র ক্যাডেটদের, বিশেষ করে নবাগতদের, ফুঁপিয়েফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ শুনতে পেতাম। তখন আমার মনটা খুব খারাপ হয়ে যেতো। মনে পড়ে যেতো, আমি নিজেও বাইশ বছর বয়সে সুদূর কাকুলের মিলিটারি একাডেমিতে গিয়ে প্রথম প্রথম লাইটস আউটের পর বিছানায় শুয়ে বাড়ির কথা মনে করে কত না কেঁদেছি। কান্ন্ররত ছেলেটির হাউস মাস্টারকে পরদিন সকালে অনুরোধ করতাম ছেলেটির বিশেষ যত্ন নিতে। অবশ্য ছেলেটি যাতে জানতে না পারে আমি তার কান্না শুনেছি। ব্যাক্তিগতভাবে আমার আরও একটি কাজ করতে ভালো লাগতো। তা হলো, কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ক্যাডেটদের দেখতে যাওয়া। সব সময় প্রায় দশবারোজন অসুস্থ ক্যাডেট হাসপাতালে ভর্তি থাকতো। আমার মনে পড়তো, ছোটো বেলায় অসুস্থ হলে আমার মা কতো কাতর হতেন। আমার মায়ের ফ্রিজ ছিলো না। আমার পসন্দ হতো না বলে একটার পর একটা কতো কী ফ্রেশ রান্না করে আমাকে খেতে দিতেন। আদর করে গায়েমাথায় কতো হাত বুলিয়ে দিতেন। যেমনটি সব বাংগালি মা আবহমান কাল ধরে করে আসছেন। অথচ অসুস্থ ক্যাডেটরা শুয়েশুয়ে হাসপাতলের ছাদ দেখছে। কেউবা বই পড়ে সময় কাটাচ্ছে। মেস থেকে রান্না করা যে খাবার আসে তা-ই খাচ্ছে, ইচ্ছা হোক বা না হোক। বিষয়টি নিয়ে আমার স্ত্রীর সাথে আলাপ করলাম। প্রসঙ্গত: বলা যেতে পারে ক্যাডেট কলেজে যখন আসি তখন আমার স্ত্রী রুমী ক্যাডেট কলেজের পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নিজের লাইফস্টাইল সম্পূর্ণ বদলে ফেলে। যতো সৌখিন কাপড় আর গয়নাপাতি ছিলো, যা কলেজে পড়া ঠিক হবে, না তা সব সুটকেসে বন্ধ করে রেখে দেয়। তার যুক্তি, ছেলেরা প্রিন্সিপালের স্ত্রীকে মায়ের মতো দেখতে চাইবে, সিনমার নায়িকাদের মতো নিশ্চয়ই নয়। ছাত্রীজীবনে নিজের কলেজের প্রিন্সিপাল আপাদের কথা মনে করে তার মনে এমন চিন্তা এসেছে। সে যে এতো সহজে নিজেকে একজন সিনিয়র আর্মি অফিসারের স্ত্রীর অবস্থান থেকে একজন সাদামাটা বাংগালি মায়ের অবস্থানে নিয়ে আসবে, তা ভাবতে পারিনি। বিষয়টি কলেজের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারি, বিশেষ করে ক্যাডেটদের, মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলো। কলেজের সকল চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারিদের বলা হলো, প্রিন্সিপালের স্ত্রীকে “ম্যাডাম” বা “বেগম সাহেবা” বলে সম্বোধন করা যাবে না। “আম্মা” বলে ডাকতে হবে। শিক্ষাটি রুমী, যার বাবা বৃটিশ আমল থেকে একজন প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড অফিসার ছিলেন, তার মার কাছ থেকে পেয়েছিলো। প্রথম যেদিন বিকেল বেলা রুমীকে নিয়ে কলেজ হাসপাতালে গেলাম সেদিন সে রোগীদের জন্য নিজহাতে বানিয়ে কিছু কেইক-বিস্কুট সংগে নিয়ে গিয়েছিলো। হাসপাতালের ছেলেরা সেগুলো পেয়ে এতো খুশি হয়েছিলো যে তা দেখার মতো ছিলো। এর পর থেকে প্রায় প্রতিদিন হাসপাতালে ভর্তি ছেলেদের দেখতে যেতো। তাদের সাথে তাদের বাড়ির গল্প করতো। কেউ মাথা ব্যাথা করছে বললে তার মাথায় সস্নেহে হাত বুলিয়ে দিতো, বিশেষ করে ছোটো বাচ্চাদের। কার কী খেতে মন চাইছে জেনে নিয়ে বাসায় ফিরে সে অনুযায়ী বাজার করিয়ে পরের দিন রান্না করে নিয়ে যেতো। কেউ ট্যাংরা মাছের তরকারি, কেউ কেচকি মাছের চর্চরি, কেউবা শুটকির ভর্তা, এমন সব খেতে চাইতো যা ক্যাডেট মেসে রান্না হয় না। এরপর, কোনো ক্যাডেট অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে তার বন্ধুরা ঠাট্টা করে বলতো, যা যা কয়েকদিন আরাম করে প্রিন্সিপাল স্যারের বাসার রান্না খেয়ে আয় ! কখনও কখনও, প্রয়জোন মনে হলে, কোনো বাচ্চার অসুখ নিয়ে রুমী মেডিকেল অফিসারের সাথেও আলাপ করতো। অল্প দিনের মধ্যে ক্যাডেটরা রুমীকে নিজ পরিবারের একজন সদস্য বলে মনে করতে লাগলো। ব্যাপারটি আমার কাছেও ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছে ! একজন মা চিরদিনই মা, তা তিনি যেখানই থাকুন না কেনো।

ক্যাডেট কলেজের টুকরো স্মৃতি: ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ: পর্ব ৯

ভালো ছেলের সহসা মন্দ হয়ে যাওয়া ধরা যাক ছেলেটির নাম রফিক, ক্যাডেট রফিক (সংগত কারণে এটি তার আসল নাম নয়)। পড়াশুনায় অত্যন্ত মেধাবী। মাধ্যমিক পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধা তালিকায় প্রথম দশজনের মধ্যে ছিলো। কলেজ হকি, ক্রিকেট এবং বাস্কেটবল টীমের অপরিহার্য খেলোয়াড়। ইংরেজি এবং বাংলা বক্তৃতা ও আবৃত্তিতে অসাধারন পারফর্মার। একজন দক্ষ ও কার্যকর ফর্ম (ক্লাস) লীডার। এক কথায়, আউটস্ট্যান্ডিং ক্যাডেট। মনেমনে ঠিক করেছিলাম একাদশ শ্রেণীতে উঠলে রফিককে এসিস্ট্যান্ট হাউস প্রিফেক্ট বানাবো। দ্বাদশ শ্রেণীতে উঠলে কলেজ প্রিফেক্ট হবার সকল সম্ভাবনা ছিলো। হঠাৎ করে রফিকের যেনো কী হয়ে গেলো। মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষে নিয়মানুযায়ী তিন প্রায় মাসের জন্য লম্বা ছুটিতে বাড়িতে গিয়েছিলো। রেজাল্ট বের হবার পর কলেজে ফিরে আসার পর সবাই বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলো রফিক আর আগের রফিক নেই। লেখাপড়া, খেলাধুলাসহ কোনো কাজে রফিকের আগের মতো উৎসাহ এবং মনোযোগ কোনোটাই নেই। বন্ধুদের কাছ থেকে নিজেকে দূরে সড়িয়ে রাখছে। জুতার ফিতা বাঁধতে, জামার বোতাম লাগাতে ভুলে যাচ্ছে। শিক্ষকদের উপদেশ, বকাঝকা এমনকি এক্সট্রা ড্রিল কিছুতেই কাজ হচ্ছে না। ক্যাডেট কলেজে একটা বাজে নিয়ম আছে, যা আমার কখনও পসন্দ হয়নি। মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হতেই ছেলেদেরকে ছুটি দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ফল বের হলে প্রায় তিন মাস পর কলেজে ফিরিয়ে আনা হয়। দীর্ঘ তিন মাস বাড়িতে থেকে বেশিরভাগ ছেলে কোনো কাজকর্ম না করে, সংগদোষে দুষ্টু হয়ে, মাবাবার অতিরিক্ত প্রশ্রয়ে অলস সময় কাটিয়ে মাথাটাকে শয়তানের কারখানা বানিয়ে নিয়ে আসে। ক্যাডেট কলেজ এবং বাড়ির পরিবেশের মধ্যে এতটাই তফাৎ যে, কলেজে ফিরে এসে কলেজের দৈনন্দিন জীবনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে এদের বেশ কষ্ট হয়। এসব ছেলেকে পুনরায় লাইনে ফিরিয়ে আনতে শিক্ষকদের অনেক পরিশ্রম করতে হয়। কেউকেউ লাইনে আসতে ব্যর্থ হবার কারণে কলেজ থেকে বহিস্কৃত পর্যন্ত হয়ে যায়। যেসব অভিন্ন বড় বদভ্যাস এসময়ে অনেক ছেলের মধ্যে লক্ষ্য করা যায় সেগুলো হলো, ছোটোদের মারধর করা, কথায়কথায় অশ্লীল বাক্য উচ্চারণ করা, ধূমপানে আসক্ত হওয়া, লম্বা চুল রাখতে চেষ্টা করা, জামাকাপড় আগোছালো করে পরিধান করা, সুযোগ পেলেই পেরন্টেস ভিজিটিং ডে’তে আগত মেয়েদের বিরক্ত করা ইত্যাদি। দু’একজন ড্রাগেও আসক্ত হয়ে পড়ে। ব্যাপারগুলো অবশ্যই দু:খজনক। পঞ্চাশজন ক্যাডেটের তিন মাসের ভরণপোষণের খরচ বাঁচাবার লক্ষ্যে কাজটি করা হয়ে থাকে। কিন্তু এতে যে ক্ষতি হয় তা তো কখনও টাকা দিয়ে পূরণ করা যায় না। কর্তৃপক্ষ এক্ষেত্রে ছুটিটা কমিয়ে একমাস করে বাকি দুই মাস ছেলেদের কলেজে রাখলে অনেক দিক থেকে ভালো হতো। যাহোক, রফিকের বিষয়টি আমার নজরে এলো। ওর হাউস মাষ্টার অনেক চেষ্টা করেও রফিকের এমন দূ:খজনক পরিবর্তনের কারণ উদ্ধার করতে পারলেন না। সে মন খুলে কারও সাথে নিজের অশান্তির কথা বলতে চাইলো না। আমার মনে হলো, ছুটির সময় বাড়িতে এমন কিছু ঘটেছে যার জন্য আজকে সে এমন অস্বাভাবিক আচরণ করছে। অবশেষে আমি রফিকের বাবার শরণাপন্ন হলাম। রফিকের বাবা যশোর শহরের একজন গন্যমান্য ধনী ব্যাবসায়ী। ধর্মভীরু, ভদ্র ও বিনয়ী বলে সুখ্যাতি আছে। তিনি খবর পেয়ে সাথেসাথে আমার অফিসে এসে দেখা করলেন। তাঁর কাছ থেকে যা শুনলাম তাতে আমার সন্দেহ সত্য প্রমাণিত হলো। রফিকের যখন মাত্র পাঁচ বছর বয়স তখন ওর মা ওকে এবং ওর বড় একজন বোনকে রেখে মারা যান। তারপর রফিকের বাবা দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে দ্বিতীয়বার আর বিয়ে করেননি। মাহারা ছেলে ও মেয়েকে বুকে আগলে ধরে সকল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে এতোদিন সংসার আগলে রেখেছিলেন। রফিক বড় হয়ে ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হয়েছে। মেয়ে ধীরেধীরে বড় হয়ে লেখাপড়ার সাথেসাথে বাবার সংসারের হাল ধরে রেখেছে। মেয়ে বড় হয়ে উঠলে তার বিয়ে দেওয়ার বিষয়টি সামনে চলে এলো। কিন্তু মেয়ের এক কথা, আমি বিয়ে করে শ্বশুর বাড়ি চলে গেলে আমার বাবার কী হবে ? তাঁকে কে দেখবে ? সংসারের কী হবে ? বাবা অনেক বুঝালেন। কাজ হলো না। অবশেষে মেয়ে অনেক পীড়াপিড়ির পর এক শর্তে বিয়ে করতে রাজী হলো। তার বিয়ের আগে বাবাকে বিয়ে করে ঘরে নতুন মা আনতে হবে। তার হাতে সংসারের ভার বুঝিয়ে দিয়ে তবেই মেয়ে বিয়ে করতে রাজী আছে। মেয়ে নিজেই দেখেশুনে একজন বয়স্ক নি:সন্তান বিধবা মহিলার সাথে বাবার বিয়ে দিয়ে নতুন মা ঘরে আনলো। ঘটনাটি যখন ঘটে তখন রফিক কলেজে। সামনে ওর এসএসসি পরীক্ষা। ডিসটার্ব হবে বলে রফিককে কিছু জানানো হলো না। মেয়ে বললো, রফিক পরীক্ষা শেষে বাড়ি আসলে ওকে সব বুঝিয়ে বলার দায়িত্ব আমার। বাবা, তুমি এ নিয়ে ভেবো না। পরীক্ষা শেষে রফিক বাড়ি এসে নতুন মাকে দেখে হতবাক হয়ে গেলো, প্রচন্ড মানসিক আঘাত পেলো। ওর জীবনের সব হিসাব কোথায় যেনো এলোমেলো হয়ে গেলো। বড় বোন, যে নাকি মায়ের মতো আদরস্নেহ দিয়ে রফিককে বড় করেছে, অনেক বুঝালো। কিন্তু রফিক নতুন মায়ের আগমন কিছুতেই মেনে নিতে পারলো না। বাবাকে মনে হলো অনেক দূরের কেউ। তখন থেকে শুরু হয় রফিকের এলোমেলো পথচলা। বলতে বলতে রফিকের বাবার দু’চোখের পাতা আর্দ্র হয়ে গেলো। আমার দিকে তাকিয়ে করুণ কন্ঠে প্রশ্ন করলেন, আমি কি ভুল করলাম ? আমি শান্ত হবার জন্য অনুরোধ জানিয়ে বললাম, না, আপনি ভুল করেননি, ঠিকই করেছেন। আমি ওর সাথে কথা বলবো। আশা করি আমি রফিককে বুঝাতে পারবো। পরের দিন গেইমস পিরিয়ডে রফিককে আমার অফিসে ডেকে এনে বসালাম। ওর বাবার কাছ থেকে যা শুনেছি তা বললাম। তাকে নানাভাবে বুঝিয়ে বললাম যে তার বাবা দ্বিতীয়বার বিয়ে করে কোনো ভুল কাজ করেননি। বিষয়টি বুঝার বয়স এখনও তার হয়নি। আরও একটু বয়স হলে সে নিজেই বুঝবে, এছাড়া বাবার কিছু করার ছিলো না। তাছাড়া, ব্যাক্তি হিসেবে বিয়ে করা বা না করা তাঁর মৌলিক অধিকার। তাঁকে বাধা দেবার কোনো নৈতিক অধিকার তার, বা অন্য কারও, নেই। আমি আরও বললাম, তোমার বাবা তোমাদের দুই ভাইবোনকে পাগলের মতো ভালোবাসেন। তারপরও এসব কারণে তুমি অমনোযোগী হতে পারো না। তোমার ভবিষ্যত জীবন ধ্বংস করতে পারো না। বাবাকে কষ্ট দিতে পারো না। এখন থেকে কলেজের কাজকর্মে আগের মতো উৎসাহের সাথে অংশ নাও। অবশ্যই আল্লাহ তোমার সহায় থাকবেন। ইনশাল্লাহ সব ঠিক হয়ে যাবে। ধীরে ধীরে রফিক কলেজ জীবনের সাথে আবার তাল মিলিয়ে চলতে শুরু করলো। প্রায় বিশ বছর পর রফিকের সাথে ঢাকা সিএমএইচে স্টাফ সার্জনের ওয়েটিং রুমে দেখা। বাংলাদেশ এয়ারফোর্সের ইউনিফর্ম পড়া। সে তখন উইং কমান্ডার রফিক, জিডিপি। বাংলাদেশ এয়ার ফোর্সের একজন গর্বিত টেস্ট পাইলট।

Saturday, May 24, 2014

ক্যাডেট কলেজের টুকরো স্মৃতি: ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ: পর্ব ৭

If you fail to keep the boys busy, they will keep you busy ! উপরের কথাটি যে কোনো আবাসিক স্কুল, তা ছেলেদের বা মেয়েদের যাদের জন্য হোক না কেনো, সবার জন্য একটি পরীক্ষীত পুরাতন সত্য কথা। এ জন্য ক্যাডেট কলেজে দৈনিক কর্মসূচিতে নিয়মিত লেখাপড়া ও খেলাধুলা ছাড়া আরও অনেক রকমের কাজকর্ম ক্যাডেটদের জন্য নির্ধারন করা হয়ে থাকে। বিশেষ করে উইকএন্ডে এবং সরকারি ছুটির দিনে ক্যাডেটদের ব্যাস্ত রাখার জন্য নানা প্রকার ফিল্ড এক্টিভিটি যেমন আউটডোর খেলাধুলা, ক্রসকান্ট্রি দৌড়, হাইকিং, এডভেঞ্চার ট্রিপ, পিকনিক, আর্মি, নেভী এবং এয়ারফোর্সের ইউনিট ভিজিট, নিকটবতর্তী ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও যাদুঘর ভিজিট; স্টেইজ একটিভিটি যেমন কারেন্ট এফেয়ার্স ডিসপ্লে, বক্তৃতা-আবৃত্তি-বিতর্ক প্রতিযোগিতা, নাটক মঞ্চায়ন, সঙ্গীতানুষ্ঠান ইত্যাদির ব্যবস্থা করা হয়। ক্যডেট কলেজের শিক্ষকদের অবস্থা অনেকটা আমাদের দেশের মায়েদের মতো। যতোক্ষণ সন্তান বাড়িতে আছে ততোক্ষণ মায়ের কোনো সাপ্তাহিক, বাৎসরিক বা সরকারি ছুটি নেই। হরতাল-ধর্মঘট নেই। চিন্তার কোনো শেষ নেই। সময়মতো তাঁকে সন্তানের খাবারের আয়োজন করতে হয়, অন্যান্য দেখভাল করতে হয়। বরং ছুটির দিনগুলোতে ক্যাডেট কলেজের শিক্ষকরা তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যাস্ত থাকেন। আমি এমন ঘটনা বহুবার প্রত্যক্ষ করেছি যেখানে একজন হাউস মাস্টার বা হাউস টিউটর বাসায় নিজের সন্তানকে অসুস্থ ফেলে রেখে কলেজে এসে অসুস্থ ক্যাডেটের দেখাশুনা করছেন। যুক্তি একটাই। বাসায় রখে আসা নিজ সন্তানকে দেখার জন্য তার মা রয়েছেন। অসুস্থ ক্যাডেটকে তিনি ছাড়া তো আর কেউ দেখার নেই। এসব কারণে পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠার সময় থেকে ক্যাডেট কলেজের শিক্ষকদের জন্য বিশেষ বেতন স্কেল ছিলো। যা সরকারি কলেজের শিক্ষকদের চাইতে বেশি ছিলো। তাছাড়া অতিরিক্ত ভাতাসহ কিছু সুযোগসুবিধা দেওয়া হতো। তা না হলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে আসা মেধাবী চৌকশ তরুনদের ক্যাডেট কলেজে শিক্ষকতার পেশায় আকর্ষণ করা সম্ভব ছিলো না। এখানে উল্লেখ্য যে, ক্যাডেট কলেজের শিক্ষকরা অতীতে কখনও প্রাইভেট পড়ানো বা কোচিং সেন্টার চালানোর সময়, সুযোগ অথবা অনুমতি পেতেন না। বর্তমানেও পান না। ১৯৭১ সনে দেশ স্বাধীন হবার পর দুর্ভাগ্যবশত: তৎকালীন শাসকরা, আরও অনেক সূক্ষ বিষয়ের মতো, এই বিষয়টিও অনুধাবন করতে ব্যর্থ হন। কিছু হিংসুটে মতলববাজ লোক তাঁদেরকে বুঝালেন, যেহেতু সরকারি কলেজ এবং ক্যাডেট কলেজ উভয়ের ফ্যাকাল্টির সর্বনিম্ন পদের নাম লেকচারার, সুতরাং উভয়ের বেতনের স্কেল অভিন্ন হতে হবে। নইলে সরকারি কলেজের শিক্ষকরা নারাজ হবেন। যেমন বলা হতো, সড়ক ও জনপথ বিভাগের জংগলের মধ্যে অবস্থিত রেস্ট হাউসে কর্মরত বাবুর্চি এবং বঙ্গভবনে কর্মরত মহামান্য প্রেসিডেন্টের বাবুর্চি, দু’জনই বাবুর্চি। সুতরাং দুই বাবুর্চির বেতন স্কেল অভিন্ন হতে হবে ! আরও বুঝানো হলো, যেহেতু ক্যাডেট কলেজে প্রধানত: স্কুল পর্যায়ে শিক্ষাদান করা হয়, সেহেতু সেখানে সরকারি কলেজের পে-স্কেল প্রদান করা যুক্তিযুক্ত নয়। শাসকগণ একথা বিবেচনায় নিলেন না, কেনো প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ক্যাডেট কলেজকে বিশেষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিলো। কাজটি করা হয়েছলো জাতীয় স্বার্থে। ফলশ্রুতি হিসেবে, মেধাবী এবং চৌকশ তরুনরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে ক্যাডেট কলেজে শিক্ষকতা করতে আসতেন। স্বাধীনতার পর ক্যাডেট কলেজের শিক্ষকদের বেতনভাতা ডাউনগ্রেইড করা হলে পরিণতিতে যা হবার তাই হলো। অনেক দক্ষ শিক্ষক ক্যাডেট কলেজ ছেড়ে চলে গেলেন। মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার কিছু দেশ এসব শিক্ষকদের ভালো বেতন-ভাতা দিয়ে লুফে নিলো। তারপরও কিছু অভিজ্ঞ শিক্ষক রয়ে গিয়েছিলেন যাঁরা ১৯৮০এর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত কাজ করে চাকুরি থেকে স্বাভাবিক অবসর নেন। তার পরের কথা না বলাই ভালো হবে। যাঁদের শক্তিশালী হাতে বিধাতা রাষ্ট্র পরিচালনার ভার দেন তাঁরা যদি দয়া করে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে একটা কথা মনে রাখেন তাহলে দেশ ও জাতির উপকার হবে। নইলে যা হয় তা তো চোখের সামনে দেখছি। কথাটা হলো, যে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মেরুদন্ড হলো তার শিক্ষকমন্ডলী। ইংরেজিতে যাকে বলা হয় ফ্যাকাল্টি। মাথাভারি ম্যানেজিং কমিটি, বড় বিল্ডিং, সুন্দর বাগান সব কিছু প্রাণহীন হয়ে যায় যদি শিক্ষকরা কাজের না হন। কোনো অফিসে দশজন কেরানি বা অফিসারের মধ্যে এক বা দু’জন কমজোর বা অযোগ্য হলে কাজ চালিয়ে নেয়া যায়। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একটি ক্লাসরুমে মাত্র একজন শিক্ষক পাঠদান করেন। কোনো কারণে তিনি ব্যর্থ হলে সেই ক্লাসের সকল শিক্ষার্থীর একটা পিরিয়ড অযথা নষ্ট হয়ে যায়। এমন করে একজন ব্যর্থ শিক্ষক বছরের পর বছর শতশত ছাত্রের শতশত ঘন্টা নষ্ট করেন। আর এজন্য সে শিক্ষককে দায়ী করা যায় না। তিনি নিজেকে নিজে নিয়োগ দনে না। যাঁরা রাস্ট্র বা কমিউনিটির পক্ষ থেকে এসব শিক্ষক সিলেকশন এবং নিয়োগ দান করে থাকেন তাঁরাই এ ব্যর্থতার জন্য পুরোপুরি দায়ী। শতশত শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য অবশ্যই তাঁদেরকে, ভোটারদের কাছে না হোক, বিধাতার কাছে জবাবদিহি করতে হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। যাহোক, এবার আগের কথায় ফিরে আসি। আমি লক্ষ্য করলাম, ক্যাডেটরা সব সময় কেনো জানি কাজেকর্মে উৎসাহ ধরে রাখতে পারছে না। সব কিছু চলছে যেনো মেশিনের মতো। নির্ধারিত কাজ কলেজের নিয়মানুযায়ী করতে হবে, তাই করে যাচ্ছে। তাতে নেই কোনো প্রাণের ছোঁয়া। আমার ভাগ্য ভালো, তখন পর্যন্ত পাকিস্তান আমলে নিয়োগ পাওয়া সিনিয়র শিক্ষক মি: করিম, মি: আশরাফ আলী এবং মি: মন্ডলের মতো দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা হাউস মাস্টারের দায়িত্ব পালন করছিলেন। ভাইস প্রিন্সিপাল মি: এফ এম আব্দুর রব একজন অতি দক্ষ এবং সক্রিয় পেশাদার শিক্ষক ছিলেন। চমৎকার সহকর্মী এবং বন্ধু ছিলেন। আর্মি থেকে ডেপুটেশনে আসা এডজুটেন্ট মেজর মঈন ছিলেন ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের প্রাক্তন ক্যাডেট। অত্যন্ত ডেডিকেটেড এবং পেশাদার আর্মি অফিসার। প্রিন্সিপাল হিসেবে আমি কী প্রত্যাশা করি তা কখনও বিস্তারিতভাবে বলতে হতো না। ইশারাই যথেষ্ট ছিলো। ক্যাডেট মেসের ভারপ্রাপ্ত অফিসার ছিলেন আর্টস এন্ড ক্রাফ্টসের শিক্ষক মি: কামাল মাহমুদ। অত্যন্ত পরিশ্রমী, সৎ ও নিরহংকার মানুষ। আর্মি মেডিকেল কোর থেকে ডেপুটেশনে আসা মেজর (পরে লে: কর্নেল, বর্তমানে মরহুম) কফিলউদ্দিন আহমদ (বিখ্যাত অভিনেতা তৌকীর আহমদের পিতা) ছিলেন মেডিকেল অফিসার। অল্প দিনের মধ্যে এঁদের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ক্যাডেটদের কর্মচাঞ্চল্য নতুন উচ্চতায় পৌছতে পেরেছিলো। ক্যাডেটদের মধ্যে শৃংখলা ভংগের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেলো। লেখাপড়া, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডসহ সকল ক্ষেত্রে ক্যাডেটরা জাতীয় পর্যায়ে উৎকর্ষের স্বাক্ষর রাখতে লাগলো। প্রশাসনের শৈথিল্য বা ব্যর্থতার কারণে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা যদি শৃংখলা ভংগ করে, এবং সেজন্য তাদেরকে শাস্তি দেওয়া হয়, তাহলে সেটা খুব পরিতাপের বিষয়। ব্যাপারটা অনেকটা এরকম: কাউকে আপনি একদিকে কাতুকুতু দিলেন, অন্যদিকে তাকে হাসতে বারণ করে বললেন, খবরদার ! হাসবে না, হাসলে সাজা দেবো ! কিন্তু সে হেসে দিলো, আপনি তাকে সেজন্য সাজা দিলেন। এমন অযোগ্য প্রশাসক, তা যে কোনো প্রতিষ্ঠানের হোক না কেনো, কখনও কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। কোনো জাতির ভবিষ্যতকে অন্ধকারে ঠেলে দিতে হলে তার সহজতম উপায় হলো সে জাতির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অযোগ্য প্রধান এবং অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া।

Sunday, March 30, 2014

ক্যাডেট কলেজের টুকরো স্মৃতি: ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ: পর্ব ৬: ঠিকাদারের চ্যালেঞ্জ

কলেজে যোগদানের সপ্তাহখানিকের মধ্যে লক্ষ্য করলাম, প্রিন্সিপালসহ কিছু কর্মকর্তা এবং কর্মচারি ঠিকাদারের কাছ থেকে ফ্রেশ রেশন, যেমন গোস্ত, মাছ, তরকারি, তাজা ফল ইত্যাদি ক্রয় করতেন। মাসের শেষে ঠিকাদারের বিল পরিশোধ করতেন। আরও লক্ষ্য করলাম, প্রিন্সিপালের বাসায় সরবরাহকৃত মাছ-গোস্তের ওজন চাহিদকৃত পরিমানের চাইতে সবসময় বেশি। তরি-তরকারি, ফল-মূলের গুণগত মান ক্যাডেট মেসে সরবরাহকৃত আইটেমের চেয়ে অনেক ভালো, এবং পরিমানও চাহিদার চাইতে বেশি। কোনো কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারি মাসের পর মাস ঠিকাদারের বিল পরিশোধ না করে বাকি রাখছেন। এ নিয়ে ঠিকাদার কোনো আভিযোগও করছেন না। আমার বুঝতে বাকি রইলো না, প্রিন্সিপাল এবং কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বাসায় অন-পেমেন্ট রেশন সাপ্লাইয়ের নামে বড় রকমের দুর্নীতি হচ্ছে। এসব লোকদের পরিমানে বেশি এবং উন্নততর মানের রেশন সাপ্লাই করে ঠিকাদারের যে লোকসান হচ্ছে, তা তিনি ক্যাডেট মেসে ওজনে কম এবং খারাপ রেশন সাপ্লাই করে পুষিয়ে নিচ্ছেন। ব্যাপারটি সম্পূর্ণ অনৈতিক হবার কারণে সাথেসাথে ঠিকাদারের কাছ থেকে প্রিন্সিপালসহ অন্য সকলের রেশন নেয়া নিষিদ্ধ করে দিলাম। ঝিনাইদহ শহরের কাঁচা বাজার কলেজ গেইট থেকে মাত্র সোয়া মাইল দূরে। বাস, রিক্সা বা সাইকেলে করে যাওয়াআসা করা কোনো কঠিন কাজ ছিলো না। ক্যাডেটদের জন্য নিকটস্থ আর্মি ইউনিট অথবা এসএসডি (স্টেশন সাপ্লাই ডেপো) থেকে সরকার-নির্ধারিত মূল্যে চাল, আটা, চিনি ও ভোজ্য তেল সরবরাহ করা হতো। ফ্রেশ এবং ড্রাই রেশনের বাকি সব আইটেম ঠিকাদারের কাছ থেকে নিতে হতো। সকল আইটেম সাপ্লাই করার জন্য একজন ঠিকাদার ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে বারো মাসের জন্য নিয়োগ পেতেন। রাজনৈতিকভাবে অতি প্রভাবশালী এবং পেশীশক্তিতে অত্যন্ত বলীয়ান ঝিনাইদহ শহরের একই ব্যক্তি প্রতি বছর ছলে-বলে-কৌশলে ঠিকিাদারির একাজটি বাগিয়ে নিতেন। ভয়ে কেউ কোনো প্রতিবাদ করতে সাহস পেতো না। বাইরে থেকে এসে অন্য কোনো ঠিকাদার ভয়ে টেন্ডার জমা দিতে পারতেন না। তাছাড়া, টেন্ডারে কিছুকিছু আইটেম ছিলো যা কখনই কেনা হতো না। যেমন, গুড় এবং নারিকেল। কলেজ অফিস থেকে এসব আইটেমের চাহিদাও দেখানো হতো অনেক বেশি করে। যেমন, গুড়ের বাৎসরিক চাহিদা ছিলো ৩০ মণ, নারিকেলের চাহিদা ছিলো ৫০০০। আমার মনে আছে, গুড়ের দাম কোট করা হয়েছিলো কেজিপ্রতি দুই পয়সা, আর নারিকেল প্রতিটির দাম ছিলো এক পয়সা ! ক্যাডেট মেসে গুড়ের ব্যবহার একেবারেই ছিলো না। সকল প্রয়োজনে চিনি ব্যবহার করা হতো। কখনও কখনও নারিকেলের প্রয়োজন হলে কলেজের নিজস্ব গাছ থেকে নারিকেল পেরে ব্যবহার করা হতো। প্রভাবশালী ঠিকাদারটি এরকম সব আইটেমের অবিশ্বাস্য রকম কম দাম কোট করতেন। অন্যদিকে যেসব আইটেম প্রায় প্রতিদিন লাগতো সেগুলোর দাম অসম্ভব বেশি করে কোট করতেন। যেমন, রুই মাছের কেজি তখন বাজারে ছিলো ৩০ থেকে ৪০ টাকা। টেন্ডারে কোট করা হতো ৭০ থেকে ৮০ টাকা, বা তারও বেশি। একইভাবে মুরগি, গরু এবং খাসির গোস্তসহ অন্যান্য আইটেমের দাম আকাশচুম্বি অবাস্তব রেটে কোট করা হতো। এর মধ্যে কতো বড় অসাধু চতুরতা আছে, তা যাঁরা সাপ্লাইয়ের ব্যবসার সাথে জড়িত তাঁরা সবাই জানেন। তবে যাঁরা ব্যবসা করেন না, তাঁদের জন্য বিষয়টি একটু খোলাসা করে বলছি। টেন্ডারে উল্লিখিত প্রতিটি আইটেমের ইউনিট প্রাইস কোট করে চাহিদাকৃত সকল আইটেমের, আইটেমওয়াইজ, মোট পরিমানের দাম কোট করা হতো। সবশেষে সব আইটেমের সর্বসাকুল্যে যা দাম হতো তা কোট কর হতো। নিত্য প্রয়োজনীয় আইটেমগুলোর দাম আকাশচুম্বি হলেও গুড় এবং নারিকেলের মতো আপ্রয়োজনীয় আইটেমের হাস্যকর কম দামের কারণে সর্বসাকুল্য দাম অনেক কমে আসতো। বাহির থেকে কোনো ঠিকাদার এলে তাঁর পক্ষে এ চালাকি করা সম্ভব হতো না। তাঁরা গুড় এবং নারিকেলসহ সব আইটেমের স্বাভাবিক দাম কোট করতেন। যারফলে তাঁদের কোট করা সর্বসাকুল্য দাম প্রভাবশালী ঠিকাদারের কোট করা দামের চাইতে বেশি হতো। ঝিনাইদহ শহরের সেই একই প্রভাবশালী ঠিকাদার বছরের পর বছর, আইনের কোনো ব্যত্যয় না ঘটিয়ে, এভাবে সাপ্লাইয়ের কাজটি হস্তগত করতেন। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে উভয় পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য একটি সমাধান বের করার জন্য ঠিকাদারকে অফিসে আসতে অনুরোধ করলাম। অফিসে এলে আমি তাঁকে নিশ্চয়তা দিলাম, যেসব আইটেমের অস্বাভাবিক বেশি দাম ধরা হয়েছে সেগুলো কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে আনা হলে আমি গুড় বা নারিকেল জাতীয় আইটেমের জন্য কোনো ডিমান্ড দেবো না। চাইলে তাঁকে আমি লিখিত নিশ্চয়তা দিতে রাজি আছি। তিনি কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে পরে জানাবেন বলে চলে গেলেন। পরে লোক মারফত জানালেন, তাঁর পক্ষে এখন কিছু করা সম্ভব নয়। পরবর্তী অর্থ বছরে কোটেশন সাবমিট করার সময় তিনি কথাটা বিবেচনায় রাখবেন। শুনে আমার খুব মন খারাপ হলো, রাগও হলো ঠিকাদারের উপর। নিজের সন্তানের বয়সী বাচ্চা ছেলেদের কল্যাণের কথা বিবেচনা না করে বছরের পর বছর নাজায়েয মুনাফা লুটে খাচ্ছেন। অথচ, ৩০ জুন পর্যন্ত, মাত্র দু’তিন মাসের জন্য কোনো বিবেচনা করতে রাজি নন। ভাবলাম, এই জালিমকে অন্তত: একবার উচিৎ শিক্ষা দিতে হবে। আমি সর্বোচ্চ পরিমান গুড় এবং নারিকেল সাপ্লাই করার জন্য ঠিকাদারকে অর্ডার দিলাম। এবার তাঁর টনক নড়লো। লোক পাঠিয়ে অনেক অনুনয়-বিনয় করলো গুড় এবং নারিকেলের অর্ডার বাতিল করার জন্য। আমার এক জবাব, সময়মত গুড় এবং নারিকেল সরবরাহ করুন। নইলে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী আর্নেস্ট মানি ৩০ হাজার টাকা বাজেয়াপ্ত করা হবে। কলেজের কেউকেউ মন্তব্য করলেন, প্রিন্সিপাল সাহেবের কি মাথা খারাপ হয়ে গেলো ? এত গুড় আর নারিকেল কে খাবে ? তাঁদেরকে বললাম, গুড় ডেইরি ফার্মের গাভীদের খাওয়ানো হবে। নারিকেল ক্যাডেট মেসে দেওয়ার পর যা অতিরিক্ত থাকবে তা কলেজের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের কাছে কেনাদামে বিক্রি করা হবে। করেছিলামও তাই ! ঠিকাদার আমাকে বিভিন্ন চ্যানেলে হুমকি-ধামকি দিলেন। শেষ পর্যন্ত ‘রক্ত’ (আসলে আলতা !) দিয়ে চিঠি লিখে হত্যা করার হুমকিও দিতে বাকি রাখলেন না। আমার শুভাকাঙ্খীরা আমাকে সতর্ক হয়ে চলাফেরা করার পরামর্শ দিলেন। বিশেষ করে রাতবিরাতে গাড়িতে করে একা শুধু ড্রাইভার নিয়ে ৩০ মাইল দূরে যশোর ক্যান্টনমেন্টে যাতায়াতে নিষেধ করলেন। সেসময়ে ঝিনাইদহ অঞ্চল উগ্র রাজনৈতিক কর্মকান্ডের জন্য পরিচিত ছিলো। প্রায়ই দু’য়েকটা রাজনৈতিক হত্যাকান্ড সংঘটিত হতো। যাহোক, আমি এসবে কর্ণপাত করিনি। আমার বিশ্বাস ছিলো, এবং আজও আছে, হায়াত-মউতের মালিক আল্লাহ। আর, যারা এরকম হুমকি দেয় তারা সাধারণত: কাপুরুষ হয়ে থাকে। যাদের সাহস থাকে তারা হুমকি দেয় না, কাজটাই করে ফেলে। তখন সম্ভবত: মার্চ মাসের শেষ ভাগ। এপ্রিল মাসে পরবর্তী অর্থ বছরের জন্য নতুন দরপত্র আহ্বানের সময় হবে। সংশ্লিষ্ট সকল ছোটোছোটো সাব-কন্ট্রাক্টরকে আফিসে ডাকলাম। তাঁরা সবাই যা একবাক্যে বললেন তা হলো: সরবরাহকৃত সকল আইটেমের কনসলিডেটেড মূল্য প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা। যার জন্য টেন্ডারের সাথে ৩০ হাজার টাকার বেশি আর্নেস্ট মানি জমা দিতে হয়। তাঁরা প্রত্যেকে অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। এতো টাকা আর্নেস্ট মানি দেওয়া তাঁদের কারও একার পক্ষে সম্ভব নয়। শ্রেণী অনুযায়ী আইটেমগুলো ভাগভাগ করে প্রতি ৬ মাসে যদি টেন্ডার ডাকা হয় তবে তাঁরা তাতে অংশ নিতে পারবেন। সেক্ষেত্রে প্রতি শ্রেণীর আইটেমসমূহের জন্য ৫ থেকে ১০ হাজার টাকার মতো আর্নেস্ট মানি দিতে হবে। তবে একাজ করতে গেলে বড় একটা সমস্যা হবে। সেজন্য তাঁরা আমার সাহায্য চাইলেন। প্রভাবশালী বড় ঠিকাদার ক্ষেপে গিয়ে নিজস্ব গুন্ডা দিয়ে, অথবা থানাপুলিশ দিয়ে তাঁদের হেনস্থা করতে চাইবেন। আমি আমার পক্ষ থেকে সকল প্রকার সাহায্য-সহযোগিতার নিশ্চয়তা দিলাম। কেনো আমি ফ্রেশ এবং ড্রাই রেশনের দরপত্র ভেঙ্গেভেঙ্গে ছোটো করতে চাই তা ব্যাখ্যা করে চেয়ারম্যানের অফিসে চিঠি দিলাম। চেয়ারম্যান অনুমোদন দিয়ে দিলেন। ঝিনাইদহের এসডিও এবং এসডিপিও-কে (তখনও ঝিনাইদহ জেলা হয়নি) ক্ষুদ্র ঠিকাদারদের নিরাপত্তার কথা বলে, তাঁদের সহযোগিতা চাইলাম। তাঁদের দু’জনকেই আমার কাছে অত্যন্ত ভালো অফিসার বলে মনে হয়েছে। দু’জনেই সানন্দে রাজি হলেন সর্বপ্রকার সহযোগিতা প্রদানের জন্য। এতোদিন পর তাঁদের নাম মনে করতে পারছিনা বলে আমি দু:খিত। আসলে, স্থানীয় প্রশাসনিক অফিসারদের সহযোগিতা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে মফস্বল অঞ্চলে, পরিচালনা করা খুবই কঠিন। সে যায়গায় তাঁরা যদি অন্যায় হস্তক্ষেপ করেন তাহল কাজটি করা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। পরবর্তী জুলাই মাস থেকে ক্যাডেটদের খাওয়াদাওয়া নিয়ে বড় কোনো সমস্যা রইলো না। নবনিযুক্ত ক্ষুদ্র ঠিকাদাররা অত্যন্ত উৎসাহের সাথে ভালো মানের ফ্রেশ এবং ড্রাই রেশন সরবরাহ করতে লাগলেন। বড় একটা ঝামেলা থেকে বাঁচা গেলো !

Tuesday, March 25, 2014

ক্যাডেট কলেজের টুকরো স্মৃতি: ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ: পর্ব ৫: ক্যাডেট কলেজে অশান্তি এড়াতে হলে

আপনা র ঘরে যদি তিনটি ছেলেকে দিনের চব্বিশ ঘন্টা মাসের পর মাস আটকে রাখা হয় তাহলে কেমন অরাজক পরিস্থিতি হতে পারে, আশা করি, তা বুঝিয়ে বলতে হবে না। কমবেশি তিন’শ ছেলেকে (বা মেয়েকে), যাদের বয়স ১২ থেকে ১৮ বছর, যদি কঠিন শৃঙ্খলার মধ্যে আটকে রাখা হয় এবং সেখানে যদি শান্তিশৃঙ্খলা বজায় না থাকে তাহলে পরিস্থিতি কোন পর্যন্ত যেতে পারে, তা কল্পনাও করা যায় না। অথচ, ক্যাডেট কলেজগুলো অনেক দিন ধরে এই আপাত: অসম্ভব কাজটিই সার্থকতার সাথে করে সবার প্রশংসা কুড়াচ্ছে। যদি কেউ প্রশ্ন করেন, এর কোনো গোপন রহস্য আছে কি না। যদি থাকে তাহলে সেটা কী ? এ প্রশ্নের জবাব হলো: কোনো রহস্য নেই। যে চারটি বিষয়ে মনোযোগ দিলে পরিস্থিতি আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকবে তা হলো: (১) ছেলেদেরকে সময়মতো ভালো খাবার পরিবেশন করুন। (২) রুটিনমতো কাজকর্মে ব্যস্ত রাখুন। (৩) পর্যাপ্ত বিনোদনের ব্যবস্থা রাখুন। (৪) রাতে নিরবচ্ছিন্ন ঘুমেরে যাতে ব্যাঘাত না হয়, তা নিশ্চিত করুন। দেখবেন, বড় কোনো অশান্তি হবে না। ছোটোখাটো কিছু সমস্যা হতেই পারে। প্রশাসন যদি সজাগ থেকে সময়মতো সঠিক ব্যবস্থা নেয় তাহলে এসব ছোটো সমস্যা কোনো বড় অসুবিধা করে না। কেউ হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, তাহলে পড়ালেখা কোথায় গেলো ? ক্যাডেট কলেজের কোনো ক্যাডেটকে পড়ালেখা করার জন্য বলতে হয় না। একাজটি ওরা নিজ থেকেই খুব সিরিয়াসলি করে থাকে। এমনকি অনেকে লাইটস আউটের (রাতে আবশ্যিকভাবে বাতি নেভাবার সময়) পর ডিউটি মাস্টারের নজর এড়িয়ে চুপিচুপি পড়শুনা করে থাকে, বিশেষ করে পরীক্ষার আগে। শিক্ষকগণ শুধু নির্দেশণা দিয়ে সাহায্য করেন। কেউ কোনো বিষয়ে অতি দূর্বল হলে তাকে ক্লাসের বাইরে অতিরিক্ত সময়ে টিউটরিং করে থাকেন। স্পুনফিডিংয়ের কোনো প্রয়োজন হয় না। যখন ক্যাডেটরা ভেকেশনে বাড়ি যেতো তখন যাবার আগে হাউস মাস্টাররা ছেলেদের ব্যাগ-সুটকেইস রীতিমতো তল্লাশি করে সকল পাঠ্যবই হাউসে রেখে দিতেন। কোনো হোম ওয়ার্ক দেওয়া হতো না। ছেলেদের বলা হতো: বাড়ি গিয়ে আনন্দ করো, ঘুরে বেড়াও, খেলাধুলা করো, সিলেবাসের বাইরের বইপত্র পড়ো, মা-বাবার ঘরের কাজে সাহায্য করো ইত্যাদি। আড়াই-তিন মাস একনাগারে কলেজে থাকলে এক ধরনের একঘেয়েমি এসে যায়। তা থেকে মুক্তি পাবার জন্যই এমন পরামর্শ দেওয়া হতো। আজকাল শুনছি, ভেকেশনে যাবার সময় ক্যাডেটদের পাঠ্যবই সঙ্গে নিতে অনেকটা বাধ্য করা হয়। প্রচুর হোম ওয়ার্ক দেওয়া হয়। বাড়িতে থাকতে কোন কোন বিষয়ে প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়তে হবে সে সম্পর্কে অভিভাবককে চিঠি দিয়ে জানানো হয়। যে দর্শন ও নীতির উপর ভিত্তি করে শুধুমাত্র জাতীয় ভিত্তিতে মেধাবীদের জন্য ক্যাডেট কলেজ শুরুতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো, এসব কাজ তার পরিপন্থি। যেসব ছেলেমেয়েদের জন্য এমন করা প্রয়োজন তারা ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হবার জন্য উপযুক্ত নয়, অন্তত: মেধার দিক থেকে। শোনা যায়, আজকাল ভর্তির জন্য নির্বাচন প্রক্রিয়ায় আপোষ করা হচ্ছে। কথাটা সত্য হলে এটা কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। আর যদি ভর্তির জন্য নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কোনো ত্রুটি থাকে, বিশেষজ্ঞদের দিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে সংষ্কার করতে হবে। তা নাহলে ক্যাডেট কলেজের সুনাম, ঐতিহ্য ও কার্যকারিতা ধরে রাখা যাবে না ক্যাডেট কলেজের জন্য জনগণের ট্যাক্স থেকে যে বিপুল পরিমান অর্থ ব্যয় করা হয়, তার যৌক্তিকতা ধরে রাখা যাবে না। এবার আসা যাক ক্যাডেট কলেজে ক্যাডেটদের খাবার ব্যবস্থা প্রসঙ্গে। সকালের পিটি/প্যারেডের পর ব্রেকফাস্ট, সকাল দশটার দিকে মিল্ক ব্রেকে দুধ আর বিস্কুট, দুপুর একটার দিকে লাঞ্চ, বিকেলে গেইমস পিরিয়ডের পর চা-টিফিন, সর্বশেষ রাতে ডিনার। ক্যাডেট কলেজে মাথাপ্রতি একজন ক্যাডেটকে কোন বেলায় কোন খাবার কতটুকু দিতে হবে তা পুষ্টিবিজ্ঞানী নির্ধারণ করে দেন। যেমন, বলা হয় না, এক বেলায় একজন ক্যাডেটকে এতো টাকার মুরগির গোস্ত দিতে হবে। বলা হয়, এতো গ্রাম মুরগির গোস্ত দিতে হবে, দাম যতোই হোক না কেনো। যার ফলে বাজারে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়লে ক্যাডেট কলেজের বাজেটও আবশ্যিকভাবে বাড়াতে হয়। যে কোনো রান্না করা খাবার খেতে ভালো লাগবে কি না তা বহুলাংশে নিভর্র করে রান্নার উপকরণের গুণগত মান, রান্নার প্রক্রিয়া এবং পরিবেশের মানের উপর। এসব দেখার জন্য ডিউটি মাস্টার এবং ডিউটি এনসিওকে তাঁদের পর্যবেক্ষণে সর্বোচ্চ মনোযোগী হবার জন্য অনুরোধ করলাম। আমি নিজেও সময়ে-অসময়ে ক্যাডেট মেসের কুকহাউস ভিজিট করতে লাগলাম। সুযোগ পেলেই খাবার সময়, আগাম খবর না দিয়ে, মেসে গিয়ে ক্যাডেটদের সাথে বসে খাবার টেস্ট করতে লাগলাম। পরিবেশিত খাবারের মান এবং স্বাদ সম্পর্কে ক্যাডেটদের মতামত নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করতাম। একথা সত্য, ক্যাডেটদের মন্তব্যে বাড়াবাড়ি ছিলো, এ ধরনের কম্যুনিটি কিচেনের রান্না সম্পর্কে সাধারণত: যা হয়ে থাকে। তারপরও অত্যন্ত পরিতাপের সাথে লক্ষ্য করলাম: (১) অধিকাংশ ছেলে টিফিনে পরিবেশিত দুধ না খেয়ে টেবিলের উপর দুধভর্তি কাপ ছেড়ে যাচ্ছে। জিজ্ঞাসা করাতে ছেলেরা জবাব দিলো, স্যার, দুধ খেতে ভালো লাগে না। (২) যে বেলায় গরু, খাসি বা মুরগির গোস্ত থাকতো ছেলেরা সব গোস্ত না খেয়ে প্লেটে ফেলে রেখে যেতো। জিজ্ঞেস করলে ছেলেরা একবাক্যে জবাব দেতো, মরা গরুর (খাসি বা মুরগির) গোস্ত। খাওয়া যায় না। (৩) বাজে রান্নার জন্য সব্জিও অনেকে খেতে পসন্দ করতো না। শুধু ডাল দিয়ে ভাত খেয়ে উঠে যেতো। এসব দেখে ও শুনে মনেমনে কষ্ট পেতাম। সরকার ছেলেদের খাওয়াদাওয়ার জন্য এতো টাকা খরচ করছে। অথচ, ছেলেরা খেতে পারছে না। নিজের ছেলেবেলার কথা মনে হলো। মা যখন গ্লাসে করে গরম দুধ খেতে দিতেন তখন কী মজা করেই না তা খেতাম ! আর গোস্ত ! মা যে বেলায় গোস্ত রান্না করতেন সে বেলায় শুরু থেকেই সব ভাইবোন মিলে আনন্দে লাফাতাম ! খেতে বসার আগেই জিহ্বায় পানি এসে জেতো ! যাহোক, ছেলেদের মেসের খাবারে অরুচির কারণ খুঁজতে বেশি দূর যেতে হলো না। কলেজের নিজস্ব ডেইরি ফার্মে পর্যাপ্ত সংখ্যক গাভী ছিলো। যার বেশির ভাগ ছিলো ‘সিন্ধি’ প্রজাতির। অল্প কিছু ছিলো ‘ফ্রিজিয়ান’। দেশি জাতের কোনো গরু ছিলো না। তা সত্বেও মেসের চাহিদা মেটাবার মতো পর্যাপ্ত দুধ সেখানে উৎপন্ন হতো না। ফলে পুরোটাই বাইরের ঠিকাদারের কাছ থেকে কিনতে হতো। বাংলাদেশের বাস্তবতায় কোনো ঠিকাদারের কাছ থেকে খাঁটি দুধ আশা করা তখনও যেতো না, এখনও যায় না। ছেলেদেরকে খাঁটি দুধ খাওয়াতে হলে যে কোনো মূল্যে কলেজের নিজস্ব ডেইরি ফার্মের উন্নতি করা ছাড়া গত্যন্তর রইলো না। খুলনা থেকে সরকারি পশুপালন বিভাগের উপ-পরিচালক মহোদয়কে পরামর্শের জন্য দাওয়াত দিলাম। ভদ্রলোক খুব খুশিমনে এলেন। সঙ্গে ঝিনাইদহের সাবডিভিশনাল পশুপালন অফিসারকে আনলেন। সরজমিনে ডেইরি ফার্ম দেখলেন। ফার্মে রাখা রেজিস্টার খুলে প্রতিটি গাভীর বয়স, রোগ প্রতিরোধক টিকা দেওয়ার রেকর্ড, সবশেষ কবে ডিওয়ার্মিং (কৃমিমুক্ত) করা হয়েছে, খাবারের মেনু, নিয়মিত ব্যায়ামের রুটিন, এসব তথ্য পরীক্ষা করলেন। সাবডিভিশনাল পশুপালন অফিসারকে বিস্তারিত নির্দেশ প্রদান করে তাঁকে ফার্মের দায়িত্ব নিতে বললেন । সাবডিভিশনাল পশুপালন অফিসার বিষয়টিকে ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিলেন। প্রতি সপ্তাহে দু’তিনবার কলেজে এসে ফার্মের দেখভাল করতে লাগলেন। ফার্মের কর্মীদের পরামর্শ দিতে লাগলেন। কলেজের কৃষি ফার্মে অন্য ফসলের চাষ কমিয়ে দিয়ে সেখানে গাভীর দুধ বাড়ে এমন খাদ্য যথা নেপিয়ার ঘাস, জার্মান ঘাস, ভুট্টা ইত্যাদির চাষ শুরু হলো। ক্যাডেট মেসের ভাতের মাড় অন্য কোথাও না গিয়ে পুরোটা ডেইরি ফার্মে আসতে লাগলো। তিন মাসের মধ্যে, গাভীর সংখ্যা না বাড়িয়ে, দুধের পরিমান এতটা বেড়ে গেলো যে, ক্যাডেট মেসের চাহিদা মিটিয়ে কলেজের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে, বিশেষ করে যাদের দুগ্ধপোষ্য শিশু এবং ছোটো বাচ্চা ছিলো তাদেরকে, ভর্তুকিমূল্যে দুধ সরবরাহ করা সম্ভব হলো। ভেকেশনের সময় শহরের মিষ্টির দোকানদাররা সারপ্লাস দুধ সানন্দে কিনে নিয়ে যেতো। শত হলেও খাঁটি দুধ তো ! ক্যাডেটরা বেজায় খুশি হলো। এবার আর টেবিলে খালি দুধের গ্লাস দেখা গেলো না। ডেইরি ফার্মের কথা অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে যদি তার এক সদস্যের কথা না বলা হয়। তার নাম ‘মন্টু’। কলেজের সবাই তাকে এই নামে চিনতো। পরিচিত রাখাল নাম ধরে ডাকলে মন্টু যেখানই থাকতো ছুটে আসতো। সে ছিলো ফার্মের প্রবীনতম ষাঁড়। জাতে ছিলো ‘সিন্ধি’। গায়ের রং টকটকে লাল। দেখতে অত্যন্ত স্বাস্থ্যবান, হ্যান্ডসাম এবং স্মার্ট ! গত তিন বছর যাবত নিকটস্থ ভাটুই বাজারের কোরবানির হাটে নিয়ে বিক্রি করার চেষ্টা করা সত্বেও বিক্রি করা যায়নি। প্রতিবারই সকল বাধা এবং রশি ছিন্ন করে মন্টু হাট থেকে পালিয়ে এক দৌড়ে কলেজে ফিরে এসে ফার্মে ঢুকে নিজ অবস্থানে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো। যেহেতু আমাদের ফার্মটি ছিলো মূলত: দুধের জন্য, এঁড়ে বাছুর বড় হয়ে গেলে সেটিকে রাখার ব্যবস্থা ছিলো না। সিদ্ধান্ত নিলাম, কষ্ট হলেও, মন্টুকে এবার যে করে হোক বিদায় করতে হবে। এবার কোরবানির সময় কলেজের পিকআপে চড়িয়ে মন্টুকে ঢাকার গাবতলি গরুর হাটে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। এবার আর মন্টু হাট থেকে মন্টু ফিরে এলো না। মন্টুকে যখন ঢাকা নেবার জন্য পিকআপে উঠানো হয় ফার্মের রাখালসহ অনেকের চোখে পানি দেখে আমি নিজেও বিচলিত হয়ে পড়েছিলাম বৈকি। ক্যাডেট মেসে রান্না করা গোস্তের স্বাদ ও মান উন্নয়ন করা অতটা সহজ ছিলো না। কুকহাউস থেকে যাতে কেউ কোনো মশলা, বিশেষ করে অতি দামি গরম মশলা, রান্নার তেল-ঘি চুরি করে বাইরে নিতে না পারে সেজন্য কুকহাউসের স্টাফদের আচমকা শরীর তল্লাসি শুরু করা হলো। প্যান্টের পকেটে ভরে গড়ম মশলা চুরি করে নেবার সময় ধরা পড়ায় দু’একজনকে চাকুরি থেকে বরখাস্ত করা হলো। এদের মধ্যে কেউকেউ স্থানীয় হবার কারণে বাইরের মাস্তানদের সাথে নিয়ে প্রিন্সিপালকে একহাত দেখে নেবার হুমকি দিলো। এতো সবের পরও গোস্তের মান বাড়ানো গেলো না। একেবারে মৃত না হলেও মৃতপ্রায় এবং অতিশয় রুগ্ন পশুর গোস্ত সরবরাহ বন্ধ করা যাচ্ছিলো না। গোস্তের ঠিকাদারকে ডেকে প্রথমে অনুরোধ পরে সতর্ক করলাম। কোনো কাজ হলো না। ঠিকাদারের এক জবাব, তাঁর নিজের কোনো কসাইখানা বা গোস্তের ব্যবসা নাই। কসাইদের কাছ থেকে কিনে তিনি গোস্ত সাপ্লাই দেন। কলেজের মেডিক্যাল অফিসার ছিলেন মেজর (পরে লে: কর্নেল, বর্তমানে মরহুম) কফিলউদ্দিন আহমদ (চলচ্চিত্র পরিচালক তৌকীর আহমদের পিতা)। ঠিকাদার ফ্রেশ রেশন নিয়ে এলে তিনি প্রতিবার গোস্তসহ সব আইটেমের গুণগত মান পরীক্ষা করতে লাগলেন। কোনো কিছুতেই কাজ হচ্ছিলো না। সর্বশেষ উপায় হিসেবে আমাকে নিজ দায়িত্বে একটি অসাধারণ পদক্ষেপ নিতে হলো। বিল্ডিং সুপারভাইজারকে ডেকে বললাম মেসের পাশে একটি ‘বুচারি’ অর্থাৎ কসাইখানা বানাতে হবে। যাতে একটা বা দু’টো গরু একসাথে জবাই করে গোস্ত বানানো যেতে পারে। তার জন্য সম্ভাব্য নির্মাণ ব্যয় কতো হবে তা আইটেমওয়ারি লিখে আমাকে এস্টিমেট দিতে বললাম। এস্টিমেট দেখে চিন্তায় পড়ে গেলাম। প্রিন্সিপালের ফিনান্সিয়াল পাওয়ারের চাইতে অনেক বেশি টাকার প্রয়োজন। যদি অনুমোদন চেয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উর্ধতন কতৃর্পক্ষকে চিঠি লিখি, আর যদি কোনো কারণে সে অনুরোধ প্রত্যাখ্যাত হয়, তাহলে ‘বুচারি’ আর কখনও বানানো যাবে না। অথচ ‘বুচারি’ না বানিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কলেজের সামনে যশোর-কুষ্টিয়া হাইওয়ে। তার পাশে, আল্লাহ জানেন কবে থেকে, প্রচুর অব্যবহৃত উদ্বৃত্ত ইট পড়ে ছিলো। কলেজের পাম্প হাউস বানানোর সময়ে ঠিকাদার কর্তৃক লেবারদের জন্য নির্মিত টিনশেড বহুদিন যাবত পড়ে ছিলো। বিল্ডিং সুপারভাইজারকে আদেশ দিলাম, যতো শীঘ্র সম্ভব হাইওয়ের পাশ থেকে অব্যবহৃত ইট, এবং পাম্প হাউসের পাশ থেকে টিন নিয়ে এসে ‘বুচারি’ বানিয়ে ফেলতে। ক্যাডেট মেস থেকে পানি ও বিদ্যুতের সংযোগ নিতে। মেইনটিন্যান্স খাত থেকে বাকি নির্মাণ সামগ্রী কিনে নিতে। তাড়াতাড়ি এইজন্য করছিলাম যে, ‘বুচারি’ বানালে যাদের স্বার্থে আঘাত লাগবে তাদের কেউ যাতে উপরওয়ালা কাউকে দিয়ে আমার এ ‘ষড়যন্ত্র’ অংকুরেই নস্যাত না করে দেয়। যেমন আদেশ, তেমন কাজ। প্রচুর আলোবাতাসের ব্যবস্থা রেখে, চারদিকে ফ্লাইপ্রুফ নেটের ঘেরা দিয়ে, প্রায় রাতারাতি টিনের চালওয়ালা ‘বুচারি’ তৈরী হয়ে গেলো। এবার ঠিকাদারকে বলা হলো গরু, খাসি এবং মুরগি, সব জীবীত অবস্থায় কলেজে আনতে হবে। কলেজের মেডিক্যাল অফিসার পরীক্ষা করে দেখে ‘গ্রহণযোগ্য’ বলে সার্টিফিকেট দিলে কলেজের ‘বুচারি’তে জবাই করে গোস্ত সরবরাহ করতে হবে। কলেজ মসজিদের ইমাম সাহেব বিনা পারিশ্রমিকে পশু জবাইর কাজ করে দিবেন। মজার ব্যাপার হলো, জ্যান্ত মুরগি খাচায় ভরে আনলেও, ঠিকাদারকে জ্যান্ত গরু ও খাসি সকাল বেলা একাডেমিক ব্লকের সামনে দিয়ে হাটিয়ে আনতে বলা হলো। ক্যাডেটরা ক্লাসরুমে বসেই নিজের পায়ে হেটে যাওয়া গরু ও খাসির অবয়ব দেখতে পেতো। এবার আর খাবার টেবিলে কোনো গোস্তের চিহ্ন রইলো না। ছেলেরা পরিতৃপ্তির সাথে পরিবেশিত প্রতিটি গোস্তের টুকরা খেয়ে শেষ করতে লাগলো। এই ঘটনার কিছুদিন পর ঢাকায় কোনো কাজে গেলে আর্মি হেডকোর্য়াটার্সে ক্যাডেট কলেজ গভর্নিং বডিজের চেয়ারম্যান জে: এরশাদের সাথে দেখা। তিনি অনেকের সামনে আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ওয়েলডান, আশরাফ। ‘বুচারি’ বানিয়ে খুব ভালো কাজ করেছো। আমি বললম, স্যার, আপনি কেমন করে জানলেন ? আমি তো আপনাকে জানাইনি। তিনি মুচকি হেসে বললেন, বেনামী চিঠি থেকে জেনেছি ! তোমরা তো জানোনা, প্রতিদিন প্রিন্সিপালদের বিরুদ্ধে আমার কাছে প্রচুর বেনামী চিঠি আসে। প্রিন্সিপালদের মধ্যে যারা খুব ভালো করছে, এবং যারা খুব খারাপ করছে তাদের বিরুদ্ধে বেশি বেনামী চিঠি আসে। ডোন্ট ওরি, তুমি অবশ্যই ভালো করছো। কীপ ইট আপ।

ক্যাডেট কলেজের টুকরো স্মৃতি: ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ: পর্ব ৪: সেকুলারিজম নিয়ে বিভ্রান্তি

পেরেন্টস ভিজিটিং ডে’তে অফিসে বসে আছি। অভিভাবকরা এক এক করে আসছেন। কেউ আসছেন শুধু শুভেচ্ছা জানাতে। কেউ আসছেন নিজ ছেলের কোনো সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে। কেউ বা আসছেন কলেজ কর্তৃপক্ষের কোনো সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে তা প্রত্যাহার করার অনুরোধ জানাতে। নানা বয়সের, নানা পেশার, নানা ব্যাকগ্রাউন্ডের লোক আসছেন। প্রত্যেকে আমার সম্মানিত ক্লায়েন্ট। সেভাবেই সবার সাথে কথা বলে আসছিলাম। হঠাৎ করে এক ভদ্রলোক কিছুটা উত্তেজিত অবস্থায় আমার অফিসে এসে বসলেন। মনে হলো, আমার অফিসে আসার আগে উনি কোনো বিষয় নিয়ে কারো সাথে কথা বলছিলেন। উত্তেজনাটা সেখানেই ঘটেছে। বাংলা একাডেমির একজন সিনিয়র অফিসার হিসেবে নিজের পরিচয় দিলেন। আরও জানালেন, বাজারে উনার লেখা এবং অনুবাদ করা অনেক বই আছে। বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য এবং সংস্কৃতি জগতের একজন সিনিয়র মোড়ল বলেও নিজেকে তুলে ধরলেন। ধরা যাক ভদ্রলোকের নাম মাসুদ সাহেব। কোনো প্রকার ভূমিকা না করে মাসুদ সাহেব বললেন: তাঁর ছেলে ক্লাস নাইনে পড়ে। তাকে জোর করে কলেজ কর্তৃপক্ষ মসজিদে নিয়ে নামাজ পড়তে বাধ্য করছে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, প্রতিদিন মাগরিবের ওয়াক্তে সকল মুসলমান ছেলেদের জন্য সারিবদ্ধ হয়ে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়া বাধ্যতামূলক। একইভাবে শুক্রবার জুমার নামাজ মসজিদে গিয়ে আদায় করা বাধ্যতামূলক। অন্যান্য ওয়াক্তিয়া নামাজ পড়ার জন্য প্রত্যেক হাউসে প্রেয়াররুম আছে। মাসুদ সাহেব পবিত্র কুর’আনের সুরা বাকারার ২৫৬ নম্বর আয়াতের প্রথম অংশ উদ্ধৃত করে বললেন, ইসলামে ধর্ম নিয়ে জবরদস্তি নেই। যার খুশি সে নামাজ পড়বে। যার খুশি সে পড়বে না। তিনি আরও বললেন, বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। এখানে কাউকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে নামাজ পড়ানো যাবে না। ভদ্রলোক একই আয়াতের ঠিক পরের অংশটি বেমালুম চেপে গেলেন, যেমনটি আমাদের দেশের একধরনের সেকুলারিস্ট রাজনৈতিক নেতারা করে থাকেন। এধরনের লোকদের সাথে তর্ক করে লাভ হয় না। আমি আমার অফিস সুপারিনটেনডেন্ট নাজির সাহেবকে বললাম মাসুদ সাহেবের ছেলের পার্সোনাল ফাইল আনতে। ফাইলের একেবারের প্রথম পাতাটি ছিলো দু’বছর আগে পাঠানো তাঁর ছেলের ভর্তির দরখাস্ত। যার নিচের দিকে মাসুদ সাহেবের নিজের দস্তখত। দরখাস্তে প্রার্থীর ধর্ম হিসেবে ‘ইসলাম’ কলম দিয়ে লেখা ছিলো। আমি কথা না বাড়িয়ে দরখাস্তটি মাসুদ সাহেবের দিকে এগিয়ে দিয়ে বরলাম, ‘ইসলাম’ কথাটি কেটে দিন। পরিবর্তে ‘নাস্তিক’ বা ‘নাই’ যা খুশি লিখে নিচে আজকের তারিখসহ ইনিশিয়াল করে দিন। আপনার ছেলেকে আর আমি জোর করে নামাজ পড়তে নেবো না। ভদ্রলোক মনে হলো বজ্রাহত হলেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, তা কি সম্ভব ? আমি বললাম, যদি সম্ভব না হয়, তাহলে দয়া করে এবার যান। আমাকে আমার কাজ করতে দিন। মাসুদ সাহেব আর কথা না বাড়িয়ে উঠে গেলেন। এই ঘটনার পর কোনো পেরেন্টস ডে’তে ওনার সাথে আর দেখা হয়েছে বলে পড়ে না। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর ক্যাডেট কলেজকে লোকচোখে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য কিছু মতলববাজ লোক এক ধরনের প্রপাগান্ডা শুরু করে। তারা বলতে শুরু করে, নতুন সংবিধানে সেকুলারিজম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সুতরাং স্কুলের বাচ্চাদের আর ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ক্যাডেট কলেজসহ সকল স্কুল থেকে অবিলম্বে ধর্মীয় শিক্ষা উঠিয়ে দেওয়া হোক। সংবিধানে যা-ই লেখা থাক না কেনো, বাস্তব সত্য হচ্ছে, একজন মুসলমান আল্লাহ কর্তৃক নির্দেশিত এবং রাসুল পাক (সা:) কর্তৃক প্রদর্শিত পথে আল্লাহর ইবাদত করেন। নিজে নামাজ-রোজা করেন, সন্তানকে নামাজ-কালিমা শেখান। পিতামাতা বা কারো মৃত্যু হলে তাঁর জন্য জানাযা পড়েন, দোয়া করেন। শতকরা নব্বইভাগ মুসলমানের দেশে এসবই তো স্বাভাবিক। কীভাবে এসব কতর্ব্য পালন করতে হয়, অর্থাৎ দৈনন্দিন জীবনে কীভাবে ইসলাম চর্চা করতে হয় এবং তার অনুশাসন মেনে চলতে হয়, তা একজন মুসলমানের সন্তানকে শিশুকাল থেকে শিক্ষা দেওয়া অতীব জরুরি। কয়েক যুগ আগে নিজ বাড়িতে ধর্মীয় শিক্ষক রেখে, অথবা নিকটস্থ মকতবে পাঠিয়ে মুসলমানের শিশু সন্তানদের এসব শেখানো হতো। আজকাল নানা কারণে পিতামাতার পক্ষে এই দায়িত্ব পালন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই সংগত কারণে সেই দায়িত্ব রাষ্ট্র নিজে গ্রহণ করেছে। স্কুল পর্যায়ে তাই ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। শুধু ইসলাম নয়, অন্য ধর্মালম্বীদের সন্তানদেরও নিজনিজ ধর্ম শিক্ষার ব্যবস্থা স্কুলে রাখা হয়েছে। ক্যাডেট কলেজেও ইসলামসহ সকল ধর্ম শিক্ষা দেওয়া হয়ে থাকে। নৈতিক শিক্ষাকে সব সময় সাধারণ শিক্ষার অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে ধরা হয়। নৈতিক শিক্ষা ছাড়া শিক্ষা কখনও পূর্ণতা লাভ করে না। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য একটি মানব শিশুকে আলোকিত মানুষে, পরিপূর্ণ মানুষরূপে গড়ে তোলা। যে মানুষের নৈতিক গুণাবলী নাই তাকে আর যা-ই বলা যায় না কেনো, আলোকিত বা পরিপূর্ণ মানুষ বলা যায় না। পৃথিবীর সকল সমাজে ধর্মীয় শিক্ষাকে, শিক্ষক থেকে ছাত্রের মধ্যে, নৈতিক শিক্ষা স্থানান্তরের সর্বোৎকৃষ্ট কনডুইট (Conduit) বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। যেসব লোক স্কুল থেকে ধর্মীয় শিক্ষার মূলোৎপাটন করতে চান তাঁরা নৈতিক শিক্ষা প্রদানের কনডুইটের বিকল্প হিসেবে স্কুল পর্যায়ে কী ব্যবহার করবেন, তা কিন্তু বলেন না। ধর্মীয় শিক্ষার নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক গুরুত্ব ছাড়াও সামাজিক গুরুত্ব অপরিসীম। ধরা যাক, আমাদের দেশে মুসলমান বলে পরিচিত একজন লোক কোনো প্রতিষ্ঠানের নেতৃস্থানীয় পদে আছেন। তিনি হতে পারেন বেসামরিক বা সামরিক সার্ভিসের অফিসার, অথবা কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের একজন বড়কর্তা। তাঁর প্রতিষ্ঠানের কেউ একজন মারা গেলো। কর্তাব্যাক্তিটি এই বলে জানাযায় যোগ দিলেন না যে, তিনি জানাযার নামায পড়তে জানেন না। তা হলে ঐ প্রতিষ্ঠানের লোকেরা কি তাঁকে মনেপ্রাণে নেতা হিসাবে মেনে নিতে পারবেন ? নিশ্চয়ই না। মাসুদ সাহেবের কথা শোনার পর থেকে অনেকদিন বিষয়টি নিয়ে ভেবেছি। বন্ধুবান্ধব ও সহকর্মীদের সাথে আলোচনা করেছি। আসলে ইংরেজি সেকুলারিজম শব্দটির অর্থ কি ? ধর্মনিরপেক্ষতা না ধর্মহীনতা ? যদি ধর্মহীনতা হয়, তাহলে অর্থ খুব পরিষ্কার। সেকুলার সমাজে বা রাষ্ট্রে ধর্মের কোনো স্থান নেই। সহজ কথা। এ নিয়ে অতিরিক্ত আলোচনার প্রয়োজন নেই। কিন্তু যদি অর্থ হয় ধর্মনিরপেক্ষতা, তা হলে বিষয়টি অবশ্যই বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। ধরা যাক, আমাকে বলা হলো: ইসলামধর্ম, সনাতনধর্ম, খৃষ্টধর্ম, বৌদ্ধধর্ম, এসবের মধ্য থেকে যেকোনো একটি ধর্ম পসন্দ করে নেও। বলা বাহুল্য, একজন মুসলমান হিসেবে ইসলামই হবে আমার শেষ এবং একমাত্র চয়েস। একইভাবে একজন হিন্দু, খৃষ্টান বা বৌদ্ধ নিজনিজ ধর্মকে বেছে নিবেন। এখানে তো কারো পক্ষে নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ নেই। তাহলে কথাটা দাড়ালো, সেকুলারিজমের অর্থ ধর্মনিরপেক্ষতা করা যায় না। আজকাল কেউ কেউ সেকুলারিজমের অর্থ অসাম্প্রদায়িকতা বলে চালাবার চেষ্টা করছেন। আমি মনে করি, সেটাও ঠিক নয়। ধর্ম আর সম্প্রদায় এক কথা নয়। একই ধর্মের মধ্যে একাধিক সম্প্রদায় বিরাজ করে। পশ্চিমা বিশ্বে, এমন কি আমাদের পাশের দেশ ভারতে, সেকুলারিজম বলতে সকল ধর্মের সমান মর্যাদা ও গুরুত্বকে বুঝানো হয়। সঠিক অর্থ প্রকাশ করা জন্য এর বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে ‘ পরধর্মসহিষ্ঞুতা’ বলা যেতে পারে। আশা করি, যাঁরা বাংলাভাষার শব্দ বা ওয়ার্ডের উৎস এবং অর্থ নিয়ে গবেষণা করেন ( Etymologist) তাঁরা যদি একটি যুৎসই প্রতিশব্দ চালু করতে পারেন তাহলে সেকুলারিজমের অর্থ নিয়ে সকল বিভ্রান্তি দূর হবে। আজকের পর্ব শেষ করার পূর্বে আমাদের দেশের সেকুলারিজমের অন্ধ ভক্তদের উদ্দেশ্যে কয়েকটি কথা নিবেদন করতে চাই। ১৯৭৬ সনের ২২ সেপ্টেম্বর তারিখে আমি, আরও দু’জন সহকর্মীর সাথে, প্রথম চীনদেশে যাই। ১৯৭১ সনে দেশ স্বাধীন হবার আগে ইসলামাবাদে অবস্থিত ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব মডার্ন ল্যাঙ্গুয়েজেজ নামক প্রতিষ্ঠানে সরকারি ব্যবস্থায় দেড় বছর চীনা ভাষা পড়াশুনা করি। যুদ্ধ শুরু হবার কারণে পাকিস্তানিরা আমাদের তিনজন বাংগালিকে ফাইনাল পরীক্ষা দিতে না দিয়ে প্রথমে বিভিন্ন ইউনিটে, পরে বন্দিশিবিরে পাঠিয়ে দেয়। চীন কর্তৃক বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পরপরই বাংলাদেশ আর্মি আমাদের তিনজনকে চীনা বৃত্তির অধীনে সে দেশে চীনা ভাষার কোর্সটি শেষ করে ডিগ্রি নেবার জন্য পাঠিয়ে দেয়। মূল কোর্স তিন বছরের হলেও পূর্ববর্তী পাঠকাল বিবেচনা করে দশ মাসের একটি সেসনের পর আমাদের তিনজনকে চীনের বিশ্ববিদ্যালয়টি ফাইনাল পরীক্ষায় অংশ নেবার অনুমতি দেয়। আগের থেকে চীনা ভাষায় অনেকটা দক্ষতা থাকার কারণে সেখানে পৌছে, ইন্টারপ্রেটরের মাধ্যমে নয়, আমরা নিজেদের চোখ-কান দিয়ে চীনা সমাজ এবং রাষ্ট্রকে দেখতে পেরছি। সর্বপ্রথম যে বিষয়টা আমাদের মনে গভীর রেখাপাত করলো, তা হলো নিজেরা কট্টর কম্যুনিস্ট হওয়া সত্বেও অন্যের ধর্মের প্রতি তাদের শ্রদ্ধাবোধ। আমাদের ক্যাফেটেরিয়ায় মুসলমান ছাত্রদের জন্য আলাদা ডাইনিং হল ছিলো। যেখানে মুসলমান শেফ দিয়ে রান্না করা একমাত্র হালাল খাবার পরিবেশন করা হতো। তখন এবং পরবর্তীকালে চীনে থাকার সময় চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক শহর এবং গ্রাম ভিজিট করেছি। সবখানে একই রকম অবস্থা দেখেছি। মসজিদসহ সকল ধর্মের উপাসনালয় রাষ্ট্রের টাকায় চালানো হচ্ছে। সরকারি কোষাগারের অর্থ দিয়ে কুর’আন শরীফ ছাপিয়ে মুসলমানদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে, মসজিদের ইমামদের বেতন দেওয়া হচ্ছে। এমনকি সরকারি টাকায় প্রতি বছর মুসলমানদের হজ্জ করতে পাঠানো হচ্ছে। ইসলাম সম্বন্ধে পড়াশুনা করার জন্য ইমামদের মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হচ্ছে। ছোটোবড় সকল শহরে হালাল গোস্তের দোকান রয়েছে। প্রায় সব রেস্টুরেন্টে হালাল খাবার পরিবেশনের ব্যবস্থা রয়েছে, যা রেস্টুরেন্টের বাইরে সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে। একবার বিশেষ ট্রেনে করে আমাদের কোথাও নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো। পথে খাবারের জন্য একটি স্টেশনে ট্রেন থেমেছিলো। আমরা কিছু মুসলমান যাত্রী খাবার শেষ হলে ওয়াক্তিয়া নামাজের জন্য প্ল্যাটফর্মের উপর দাঁড়ালাম। চীনারা বিন্দুমাত্র বিরক্তি প্রকাশ না করে নামাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে পরে ট্রেন ছাড়লো। আরেকবার, তখন আমি আমাদের পেইচিং দূতাবাসে চাকুরি করি, রমজান মাসে পেইচিং থেকে অনেক দূরে এক শহরে কাজে গিয়েছি। সেখানে পৌছার পর আমার হোস্টকে জানালাম, আমি রোজা রাখছি, শেষরাতে সেহরির ব্যবস্থা করা যাবে কিনা। হোস্ট, পিএলএ’র একজন কর্নেল, হেসে দিয়ে বললেন, আমি তোমাদের রোজা সম্বন্ধে জানি। আমার ইউনিটে কিছু মুসলিম সোলজার আছে যারা নিয়মিত রোজা রাখে। তুমি এ নিয়ে ভেবো না। ভোর রাতে দরজায় নক্ শুনে জেগে দেখলাম মেসের দু’জন কর্মীকে সাথে নিয়ে চীনা কর্নেল সাহেব ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় নিজে সেহরির খাবার হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। এ দৃশ্য দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলাম। কর্নেল সাহেব অনুমতি নিয়ে ঘরে এসে টেবিলে খাবার সাজিয়ে রেখে চলে গেলেন। যাবার সময় বলে গেলেন, সকাল বেলা প্লেট-পেয়ালা নিয়ে যাবেন। দু’তিন দিন সেখানে ছিলাম। প্রতিদিন সেহরি এবং ইফতারির সময় একইভাবে আমাকে খাবার সার্ভ করা হয়েছিলো। কম্যুনিস্ট দেশের মানুষের অপরের ধর্মের প্রতি সম্মান দেখার পর আমার দেশে মুসলমানের ঘরে জন্ম নেয়া সেকুলারিজমের ফেরিওয়ালাদের কথা শুনে ভাবি, এরা আসলে কী চায় ?

ক্যাডেট কলেজের টুকরো স্মৃতি: ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ: পর্ব ৩: মায়ের মন মানে না মানা

সন্তানের প্রতি বাংগালি মায়ের প্রবাদতুল্য বাৎসল্য সম্পর্কে আমরা সবাই অবগত আছি। এজন্য আমরা বাংগালিরা নিজেদেরকে ভাগ্যবান মনে করি। কন্তু কখনও যে এই বাৎসল্য অশান্তির কারণ হতে পারে তেমন অভিজ্ঞতা ক’জনের হয় ? ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজে প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালনকালে আমাকে এমন একটি অশান্তির মোকাবিলা করতে গিয়ে বেশ বেগ পেতে হয়েছিলো। এখানে বলে রাখা ভালো, ছোটোবেলায় নিজের মাকে হারিয়েছিলাম। তাই মায়েদের ব্যাপারে সবসময় খুব ষ্পর্শকাতর ছিলাম, এখনও আছি। আমি যখন দেখি একজন মা তাঁর সন্তানকে কোলে নিয়ে চুমু খাচ্ছেন, সন্তানের মাথায় হাত রেখে দোয়া করছেন, অথবা নিজহাতে সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন, তখন আমার মনে হয় পৃথিবীর একটি সুন্দরতম দৃশ্য আল্লাহ আমাকে দেখাচ্ছেন। আমার কোনো কাজে বা কথায় কোনো মা কষ্ট পান তা আমি কখনও চাই না। তারপরও ক্যাডেটদের বৃহত্তর স্বার্থে আমাকে এমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিলো যাতে তাদের মায়েরা আহত বোধ করেছিলেন। পেরেন্টস ভিজিটিং ডে’তে আগত সকল মা তাঁর ছেলের জন্য একাধিক টিফিন ক্যারিয়ার এবং ব্যাগ ভরে খাবার নিয়ে আসতেন। রান্না করা নানাবিধ খাবার, পিঠাপায়েস থেকে শুরু করে যাবতীয় মৌসুমী ফল, কোমল পানীয় কোনোকিছু বাদ যেতো না। বিশেষ করে নিচের ক্লাসের ছেলেদের মায়েদের মধ্যে প্রবণতাটা লক্ষ্যণীয়ভাবে বেশি ছিলো। মা ছেলেকে নিজের পাশে বসিয়ে ‘ডাকফিডিং’ করতেন। যার ফলে পরদিন সকালে কলেজের হাসপাতালে ডায়রিয়াজনিত কারণে সিক রিপোর্টের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতো। তবে সবচেয়ে খারাপ পরিণতি ছিলো বিষয়টির ইমশেনাল দিক। যাদের মায়েরা আসতেন সেসব ক্যাডেট সবার সামনে প্রকাশ্যে হাপুসহুপুস করে খেলেও, যাদের মায়েরা আসতে পারতেন না তাদের চোখেমুখে যে বঞ্চনার করুণভাব ফুঠে উঠতো তা আমাকে ব্যাথিত করে তুলতো। এমন অনেক ছেলে ছিলো যাদের মায়েরা দূরত্ব অথবা অসুস্থতার কারণে কখনই আসতে পারতেন না। এদের অবস্থা চিন্তা করে আমার নিজের মনও খারাপ হয়ে যেতো। একদিন কৌতহল বশত: ছেলেকে খাওয়াচ্ছেন এমন একজন মায়ের পাশে গিয়ে বসে আলাপ শুরু করলাম। দেখলাম তিনি পরম আদরের সাথে আস্ত মুরগির রোস্ট ভেঙ্গে ছেলের মুখে তুলে দিচ্ছেন। জানতে পারলাম, ছেলেটির বাবা খুলনায় স্বল্প বেতনে একটি চাকুরি করেন। তাঁদের আরও তিনটি ছেলেমেয়ে বাড়িতে আছে। জিজ্ঞাসা করলাম, বাসায় সপ্তাহে ক’বার মুরগির রোস্ট রান্না করেন ? জবাবে তিনি জানালেন, সপ্তাহ তো দূরের কথা। মাসেও একবার করেন না। সামর্থ্যে কুলায় না। মেহমান-অতিথি এলে কালেভদ্রে মুরগির রোস্ট রান্না করেন। জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কী জানেন, আপনার এই ছেলে ক্যাডেট কলেজে সপ্তাহে কতবার মুরগির গোস্ত খায় ? মা কিছুক্ষণ নীরবে মাথা নিচু করে থেকে বললেন, কী করবো স্যার। মনটা যে মানে না। প্রত্যেকবার পেরেন্টস ডে’তে আসার সময় টাকা ধার করে মুরগি কিনে রোস্ট বানিয়ে আনি। আমি তাঁর ক্যাডেট ছেলেকে দেখিয়ে বললাম, এই ছেলে সপ্তাহে চার বেলা মুরগির গোস্ত, চার বেলা গরু বা খাসির গোস্ত, চার বেলা বড় মাছ এবং দুই বেলা শাকশব্জি দিয়ে ভাত বা পোলাও খায়। এছাড়া নিয়মিত ডিম, দুধ, ফলমূলসহ অনেক রকম পুষ্টিকর খাবার খেয়ে থাকে। আপনি তো আপনার চারটি সন্তানের সকলরই মা। বাড়িতে আপনার সাথে যে তিনজন থাকে তাদেরকে মাসে একবার মুরগি খাওয়াতে পারেন না। অথচ, যে ছেলে ক্যাডেট কলেজে থেকে সপ্তাহে চারদিন মুরগিসহ আরও অনেক পুষ্টিকর খাবার খাচ্ছে তার জন্য ধার করা টাকা দিয়ে মুরগি রান্না করে আনছেন, আপনারই অন্য বাচ্চাদের বঞ্চিত করে। মা হয়ে সন্তানদের মধ্যে এ ধরনের পক্ষপাতিত্ব করা কি ঠিক কাজ হলো ? আমি মায়ের চোখে পানি দেখলাম। তিনি বললেন, আজই শেষ। ভবিষ্যতে এমন আর হবে না। আমি মায়ের চোখের পানিতে সমস্যার সমাধান খুঁজে পেলাম। সহকর্মীদের সাথে আলাপ করে পেরেন্টস ভিজিটিং ডে’তে ক্যাডেটদের জন্য সকল প্রকার খাবার এবং পানীয় আনা কঠিনভাবে নিষিদ্ধ করা হলো। এবার অনেক মা ভীষণ ক্ষেপে গেলেন। তাঁদের বক্তব্য, আমরা নিজেদের টাকা দিয়ে নিজেদের ছেলেদের জন্য খাবার আনি। তাতে প্রিন্সিপাল সাহেবের আপত্তি করার কী আছে ? একদিন চারপাঁচজন মা মিলে একটি ডেলিগেশন নিয়ে আমার অফিসে এলেন। আমার সিদ্ধান্ত বাতিল করার জন্য জোর অনুরোধ জানালেন। আমি আমার পক্ষ থেকে বিষয়টি বুঝিয়ে বললাম। উপরে বর্ণিত মায়ের ছেলেকে মুরগির রোস্ট খাওয়ানের ঘটনা বললাম। সবশেষে বললাম, তবে হ্যাঁ, আমার তিন’শ ছেলের সবার জন্য যদি খাবার আনতে পারেন তা হলে মোস্ট ওয়েলকাম। আমাকে আগে থাকতে জানাবেন। আমি আনন্দের সাথে পরিবেশনের সব ব্যবস্থা করে দেবো। এরপর এমন অনুরোধ নিয়ে কেউ আর অমার কাছে আসেননি।

ক্যাডেট কলেজের টুকরো স্মৃতি: ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ: পর্ব ২: প্রিন্সিপাল তো নয় যেনো আই জি প্রিজন !

ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজে যোগদান করার পরপরই নজর দিলাম ক্যাডেটদেরকে বাইরের সকল প্রকার অশুভ প্রভাব ও হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষা প্রদানের দিকে। কারণ, আমার মনে হয়েছে, ভিতরে আমি যতো ভালো কাজই করি না কেনো, বাইরের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে তাকে রক্ষা না করতে পারলে সে ভালো কাজ সফল হবে না। মাসে একটি নির্দিষ্ট দিনে পেরেন্টস ভিজিটিং ডে ছিলো। বিধি অনুযায়ী ঐদিন শুধুমাত্র ক্যাডেটদের পিতামাতা এবং অনুমোদিত স্থানীয় আভিভাবকরা ক্যাডেটদের সাথে দেখা করতে আসতে পারতেন। ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে একটা নির্দিষ্ট স্থানে একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দেখাসাক্ষাতের ব্যবস্থা ছিলো। লক্ষ্য করলাম, ঐদিন কলেজের মেইন গেইট দিয়ে জলের স্রোতের মতো লোকজন ঢুকতো। কে কার সাথে দেখা করলো তার কোনো হিসাব ছিলো না। খবর নিয়ে জানলাম, ক্যাডেটদের পিতামাতা ছাড়াও, আত্মীয় নয় এমন লোকজন আত্মীয় পরিচয় দিয়ে প্রবেশ করতো। যার মধ্যে উগ্র রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ধর্মীয় গুরু, এলাকার মাস্তান, সিনিয়র ক্লাসের ক্যাডেটদের গার্লফ্রেন্ডসহ আরো অনেকে ছিলো। এ ছাড়া পেরেন্টস ভিজিটিং ডে নয় এমন দিনেও কিছুকিছু লোক, বিশেষ করে কিছু উচ্চপদস্থ সরকারি অফিসার এবং তাঁদের পত্নীগণ, ভিতরে এসে ক্যাডেটদের সাথে দেখা করতো। একদিন ক্লাস টুয়েলভের একটি ছেলের বাবা আমাকে ঢাকা থেকে টেলিফোন করলেন। ধরা যাক ছেলেটির নাম বাবর। অত্যন্ত কাতর কন্ঠে আমাকে বাবরের বাবা যা বললেন তার সারাংশ হলো: তিনি একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাঝারি পর্যায়ের অফিসার। আগে যশোর শহরে পোস্টেড ছিলেন তখন পেরন্টেস ভিজিটিং ডে’তে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এসে বাবরের সাথে দেখা করতেন। ঢাকায় থাকার কারণে গত ছ’মাস যাবত তিনি বা পরিবারের অন্য কেউ ঐদিনগুলোতে বাবরকে দেখতে আসতে পারছেন না। এই সুযোগ নিয়ে তাঁদের যশোরের এক প্রাক্তন পড়শী মহিলা বাবরের খালার পরিচয় দিয়ে বাবরকে দেখতে আসছে। আমি সরল মনে জানতে চাইলাম তাতে দোষের কী হলো। জবাবে ভদ্রলোক যা বললেন তাতে আমার দিব্যদৃষ্টি খুলে গেলো ! তথাকথিত খালার একটি ১৫/১৬ বছর বয়সী মেয়ে আছে যে ক্লাস টেনে পড়ে। মহিলা চাচ্ছে বাবর যাতে তার মেয়ের সাথে প্রেম করতে থাকে। বাবর ক্যাডেট কলেজের ছাত্র, পড়াশুনাসহ সবদিক দিয়ে ভালো। জামাই হিসেবে খুব ভালো হবে। তাই এখন থেকে ‘হুক’ করে রাখতে চাচ্ছে। বাবর অনেকটা পটে গেছে বলে বাবরের মা-বাবার ধারণা। কলেজে লম্বা ছুটি হলে বাবর এখন আর সরাসরি ঢাকা চলে যায় না। যশোরে ‘খালা’র বাসায় দু’য়েক দিন বেড়িয়ে পরে ঢাকা যায়। বিষয়টি বাবরের বাবা এবং মা কেউই মেনে নিতে পারছেন না। কাঁদোকাঁদো হয়ে তিনি বললেন, যেভাবেই হোক বাবরের সাথে ঐ ‘খালা’ এবং তার মেয়ের দেখাসাক্ষাত বন্ধ করতেই হবে। কলেজে ভেকেশন শুরু হলে বাবরকে সরাসরি ঢাকাতে আসতে হবে। যশোরে ‘খালা’র বাড়ি যাওয়া চলবে না। আমি মনেমনে ভাবলাম, আল্লাহ জানেন, এমন আর কতো বাবর আছে আমার কলেজে ! আমি বাবরের বাবাকে এই বলে আস্বস্ত করলাম, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। অবশ্যই কিছু একটা করবো। মাসিক হা্‌উস ইন্সপেকশনের সময় কোনোকোনো ক্যাডেটের কাবার্ড থেকে উগ্র রাজনৈতিক দলের প্রচারমূলক পুস্তিকা, লিফলেট পাওয়া গেলো। শুক্রবার জুমার নামাজে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলের সদস্যরা নামাজ পড়ার অছিলায় কলেজ মসজিদে এসে ছেলেদের সাথে রাজনৈতিক আলোচনা করতো। কিছু উগ্র বামপন্থী দলের কর্মীরাও সুযোগ বুঝে কলেজে ঢুকে একই কাজ করছে বলে জানতে পারললাম। টি-ব্রেকের সময় আমি স্টাফ রুমে গিয়ে ফ্যাকাল্টি মেম্বারদের সাথে একত্রে চা-নাস্তা খেতাম । এটা আমার প্রতিদিনের অভ্যাস ছিলো। অভ্যাসটি শিখেছিলাম আর্মি থেকে। ইউনিট পর্যায়ে আর্মিতে এটির চর্চা খুব জনপ্রিয়। অফিসে বা বাইরে খুব জরুরি কিছু না থাকলে এটা মিস করতাম না। চা-নাস্তা খেতেখেতে হাল্কা পরিবেশে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অবতারণা করে সকলের মতামত ও সুপারিশ জেনে নিতাম। মতানৈক্য হলে বেশ বিতর্ক জমে উঠতো। টি-ব্রেকের নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে গেলে যাঁদের ক্লাস বা কাজ থাকতো তাঁরা উঠে চলে যেতেন। আমি অন্যদের নিয়ে আলাপ করতাম। ফর্মাল স্টাফ মিটিংয়ে অনেকে, বিশেষ করে জুনিয়র সহকর্মীরা, সহজে মুখ খুলতে চান না। কিন্তু ইনফর্মাল চায়ের টেবিলে হাল্কা পরিবেশের কারণে সবাই মনের কথা বলতে উৎসাহিত বোধ করতেন। অনেকটা আড্ডার মতো পরিবেশ হতো, যেখানে আমি বলতাম খুব কম, শুনতাম বেশি। নেপথ্যে থেকে আলোচনার বিষয় ও গতি নিয়ন্ত্রণ করতাম। প্রায় সকল ক্ষেত্রে আলোচনায় গৃহীত সিদ্ধান্ত আমার নিজস্ব সিদ্ধান্ত থেকে ভিন্নতর হতো না। এ ধরনের আলোচনায় আরও একটা সুবিধা ছিলো। আলোচনার মাধ্যমে যে সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসতো তা, প্রিন্সিপালের সিদ্ধান্ত হিসেবে অফিস অর্ডারের মাধ্যমে প্রকাশিত হলেও, উপস্থিত সকলে যৌথ সিদ্ধান্ত হিসেবে মেনে নিয়ে তা আন্তরিকভাবে পালন করতেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সবাই নিজেকে অংশীদার মনে করতেন। প্রিন্সিপালকে কমান্ডার বা বস হিসেবে না দেখে টীমলিডার হিসেবে দেখতেন। নির্দেশ প্রদান ও পালনের ক্ষেত্রে এই বিশেষ পদ্ধতিটি খুবই কার্যকর হয়েছিলো। ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশিরা এন্টি এস্টাবলিশমেন্ট। যার কারণে, শিক্ষিতরা বসের আদেশ মানার চাইতে টীমলিডারের আদেশ মানতে আধিকতর সাচ্ছ্যন্দ বোধ করেন বলে আমি মনে করি। যাহোক, পেরেন্টস ভিজিটিং ডে’তে সৃষ্ট এসব অরাজকতা দূর করার জন্য টি-রুমে আলোচনার ভিত্তিতে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। যা ক্যাডেটদেরকে সাপ্তাহিক সমাবেসে, এবং তাদের পিতামাতা/অভিভাবকদেরকে লিখিতভাবে জানিয়ে দেওয়া হলো। কলেজ গেইটে কড়াকড়ি আরোপ করা হলো। কলেজ চত্বরে ঢোকার সময় এবং বের হবার সময় সকল ভিজিটরক তার নাম, ঠিকানা, প্রবেশের সময় এবং কারণ, এবং বের হবার সময় লিপিবদ্ধ করার নিয়ম চালু করা হলো। শুক্রবার ক্যাডেট ও ক্যাম্পাসে বসবাসকারী ছাড়া অন্যদের কলেজ মসজিদে জুমার নামাজের জন্য আসা বন্ধ করা হলো। ক্যাডেটদের আবাসিক এলাকায় প্রবেশের পথে প্রয়োজনীয় চেকপোস্ট বসানো হলো। মসজিদে কর্মকর্তা-কর্মচারীর কোনো বহিরাগত মেহমান আসতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বলা হলো মেহমানকে নিজে সঙ্গে করে আনতে। সকল পিতামাতা ও অনুমোদিত অভিভাবককে কলেজের অফিস থেকে ছবিসহ পরিচয়পত্র প্রদান করা হলো। পেরেন্টস ভিজিটিং ডে’তে পরিচয়পত্র দেখিয়ে প্রবেশ করা বাধ্যতামূলক করা হলো। কোনো পিতামাতা বা অনুমোদিত অবিভাবক পরিচয়পত্র আনতে ভুলে গেলে সংশ্লিষ্ট ক্যাডেটের হাউস মাস্টার/টিউটর গেইটে এসে পরিচয় জেনে নিয়ে তাঁকে ভিতরে আসতে দিতেন। এতো সব করার পরও বাবরের বাবার সমস্যা পুরোপুরি সমাধান হলো না। বাবরের যশোর যাওয়া বন্ধ করতে হবে। ঝিনাইদহ বাস মালিক সমিতির কর্মকর্তাদেরকে চায়ের দাওয়াত দিয়ে আমার অফিসে ডেকে এনে সহযোগিতা চাইলাম। সিদ্ধান্ত হলো, ভেকেশন শুরুর কয়েকদিন আগে জানালে তাঁরা ঢাকা, খুলনা, কুষ্টিয়া, যশোর, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা এসব শহরের জন্য রিজার্ভড বাসের ব্যবস্থা করে দিবেন। এসব বাস গন্তব্য ছাড়া রাস্তায় কোথাও থামবে না। কোনো ক্যাডেট নির্ধারিত গন্তব্য ছাড়া অন্য কোথাও যেতে চাইলে আগেভাগে অভিভাবকের কাছ থেকে লিখিত অনুরোধ আনতে হবে। এরপর থেকে বাবরের পক্ষে আর যশোরে ‘খালা’র বাড়ি যাওয়া আমার জানামতে সম্ভব হয়নি। তবে শেষ পর্যন্ত সেই ‘খালা’র মেয়েটির সাথে বাবরের প্রেম কতদূর এগিয়েছিলো, তা আমি জানতে পারিনি ! ইতোমধ্যে একটি ঘটনা ঘটলো যা আমার জন্য কষ্টদায়ক হলেও আমার কাজ কিছুটা হলেও সহজ করে দিলো। একদিন দুপুর বেলা আমার বড় মামা গ্রামের বাড়ি থেকে কলেজে এলেন আমার পরিবারের সবার সাথে দেখা করতে। ছোটো বেলায় আমার মা মারা যাবার পর থেকে, যেখানেই থাকতাম না কেনো, উনি প্রায়ই এমন আসতেন। বিকেল বেলা মামা ইচ্ছে প্রকাশ করলেন উনার গ্রামের একটি ক্যাডেটকে উনি দেখবেন। ওর বাবাকে উনি কথা দিয়ে এসেছেন। আমি পড়লাম মহা বিপদে। কলেজের আইন ভঙ্গ করে আমার পক্ষে উনার ইচ্ছা পূরণ করা কিছুতেই সম্ভব নয়। অন্যদিকে জীবনে কখনও মামার কথা অমান্য করিনি। তখনই সরাসরি জবাব দিলে, আমি জানি, মামা আমার বাসা ছেড়ে রাগ করে চলে যাবেন। কিছুটা সময় নেবার জন্য বললাম, এই তো এলেন। রেস্ট করেন। দেখি কাল সকালে কী করা যায়। পরদিন সকাল বেলা নাস্তার টেবিলে মামা পুনরায় অনুরোধ জানালেন ছেলেটিকে দেখার জন্য। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ক্যাডেটদের সাথে বহিরাগতদের দেখাসাক্ষাতের নিয়মকানুন সম্পর্কে ছেলেটির বাবা আপনাকে কিছু বলেননি ? তিনি জানালেন, না। আমি তখন অনেক কষ্টে তাকে বুঝিয়ে বললাম, কেনো কলেজের আইন অনুযায়ী তাঁর সাথে ছেলেটিকে দেখা করতে দেওয়া যায় না। তিনি বললেন, প্রিন্সিপাল আনুমতি দিলেও দেখা করা যাবে না ? আমি বললাম, না। খুব জরুরি কারণ ছাড়া প্রিন্সিপালের অনুমতি দেওয়ার এখতিয়ার নেই। আপনার সাথে ঐ ছেলেটির দেখা করার কোনো জরুরি প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। আমি খোঁজ নিয়েছি। ছেলেটি ভালো আছে। বাড়ি ফিরে ওর বাবাকে জানিয়ে দিবেন। যদি ওর বাবা প্রশ্ন করেন কেনো দেখা হলো না, তবে তাঁকে কি জবাব দেবো, মামা জানতে চাইলেন। বলবেন, ভাগ্নে খুব আদর যত্ন ও সম্মান করেছে। তবে প্রিন্সিপাল বেটা খুব নিষ্ঠুর ! কোনোমতেই আপনার ছেলের সাথে দেখা করার অনুমতি দিলো না। আমার একথা শুনে মনে হলো মামা নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। মুখ অত্যন্ত বেজার করে মামা উঠে গেলেন। কোনো রকমে চা-নাস্তা খেয়ে চলে গেলেন। তারপর রাগ করে প্রায় তিনচার মাস আমার বাসায় আসেননি। ঘটনাটি কেমন করে যেনো সারা কলেজে ছড়িয়ে গেলো। হয়তো প্রিন্সিপালের বাসার স্টাফদের কাছ থেকে জানতে পেরে থাকবে। এখানে একটা কথা বলে রাখি। ক্যাডেট কলেজের প্রিন্সিপালের ব্যক্তিগত জীবনে প্রাইভেসি বলতে কিছু নেই। সারাক্ষণ তাঁকে এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদেরকে প্রায় ১৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর তীক্ষ্ন নজরদারিতে থাকতে হয়। ভালো বা মন্দ উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটলে তা সাথেসাথে সবার কানে পৌঁছে যায়। ক্যাডেটরাও জেনে ফেলে। এজন্য প্রিন্সিপালকে, এমনকি তাঁর পরিবারের সদস্যদেরকে, প্রতিটি কাজে এবং কথায় অনগার্ড থাকা খুবই জরুরি। কিছুকিছু পিতামাতা/অভিভাবক, বিশেষ করে মায়েরা, উপরে উক্ত ব্যবস্থা নেবার কারণে প্রথম দিকে প্রিন্সিপালের উপর খুব রাগ করেছিলেন। তাঁদের নানারকম মন্তব্য, যা মোটেও সুখকর ছিলো না, ঘুরেফিরে আমার কানে আসতে লাগলো। তাঁরা কেউকেউ এমন মন্তব্যও করলেন, প্রিন্সিপাল তো নয় যেনো আই জি প্রিজন এসেছেন। তবে অনেকে ব্যাপারটি প্রশংসার চোখেও দেখেছিলেন। কিছুদিন পরে অবশ্য সবাই নিয়মটি মন থেকে মেনে নিয়েছিলেন।

ক্যাডেট কলেজের টুকরো স্মৃতি: ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ: পর্ব ১: প্রিন্সিপাল পদে যোগদান

১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ৮ তারিখে ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের প্রিন্সিপাল পদে যোগদান করি। তখন আমার বয়স কতোই বা হবে। সার্টিফিকেট অনুযায়ী বত্রিশ বছর কয়েক মাস। বাস্তবে তেত্রিশ বছর। প্রসঙ্গত: বর্তমান প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের জন্য একটা কথা বলা প্রয়োজন মনে করছি। এখন থেকে ষাট-সত্তর বছর আগে, আমাদের ছোটোবেলায়, এখনকার মতো জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনের কোনো রেওয়াজ এবং ব্যবস্থা ছিলো না। প্রায় সকলের দু’টো করে জন্মদিন থাকতো। একটা ছিলো আসল জন্মদিন। আর একটা অফিসিয়াল জন্মদিন। ক্লাস নাইনে উঠার পর সকলকে দু’বছর পর মেট্রিকুলেশন পরীক্ষার জন্য শিক্ষা বোর্ডে নাম রেজিস্ট্রি করতে হতো। কাজটি নিজনিজ স্কুলের মাধ্যমে করতে হতো। তখন, মাস্টার্স পাশ করে সরকারি চাকুরিতে ঢোকার সর্বনিম্ন বয়স বিবেচনায় রেখে, স্কুলের হেড স্যার একটা জন্মদিন ঠিক করে লিখে দিতেন। যাতে রিটায়ার করার আগ পর্যন্ত সর্বোচ্চ বেশিদিন চাকুরি করা সম্ভব হয়। আমার বেলায়ও তেমনটি হয়েছিলো। এ নিয়ে একবার জেদ্দা এয়ারপোর্টে বেশ বিব্রত হয়েছিলাম। আমার পাসপোর্ট দেখতেদেখতে ইমিগ্রেশন অফিসার হঠাৎ আমাকে প্রশ্ন করলেন, আচ্ছা বলোতো তোমার দেশের প্রায় সব লোকের জন্মদিন পহেলা জানুয়ারি হয় কেনো ? সৌদি ইমিগ্রেশন অফিরারটি হঠাৎ আমাকে কেনো এমন প্রশ্ন করলেন তা বুঝতে পারলাম না। আমার পাসপোর্টে অবশ্য আমার সরকারি জন্মদিন পহেলা জানুয়ারি ছিলো না। উপরে বর্ণিত আমার জবাব শুনে ভদ্রলোক অবাকই হয়েছিলেন বৈ কি ! যাহোক, আগের কথায় আসি। বলা হয়েছিলো এতো কম বয়সে, অর্থাৎ চল্লিশের চাইতে কম বয়সে,উপমহাদেশে আমার আগে আর কেউ পাবলিক স্কুল বা ক্যাডেট কলেজে প্রিন্সিপাল পদে নিয়োগ পাননি। আজকে ছত্রিশ বছর পর, ২০১৪ সালে, যখন ফিরে তাকাই তখন মনে হয়, আমার মতো এতো অল্প বয়সের একজনকে এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেবার পেছনে দু’টি কারণ ছিলো। এক, ১৯৭১ সনের পূর্বে সশস্ত্রবাহিনীর শিক্ষা বিভাগ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানি অফিসাররা চাকুরিতে সিনিয়র হবার কারণে প্রিন্সিপাল পদে নিয়োগ পেতেন। তখন পর্যন্ত মাত্র একজন বাংগালি অফিসার এই পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন। তাঁর নাম শহীদ লে: কর্নেল এম এম (মোহাম্মদ মঞ্জুরুর) রহমান এইসি (আর্মি এডুকেশন কোর), যিনি কর্নেল রহমান নামে অধিক পরিচিত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় নিজ কর্মস্থল ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজে কনের্ল রহমান পাকিস্তান আর্মির হাতে নিমর্মভাবে, একজন সত্যিকারের বীরের মত, শহীদ হন। দু:খের বিষয়, আমাদের আর্মি তথা দেশ আজ পর্যন্ত এই বীরের প্রতি যথাযথ সম্মান দেখাতে পারেনি। দুই, তখন দেশের প্রসিডেন্ট হিসেবে চীফ এক্সিকিউটিভ ছিলেন শহীদ জেনারেল জিয়াউর রহমান, বীর উত্তম। ডিফেন্স মিনিস্ট্রির দায়িত্বও তাঁর হাতে ছিলো। জে: জিয়া পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে সরাসরি ইন্সট্রাক্টর হিসেবে আমাকে পড়িয়েছেন, ট্রেইনিং দিয়েছেন। ১৯৭৩ সালে আর্মি হেডকোর্য়াটার্সে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি (বি এম এ) প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে, প্রস্তুতিমূলক কাজগুলো দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য, একটি সেল গঠন করা হয়েছিলো। অনেক কাজের মধ্যে যার প্রধান কাজ ছিলো বি এম এ’র জন্য টেবল অব অর্গানাইজেশন এন্ড ইকুইপমেন্ট (টি ও এন্ড ই) প্রনয়ণ করা। এই সেলে প্রথম যে চারজন অফিসারের কাজ করার গৌরব হয়েছিলো তার মধ্যে আমি একজন ছিলাম। জে: জিয়া আর্মির ডেপুটি চীফ অব স্টাফ হিসেবে সেলের কাজ তত্বাবধান করতেন। তখন আর একবার আমার সুযোগ হয়েছিলো জে: জিয়ার প্রত্যক্ষ সাহচর্যে আসার। পরে আরও একবার জে: জিয়ার ব্যক্তিগত তত্বাবধানে কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছিলো। ১৯৭৫ সালে মার্শাল ল’ জারি হবার পর রাস্ট্রের সকল গোয়েন্দা সংস্থার কাজকর্ম কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় করার জন্য কোঅর্ডিনেশন এন্ড কন্ট্রোল সেল ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি নামে প্রেসিডেন্টের অধীনে একটি শীর্ষ প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়। সেখানে আর্মি থেকে প্রাথমিকভাবে যে চারজন অফিসারকে নিয়োগ দেওয়া হয় তার মধ্যে আমাকে রাখা হয়েছিলো। ব্যক্তিগতভাবে জে: জিয়া এই সেলের কাজ তত্বাবধান করতেন। বলতে গেলে এসব কারণে আমি সম্ভবত: ব্যক্তিগতভাবে জে: জিয়ার স্নেহভাজন এবং আস্থাভাজন হয়ে উঠেছিলাম। ১৯৭১ সালে দেশ পাকিস্তানি হানাদার মুক্ত হবার পর দেখা গেলো বাঁচিয়ে রাখতে হলে, অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মতো, ক্যাডেট কলেজগুলোরও পুনর্গঠন করা জরুরি। তখনকার ডেপুটি আর্মি চীফ জে: জিয়াকে ক্যাডেট কলেজগুলোর গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান নিয়োগ করে তাঁকে এই দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। জে: জিয়ার নির্দেশনায় প্রিন্সিপাল নিয়োগের জন্য একটি প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়। প্রক্রিয়া অনুযায়ী ক্যাডেট কলেজের প্রিন্সিপাল হবার যোগ্য এমন প্রার্থীদের নাম আর্মি, নেভী, এয়ার ফোর্স ও ক্যাডেট কলেজের সিভিলিয়ান শিক্ষকদের পক্ষ থেকে ডিফেন্স মিনিস্ট্রিতে পাঠানো হয়। সেবার তালিকাতে আমার নামও ছিলো। পরবর্তীকালে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানতে পারি যে, নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ ক্যাডেট কলেজ কাউন্সিলের চেয়ারম্যন আমার ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছিলেন বয়স কম হবার কারণে। কিন্তু জে: জিয়া এই বলে সে আপত্তি নাকোচ করে দিয়েছিলেন, Don’t worry. I know this boy. He will not let you down. যাঁদের জে: জিয়ার সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে তাঁরা জানেন, জে: জিয়ার কথা এবং কাজের স্টাইলই এমন ছিলো। ১৯৬৩ সনে ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬৪ সন থেকে রেগুলার ক্যাডেট ভর্তি এবং ক্লাস শুরু হয়। তৎকালীন পাকিস্তান আর্মি এডুকেশন কোরের অত্যন্ত দক্ষ, মেধাবী এবং চৌকশ অফিসার লে: কর্নেল এন ডি হাসানকে প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাশ করা একঝাঁক অত্যন্ত মেধাবী ও ডেডিকেটেড যুবককে অতি যত্ন সহকারে নির্বাচন করে লেকচারার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। যাঁরা শুধু নিজনিজ একাডেমিক বিষয়ে ভালো জ্ঞান রাখতেন না, নানা প্রকার শিক্ষাসহায়ক (কো-কারিকুলার) বিষয়েও পারদর্শী ছিলেন। প্রত্যেকে বালকদের জন্য অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। এখানে উল্লেখ্য, তখন ক্যাডেট কলেজের একজন লেকচারের বেসিক পে, সরকারি কলেজ এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন লেকচারের বেসিক পে থেকে বেশি ছিলো। চাকুরির সুযোগ-সুবিধাও উন্নততর ছিলো। মুক্তিযুদ্ধের পর এসব পার্থক্য আর ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। কর্নেল হাসানের সুযোগ্য নেতৃত্বে শুরুতেই নবনিযুক্ত ফ্যাকাল্টি মেম্বররা এক অসাধারণ ট্রেন্ড সেট করতে, অর্থাৎ ধারা প্রবর্তন করতে, সমর্থ হন। ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের ইতিহাসে এঁদের অবদান স্বর্ণাক্ষরে চিরদিন লেখা থাকবে। যে কোনো প্রতিষ্ঠানের, বিশেষ করে তা যদি হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রতিষ্ঠাতা প্রধান নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। তিনি শুরুতে ভালো বা মন্দ যে ট্রেন্ড সেট করবেন প্রতিষ্ঠানটিকে সেটাই অনেকদিন, এমনকি চিরদিন, বহন করতে হয়। কর্নেল হাসানের পর, কর্নেল রহমানসহ চারজন অত্যন্ত দক্ষ প্রিন্সিপাল আমার আগে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন। এসব গুণী ব্যক্তিদের পর আমার মতো একজন অনভিজ্ঞ তরুনের প্রিন্সিপালের দায়িত্ব গ্রহণ সত্যিকার অর্থেই বিরাট চ্যালেঞ্জ ছিলো। ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্টের কথা উল্লেখ করার দাবি রাখে। তা হলো, চতুর্থ শ্রেণীর সর্বকনিষ্ঠ কর্মচারি থেকে শুরু করে প্রথম শ্রেণীর সর্বজ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পর্যন্ত, সকলে ব্যক্তিগতভাবে এবং সমষ্টিগতভাবে কলেজের প্রতি প্রচন্ডভাবে অনুগত ছিলেন। আমি দেখেছি, প্রিন্সিপালের সকল আদেশ তাঁরা কীভাবে শিরোধার্য মনে করে সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সাথে পালন করতেন। কলেজটি প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত হবার কারণে বড় শহরের সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষতিকর প্রভাব ও ঝামেলা থেকে মুক্ত ছিলো। বেশিরভাগ ক্যাডেট আসতো গ্রামীণ অঞ্চল অথবা ছোটো মফস্বল শহর থেকে। ক্যাডেটদের এবং তাদের অভিভাবকদের মধ্যে একরকম গ্রামীণ সারল্য লক্ষ্য করে আমি মাঝেমাঝে হতবাক হয়ে যেতাম। যেমন, কোনো কোনো অভিভাবক প্রিন্সিপালের অফিসে ঢোকার সময় জুতা খুলে ঢুকতেন। আমি চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে হাত ধরে বারণ করার আগেই কাজটি করে ফেলতেন। ক্যাডেটদের অভিভাবকরা ছিলেন, শিক্ষিত-অশিক্ষিত এবং ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে, অত্যন্ত ভদ্র ও বিনয়ী। অপসন্দ হলেও কলেজ কর্তৃপক্ষের সকল আদেশ-উপদেশ হাসিমুখে পালন করতেন। তাঁরা বিশ্বাস করতেন, কলেজ কর্তৃপক্ষ যা কিছু করছে তা সবই তাঁদের সন্তানের মঙ্গলের জন্য। যে কারো জন্য ফার্স্ট টাইম প্রিন্সিপাল হিসেবে কাজ করার জন্য ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ একটি আদর্শ প্রতিষ্ঠন ছিলো। সে জন্য প্রিন্সিপাল হিসেবে ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজে প্রথম নিয়োগ পাবার জন্য আমি নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে করি। কলেজের সহকর্মীরা আমাকে অনেক ট্রিক্স অব দি ট্রেইড শিখতে সাহায্য করেছেন। যা বই পড়ে শেখা যায় না। ১৯৫০ দশকের শেষভাগে তৎকালীন পাকিস্তানে বৃটিশ পাবলিক স্কুলের আদলে ক্যাডেটট কলেজ স্থাপনের কাজ শুরু হয়। মূল উদ্দেশ্য ছিলো, ১১/১২ বছরের ছেলেদেরকে বোর্ডিং স্কুলের পরিবেশে রেখে ক্লাস সেভেন থেকে ক্লাস টুয়েলভ পর্যন্ত, অর্থাৎ এইচএসসি পযর্ন্ত শিক্ষাদান করা। সেইসাথে কিছু এলিমেন্টারি মিলিটারি ট্রইনিং দেওয়া, এবং নেতৃত্বের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক কিছু গুণাবলী বিকাশে সহায়তা করা। যাতে পাশ করে ছেলেরা সশস্ত্রবাহিনীতে কমিশন্ড র্যাং কে যোগদানের জন্য উপযুক্ত এবং উৎসাহিত হয়। সেদিক থেকে বিচার করলে বলা যায়, বাংলাদেশের ক্যাডেট কলেজগুলো সর্বাংশে না হলেও অনেকাংশে সফল হয়েছে, এখনও হচ্ছে বলে আমি মনে করি। ক্যাডেট কলেজ থেকে পাশ করে একটি ছেলে (বা বর্তমানে মেয়েও) যদি সশস্ত্রবাহিনীতে যোগদান করতে আগ্রহী না হয় তা হলেও ক্ষতি নেই বলে আমি মনে করি। অন্য যেকোনো পেশাতেই সে যোগদান করুক না কেনো, সেখানে সে ক্যাডেট কলেজে অর্জিত গুণাবলী দ্বারা অন্যদের তুলনায় অধিকতর অবদান রাখবে বলে আমার বিশ্বাস। যদি কেউ তা না পারে তবে সেটা ক্যাডেট কলেজের ব্যর্থতা নয়, তার ব্যক্তিগত ব্যর্থতা। সেজন্য অনেক কারণ থাকতে পারে। পৃথিবীর অনেক দেশেই স্কুল পর্যায়ের ছেলেমেয়েদের জন্য ক্যাডেট কলেজের মতো রাষ্ট্র পরিচালিত উন্নত মানের স্কুল আছে। যেগুলোকে সেন্টার্স অব এক্সেলেন্স বলা হয়ে থাকে। আমি নিজে চীনদেশে এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেখেছি। অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশেও এমন ব্যবস্থা আছে বলে জেনেছি। রাষ্ট্র এবং সমাজ পরিচালনায় নেতৃত্ব প্রদান করা ডাফার বা অকর্মণ্যদের কাজ নয়। এজন্য দরকার মেধাবী, দক্ষ এবং দেশেপ্রমিক কর্মীর। যারা সকল ক্ষেত্রে যোগ্য নেতৃত্ব প্রদান করবে। এসব সেন্টার্স অব এক্সেলেন্সে ছেলেমেয়েদের নেতৃত্বের প্রয়োজনীয় গুনাবলী, ইংরেজিতে যাকে বলা হয় কোয়ালিটিজ অব হেড, হার্ট এন্ড হ্যান্ড, শিক্ষা দেওয়া হয়। বলে রাখা ভালো, এখানে নেতৃত্ব বলতে শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্ব বুঝায় না। যেকোনো পেশায় উৎকর্ষ অর্জনের জন্য প্রয়োজন সুযোগ্য নেতৃত্বের। যদি একমাত্র মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলের সন্তানের জন্য এসব প্রতিষ্ঠানের দরজা সমানভাবে উন্মুক্ত রাখা হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় খরচে ক্যাডেট কলেজ পরিচালনাতে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। বাংলাদেশে কিছু লোক আছেন যাঁরা ক্যাডেট কলেজের কঠোর সমালোচনা করে থাকেন। এঁদের বেশিরভাগই বিত্তশালী ও শক্তিশালী, যাঁরা নিজেদের বিত্ত ও শক্তি দিয়ে বাংলাদেশে নিজ ইচ্ছামতো সব কিছু কিনতে পারেন বা করিয়ে নিতে পারেন। সুপারিশ বা অর্থের জোরে নিজ সন্তানের জন্য ভর্তির ব্যবস্থা করতে না পেরে এরা ক্যাডেট কলেজের সমালোচনা করেন। অন্য কিছু লোক আছেন যাঁরা নীতিগত প্রশ্ন তুলে ক্যাডেট কলেজের বিরোধিতা করেন। যাঁদের সমালোচনা, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অজ্ঞতাপ্রসূত। বহু বছর আগে, পাকিস্তান আমলে, একজন জ্ঞানী লোকের মুখে আমাদের একটি সামাজিক ব্যাধি সম্পর্কে একটা দামি কথা শুনেছিলাম। কথাটা বর্তমানে মনে হয় অধিকতর প্রযোজ্য। কথাটা হলো: Too many people talk too much on subjects they know too little. আমি ১৯৭৮ সনের ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৮০ সনের মে মাসের প্রথম ভাগ পর্যন্ত ঝিনাইদহে দায়িত্ব পালন করি। সময়টা অল্প হলেও এ সময়ে বেশ কিছু ঘটনা ঘটে যা পাঠকের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে। সব ঘটনা তো বলা যাবে না। পরবর্তীত তার মধ্য থেকে কয়েকটি মাত্র উল্লেখ করার ইচ্ছা রাখি।

Monday, November 11, 2013

ক্যাডেট কলেজের টুকরো স্মৃতি

২০০০ সনের জানুয়ারিতে অবসরে যাবার আগ পর্যন্ত তেত্রিশ বছর সেনাবাহিনীতে চাকুরি করেছি। এর মধ্যে প্রায় পাঁচ বছর ক্যাডেট কলেজে কাজ করেছি। চাকুরির একেবারে শুরুতে এক বছর পাকিস্তানের মিলিটারি কলেজ ঝেলামে জুনিয়র একাডেমিক ইন্সট্রাক্টর হিসেবে চাকুরি করেছি। পরে চাকুরির ১১/১২ বছরের মাথায় চার বছর একনাগারে ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ এবং ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করেছি। এ সময়ে অনেক কিছু দেখেছি, শুনেছি, শিখেছি, অনুভব করেছি, কিছুটা অভিজ্ঞতাও হয়েছে। তার কিছু কিছু অংশ পাঠকদের সাথে শেয়ার করার তাগিদ অনুভব করছি। গল্পচ্ছলে যখন আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবদের কাছে এসব দিনের কোনো ঘটনা বলি, তখন কেউ কেউ সেগুলো লিখে প্রকাশ করার জন্য অনুরোধ করেন। তাঁদের যুক্তি: এগুলো বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা। ভবিষ্যতের আভিভাবক, শিক্ষক, এমনকি ক্যাডেটরা পড়ে উপকৃত হতে পারে। সামরিক বাহিনীতে চাকুরি করার সময়ে রোজনামচা বা ডাইরি লেখার অভ্যাস বজায় রাখা নিরাপদ নয়, বিশেষ করে আমাদের মতো দেশে। স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারলেও স্বাধীনভাবে বলা বা লেখা খুব ঝুঁকিপূর্ণ। ১৯৭১ সনের পূর্বে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে চাকুরি করার সময়ে একজন বাংগালি অফিসারের জন্য কাজটি যারপরনাই বিপজ্জনক ছিলো। তাই চাকুরি জীবনের শুরু থেকে ডাইরি লেখার অভ্যাস গড়ে উঠেনি। যা কিছু লিখছি তার সবটাই স্মৃতি থেকে। দিন, তারিখ, সময়ের হেরফের হতে পারে। লোকজনের নাম ভুল হতে পারে। বোধগম্য কারণে কোনোকোনো লোকের সঠিক নাম আড়াল করে ছদ্মনাম ব্যবহার করতে হয়েছে।

আমি ইতিহাস লিখতে বসিনি। আমি লিখছি আমার নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা। সাধারণ বিবেচনায় এগুলো নৈমিত্তিক ঘটনা হলেও আমার কাছে, তখন মনে না হলেও, এখন মনে হয় এর মধ্যে কিছু অসাধারণ ঘটনা ছিলো। যদিও সব ঘটনার নায়ক বা ভিলেন আমি নিজে নই। কখনও কখনও পার্শ্ব চরিত্র হিসেবে ঘটনার স্বাক্ষী ছিলাম। তাই বর্ণনাতে ‘আমি’র আধিক্য থাকাটা স্বাভাবিক হলেও উদ্দেশ্য আত্মপ্রচার নয়। আশা করি পাঠক ক্ষমা করবেন। প্রয়োজনে যাতে সহজে উল্লেখ করা যায় সেজন্য বর্ণিত ঘটনাগুলোকে একটি করে শিরোনাম ও ক্রমিক নম্বর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।

মিলিটারি কলেজ ঝেলাম: পর্ব ১ বাংগালির উর্দু শেখা

১৯৬৭ সনের আগস্ট মাসের ২৭ তারিখে পি এম এ’র (পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি) ট্রেইনিং শেষ করে পাকিস্তান আর্মির এডুকেশন কোরে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে পার্মানেন্ট রেগুলার কমিশন লাভ করি। পাসিং আউটের পর ছুটি কাটিয়ে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি আমার জীবনের প্রথম ইউনিট মিলিটারি কলেজ ঝেলামে যোগদান করি। এখানে মিলিটারি কলেজ ঝেলাম সম্পর্কে কিছু বলাটা আশা করি অপ্রাসংগিক হবে না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বৃটিশ গভর্নমেন্টের পক্ষে অনেক ভারতীয় সৈনিক যুদ্ধ করে প্রাণ হারিয়েছিলো। প্রধানত: সেসব নিহত সৈনিকদের ছেলেদেরকে সরকারি খরচে লেখাপড়া শিখিয়ে সৈনিক বানাবার লক্ষ্যে বৃটিশ সরকার ১৯২২ সনে (পাকিস্তানের) ঝেলামে মুসলমানদের জন্য এবং (ভারতের) দেরাদুনে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য দু’টি পৃথক আবাসিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করে। নাম দেওয়া হয় কিং জর্জ রয়েল মিলিটারি স্কুল। ১৯২৫ সাল থেকে স্কুল দু’টোর কার্যক্রম শুরু হয়। সাধারণ বেসামরিক স্কুলের সিলেবাস অনুযায়ী ক্লাস এইট পর্যন্ত পাঠদানের পাশাপাশি এলিমেন্টারি মিলিটারি ট্রেইনিং দেবার ব্যবস্থা রাখা হয়। অত্যন্ত পারদর্শিতা অর্জনকারীকে কমিশন প্রদানের জন্য নির্বাচন করা হতো। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ঝেলামের স্কুলটির নাম পাল্টে মিলিটারি কলেজ ঝেলাম রাখা হয়। প্রচলিত বোর্ডিং স্কুলের মত এটিকে একটি ইন্টারমিডিয়েট কলেজে (দ্বাদশ শ্রণী পর্যন্ত) উন্নীত করা হয়। অনেকটা বর্তমানের ক্যাডেট কলেজের মত। পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর ইতিহাসে এই কলেজের প্রাক্তন ছাত্ররা আজ পর্যন্ত অতি গৌরবময় দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ ও শৌর্যবীর্যের স্বাক্ষর রেখে আসছে। পাকিস্তানের একাধিক আর্মি চীফ, নেভি চীফ ও এয়ার চীফ এই কলেজের প্রাক্তন ছাত্র। পাকিস্তানের বর্তমান (২০১৩) আর্মি চীফ জেনারেল আশফাক পারভেজ কায়ানী এই কলেজের একজন প্রাক্তন ছাত্র, যাকে ১৯৬৭ সনে ক্লাসরুমে পড়াবার সুযোগ আমার হয়েছিলো।

আমি যখন যোগদান করি তখন মিলিটারি কলেজ ঝেলামে ছাত্র, যাদেরকে সরকারিভাবে ক্যাডেট বলা হতো তাদের, সংখ্যা ছিলো কমবেশি ৩০০। হাউস (হোস্টেল) ছিলো ৪টি। এর মধ্যে শের শাহ নামক একটি হাউসে একেবারে নতুন আসা ক্লাস এইটের ক্যাডেটদের রাখার ব্যবস্থা ছিলো। অন্য তিনটি হাউসে বাকি ক্লাসের ক্যাডেটদের মোটামোটি সমানভাবে ভাগ করে রাখা হতো। অমি যখন ছিলাম তখন এই প্রতিষ্ঠানে বাংগালি আর কোনো অফিসার বা কর্মচারি ছিলো না। ক্যাডেট ছিলো মাত্র চারজন। এর মধ্যে দু’জন আপন ভাই নিচের ক্লাসে পড়তো, যাদের বাবা ছিলেন সিলেটি, মা ইউরোপিয়ান। দু’জনের কেউ বাংলা এক শব্দও বলতে পারতো না। বাকি দু’জন পড়তো ক্লাস টুয়েলভে। ভালো বাংলা বলতে পারতো। ওদের বাবারা পাকিস্তান আর্মিতে অফিসার ছিলেন। সুযোগ পেলে কখনও কখনও লুকিয়ে ওদের সাথে বাংলায় দু’য়েক কথা বলতাম। যথাসময়ে ওরা দু’জন আর্মিতে কমিশন লাভ করেছিলো। বাংলাদেশে এসে অবসরে যাবার আগে একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অন্যজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল হতে পেরেছিলো। যাহোক, আমার দায়িত্ব ছিলো ক্লাসরুমে আমার নিজের সাবজেক্ট কেমিস্ট্রি এবং সাধারণ বিজ্ঞান পড়ানো। সেইসাথে শের শাহ হাউসের এসিস্ট্যান্ট হাউস টিউটরের দায়িত্ব পালন করা। এছাড়া ফটোগ্রাফি ক্লাব, মিউজিক ক্লাব এবং ফুটবল আর সাঁতারের ভারপ্রপ্ত অফিসার করা হলো আমাকে। হাইকিং ক্লাবের সাথেও আমাকে যুক্ত করা হলো। মজার কথা হলো, এসবের মধ্যে শুধু ফটোগ্রাফি ও সাঁতার সম্বন্ধে আমার কিছু ধারণা ছিলো। তারপরও মিউজিক আর ফুটবলের দায়িত্ব এড়ানো গেলো না। পাকিস্তানিদের বিশ্বাস ছিলো, তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের সকল তরুন জন্মগতভাবে গান আর ফুটবলের বিশেষজ্ঞ হয়ে থাকে ! সকল দায়িত্ব পালনে দেহমন উজাড় করে দিয়ে লেগে গেলাম, যেমনটা সকল সেকেন্ড লেফটেন্যান্টরা করে থাকে।

প্রথমেই হোচট খেতে হলো ভাষা নিয়ে। ক্লাসরুমে পড়ানোসহ ক্যাডেটদের সাথে, এবং অফিসারদের সাথে সকল ফর্মাল কথাবার্তা ইংরেজিতে করতে হয়। অনানুষ্ঠানিক দু’য়েক কথা উর্দুতেও বলা যায়। বাংলা সম্পূর্ণ অচল। বাংলা বলাটা ছিলো গুনায়ে কবিরা। ভুলে দু’য়েক কথা মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেলে আসেপাশের সবাই ‘কেয়া বোলা, কেয়া বোলা তুমনে’ বলে হৈহৈ করে উঠতো। আমার ইংরেজি উচ্চারণ পদ্মাপাড়ের উচ্চাড়ণ। বিশেষ করে ইংরেজি অক্ষর ‘জে’ (এবং জিওমেট্রির ‘জি’) এবং ‘জেড’ এর উচ্চারণ নিয়ে মহাবিপদে পড়েছিলাম। বাংলা ভাষায় তফাৎ না থকলেও উর্দু ভাষায় এ দু’টোর উচ্চারণগত পার্থক্যের কারণে অর্থের পার্থক্য ইংরেজির মতোই প্রবল। পাকিস্তানি এক সহকর্মী যিনি ইংরেজি ভাষার শিক্ষক ছিলেন বুদ্ধি ও অভয় দিয়ে বললেন, ছোট একটি রেডিও কিনে নাও। বেশি করে রেডিওতে বিবিসি শোন। টেইপ রেকর্ডার কিনে নিজের কথা বারবার বাজিয়ে শোন। উচ্চারণে কোথায় ভুল হচ্ছে লক্ষ্য করো। তাহলেই দেখবে ইংরেজি বলাটা রপ্ত হয়ে যাবে। তাছাড়া, তোমার লেখা পড়ে মনে হয়, ইংরেজি ভাষাটা তো তুমি ভালোই জানো। সমস্যা হবে না। কথা ঠিক। অল্প দিনের মধ্যে ওস্তাদের কথামত সমস্যা বহুলাংশে কেটে গেলো।

মহা সমস্যা হলো উর্দু নিয়ে। সৈনিকদের সাথে, বেয়ারা-বাবুর্চির সাথে, বাজারে দোকানদারের সাথে, রাস্তায় টাংগাওয়ালার সাথে উর্দু অথবা পাঞ্জাবি ছাড়া উপায় নাই। পাঞ্জাবি শেখা বাদ দিয়ে উর্দু শেখার উদ্যোগ নিলাম। এর অন্য আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিলো। যেসব তরুণ রেগুলার কমিশন্ড অফিসারের মেট্রিক পর্যায়ে উর্দু ভাষা ছিলো না, তাদের জন্য চাকুরির প্রথম দু’বছরের মধ্যে আর্মি পরিচালিত সমমানের পরীক্ষায় পাশ করা জরুরি ছিলো। যতদিন পাশ না করতো ততদিন চাকুরি স্থায়ী করা হতো না। আর্মির পরীক্ষায় লিখিত এবং মৌখিক আলাদা আলাদা দুই পেপার ছিলো। টেনেটুনে লিখিত পেপারে পাশ করলেও ৯৫% পরীক্ষার্থী, তা সে বাংগালি, পাঞ্জাবি, পাঠান যে জাতিরই হোক না কেনো, মৌখিক পেপারে ফেল করতো ! বলা হতো, পরীক্ষা নেয়ার ফী হিসেবে অনেক বেশি টাকা আয় করার জন্য পরীক্ষকরা এমনটা করতেন। যাহোক, আমি সর্বশক্তি দিয়ে উর্দু বলা, পড়া ও লেখা শেখার চেষ্টা শুরু করে দিলাম। কারণ, মেট্রিকে আমার উর্দু পড়া হয়নি, তার বদলে পড়েছিলাম আরবি। এতে একটা সুবিধা হয়েছিলো। উর্দুর অক্ষরগুলো নতুন করে চিনতে হয়নি। তবে বাধার হিমালয় ছিলো অন্যখানে। বাজারি উর্দু বলা খুবই সহজ। ইংরেজি, হিন্দি মিলিয়ে গ্রামারের পরোয়া না করে জগাখিচুরি কিছু একটা বলে ফেললেই হলো। কেউ মাইন্ড করে না। কিন্তু কেতাবি উর্দু বলা যে কতো কঠিন, তা একমাত্র ভুক্তভোগী জানে। একদিকে বড় কাফ-ছোট কাফ, আইন-গাইন, জ্বীম-জাল-জে-জোয়া, বড় হে-ছোট হে, তে-তোয়া ইত্যাদি বর্ণসমূহের মধ্যে উচ্চারণগত সূক্ষ পার্থক্য আয়ত্ব করার চাইতে পাথর চিবিয়ে খাওয়া সহজ। তার পরেও কথা আছে। উচ্চারণ হয়তবা ঠিক হলো, ব্যাকরণ ? সেটা তো প্রায় কুকুরের লেজ সোজা করার মতো কঠিন। মনে আছে, একবার ক্যাডেটদের নিয়ে বাইরে কোথাও গিয়েছিলাম। ফেরত আসার সময় বাস এলো। আমি ছেলেদের লক্ষ্য করে যেইনা বলেছি, চলো, বাস আগিয়া, অমনি সবাই এতো জোরে অট্টহাসি করে উঠলো যে আমি মহাআহাম্মক বনে গেলাম। আমার আপরাধ, বলা উচিত ছিলো, বাস আগেয়ি। যার কারণ আমি আজও বুঝি না। বাস তো প্রাণী নয় যে এর জেন্ডার খুঁজতে হবে ! কর্তার টেন্স, জেন্ডার, নাম্বার ভেদে বাক্যের ভিতর ক্রিয়াপদের যে রূপান্তর হয়, যাকে ইংরেজিতে কনজুগেশন বলে, তার হদিস রাখা, মানুষ তো দূরের কথা, দেবতার পক্ষেও হয়তো সম্ভব নয় ! এর পর রয়েছে ভোক্যাব্যুলারি অর্থাৎ নতুন নতুন শব্দ শেখার সমস্যা। ঝেলাম বাজারে মাগুর মাছ দেখে খাবার শখ জাগলো। মেসে এসে বাবুর্চিকে বললাম মাগুর মাছ এনে রান্না করতে। বুড়ো পাঞ্জাবি বাবুর্চি লাল খান চোখ কপালে তুলে বললো, সাব, হাম মাগর মাছ নেই খাতে। উয়োহ তো হারাম হায়। বাংগাল মে তোমলোগ খাতেহো ? পরদিন সকালে অফিসে গিয়ে এক পাঞ্জাবি কলিগের কাছ থেকে বুড়োর অবাক হবার কারণ বুঝলাম। উর্দুতে মাগর মাছ মানে কুমির ! সে সময় ঢাকা শিক্ষা বোর্ড মহাত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়। তারা বাংগালি আর্মি অফিসারদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা হিসেবে শুধুমাত্র উর্দু ভাষার মেট্রিক পরীক্ষা নেবার ব্যবস্থা রেখেছিলো। কেবলমাত্র লিখিত পরীক্ষা যাতে বেশিরভাগ প্রশ্নের উত্তর বাংলায় লিখে সহজে পাশ করা যেতো। অবশেষে আমি আরও অনেক বংগসন্তানের মতো ঢাকায় এসে সেই পরীক্ষা দিয়ে পাশ করে নিজের মান রক্ষা করি।

-------------
মিলিটারি কলেজ ঝেলাম: পর্ব ২
লেফটেন্যান্ট ফিশ!

আগেই বলেছি, মিলিটারি কলেজে জয়েন করার পরপরই আমাকে ক্লাসরুমে নিজের সাবজেক্ট পড়ানো ছাড়া ফটোগ্রাফি, মিউজিক, ফুটবল ও সুইমিং ক্লাবের অফিসার-ইন-চার্জ (ও আই সি) নিয়োগ দেওয়া হয়। ছাত্রজীবনে ছবি তোলার শখ ছিলো। তখন ছিলো সাদাকালো ছবির জমানা। ফিল্ম ডেভেলপ ও প্রিন্ট করা সম্বন্ধে কিছু ধারণা ছিলো। কলেজ লাইব্রেরিতে ফটোগ্রাফির উপর ভালোভালো বই ছিলো। সেসব পড়ে মোটামুটি কাজ চালিয়ে নিলাম। সাঁতার ভালোই জানতাম। সেকথায় পরে আসছি। মিউজিক ক্লাবে বেশিরভাগ ছেলে ছিলো কলেজ ব্যান্ডের সদস্য। যার জন্য আর্মি থেকে আসা ব্যান্ড ইন্সট্রাক্টর ছিলো। এছাড়া বাহির থেকে একজন সিভিলিয়ান গানের মাস্টার সপ্তাহে একদিন এসে ছেলেদের সা-রে-গা-মা শেখাতেন। এই বৃদ্ধ ভদ্রলোককে আমি কখনও হারমনিয়াম আর ঢোল ছাড়া অন্য কিছু বাজাতে দেখিনি। আর্মি স্কুল অব ফিজিক্যাল ট্রেইনিং এন্ড স্পোর্টস থেকে পাশ করে আসা হাবিলদাররা ফুটবলসহ অন্যান্য গেইম ও সাঁতার শেখাতো। আমার কাজ ছিলো এসবের সমন্বয় ও তত্বাবধান করা।

এবার আসি সাঁতারের কথায়। আমার বয়স যখন সাত কি আট বছর তখন মামা বাড়ি গেলে আমার ছোটো মামা আমাকে একটি বিশেষ সাঁতারের কৌশল শেখান, যা মামা নিজেও খুব ভালো জানতেন। দুই হাত পিঠের পেছনে নিয়ে কব্জি বরাবর একটি ছোটো রশি বা গামছা দিয়ে একসাথে বেঁধে দিতেন। তারপর দুই পা’র গোড়ালি বরাবর একসাথে গামছা দিয়ে বেঁধে আমাকে দু’তিনজন মিলে ঘাড়ে করে নিয়ে পুকুরে ছেড়ে দিতেন। আমি বহাল তবিয়তে ধীরেধীরে সাঁতার দিয়ে দূরত্ব অতিক্রম করতাম। কখনও চিৎসাঁতার, কখনও বুকসাঁতার দিতাম। হাত-পা বাধা অবস্থায় মাঝেমাঝে চিৎ হয়ে বুকের উপর চারখানা থান ইট নিয়ে সাঁতার দিয়ে বন্ধুদের চমৎকৃত করে দিতাম। ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীন সময় পর্যন্ত এই বিশেষ সাঁতাররে চর্চাটা অব্যাহত রেখেছিলাম।

মিলিটারি কলেজে আমার সহকর্মী বেশ ক’জন অবাংগালি অফিসার ছিলেন যাঁরা সাঁতার জানতেন না, পানিকে যমের মতো ভয় করতেন। একদিন কথাচ্ছলে তাঁদেরকে সাহস যোগাবার জন্য বললাম, সাঁতরানো কোনো কঠিন কাজ নয়। আমাকে হাত-পা বেঁধে পানিতে ছেড়ে দিলেও সাঁতরাতে পারি। কথাটা ওরা মোটেও বিশ্বাস করলেন না। বললেন, জানি তোমরা ইস্ট পাকিস্তানিরা পানির দেশের মানুষ। সবাইকে সাঁতার জানতে হয়। তাই বলে অতটা বাহাদুরি করো না। কথাটা আমি পরে ভুলে গেলেও ওরা ভুলেননি। এর ক’দিন পর কিছু ক্যাডেট নিয়ে আমরা মংলা ড্যামে বেড়াতে গেলাম। আমাকে অবাক করে দিয়ে সেই সহকর্মীরা দু’টুকরা রশি বের করে বললো, এবার তোমার কথা রাখো। আমরা তোমার দু’হাত পেছনে বেঁধে দেবো, সেই সাথে দু’পা গোড়ালিতে একসাথে বেঁধে দিয়ে লেকের পানিতে ছেড়ে দেবো। ভয় পেয়ো না, আটজন দক্ষ সাঁতারু হাবিলদার এবং ক্যাডেট তোমাকে ঘিরে রাখবে, তুমি যাতে ডুবে না মরো। তোমাকে মেরে আমরা কোর্টমার্শালে যেতে চাই না। বাংগালি পৌরুষের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছোড়া হয়েছে ! বললাম, কবুল ! তা-ই করো। ভয় নেই, আমি ইনশাল্লাহ মরবো না। তোমরা বিপদে পড়বে না। কথামতো প্রায় চল্লিশ মিনিট সাঁতরালাম, তার মধ্যে কিছুক্ষণ বুকের উপর চারখানা থান ইট নিয়ে। যখন আমাকে পানি থেকে টেনে তোলা হলো, তখন সে কী আনন্দ আর চিৎকার। রাতারাতি হিরো হয়ে গেলাম। বিশেষ করে ক্যাডেটদের কাছে।

ঝেলাম এবং নিকটস্থ খাড়িয়া ক্যান্টনমেন্টে খবরটা বাতাসের বেগে ছড়িয়ে গেলো। এরিয়া কমান্ডার শুনতে পেয়ে ভাবলেন, তাঁর এরিয়াতে বহু অবাংগালি অফিসার আছেন যাঁরা সাঁতার জানেন না। পানিকে যমের মতো ভয় পান। কিছুদিন আগে এক্সারসাইজের সময় প্রায় হাটু পানিতে ডুবে একজন ইনফ্যান্ট্রির ক্যাপ্টেইন মারা যান। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, অসাতারুদের ভয় ভাংগানোর জন্য, পরবর্তী রবিবার (সাপ্তাহিক ছুটির দিন) বিকেলে মিলিটারি কলেজের সুইমিং পুলে লে: আশরাফের সুইমিং প্রদর্শণীর ব্যবস্থা কর হোক। সকল অফিসার সস্ত্রীক আমন্ত্রিত। বাচ্চারা বিশেষভাবে আমন্ত্রিত। নির্ধারিত দিনে সুইমিং পুলে মহাআয়োজন। চর্তুদিকে সামিয়ানা টাংগানো হয়েছে। সকল বয়সের অফিসার, তাঁদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যাগণ, কলেজের ক্যাডেটগণ, স্টাফ, সব মিলিয়ে অনেক লোকের সমাগম। কলেজের ব্যান্ড বাদ্য বাজাচ্ছে। কাবাব, স্যান্ডউইচ, সামুসাসহ নানা ধরনের মুখরোচক স্ন্যাকস। সাথে চা, কফি, সোডা। সেই সাথে চলছে মাইকের ঘোষণা। নির্ধারিত সময়ে চারজন তাগড়া হাবিলদার, যেমন করে লাশ কাঁধে করে বহন করে তেমন করে, আমাকে কাঁধে বয়ে নিয়ে আসলো। আমার পরনে শুধু একটি জাংগিয়া, যাকে ভদ্র ভাষায় বলে সুইমিং কস্টিউম। মনে হচ্ছিলো আমি যেনো সার্কাসের কোনো জন্তু ! আমাকে দেখামাত্র উপস্থিত সবাই, বিশেষ করে মহিলা ও বাচ্চারা উত্তেজনায়, আনন্দে এবং আতংকে চিৎকার হাততালি দিতেদিতে দাঁড়িয়ে গেলো। আমি নিজেও হাবিলদারদের কাঁধে শুয়ে কেমন যেনো শিহরণ অনুভব করছিলাম। হাবিলদাররা ধীরেধীরে স্লো মার্চ করে পুলরে পারে এসে আমাকে ঝুপ করে পানিতে ফেলে দিলো। অন্য সময় সাথেসাথে পানি থেকে মাথা বের করে নি:শ্বাস নেই, সাঁতার করি। এবার একটু সাসপেন্স করার জন্য বেশ কিছুক্ষণ পানির নিচে মাথা ডুবিয়ে রাখলাম। পরে শুনেছি, যতক্ষণ আমি ডুব মেরে ছিলাম ততক্ষণ উপস্থিত দশর্করা সবাই ভয়ে, আতংকে নির্বাক হয়েছলো। তারপর যখন মাথা বের করলাম তখন কী গগনবিদারী চিৎকার। সাবাস, আশরাফ। সাবাস, বাংগালি। কেউ একজন বলে উঠলেন, ইয়ে তো ইনসান নেহি হায়, মছলি হায়। ব্যাস, সেদিন থেকে আমার নিকনেইম হয়ে গেলো লেফটেন্যান্ট ফিশ ! ওভারনাইট হিরো হয়ে গেলাম। শনিবার সন্ধ্যায় অফিসার্স ক্লাবে গেলে শুনতে পেতাম আমাকে দেখিয়ে লোকজন বলাবলি করছে, দেয়ার গো’জ লে: ফিশ।

--------------- মিলিটারি কলেজ ঝেলাম: পর্ব ৩
শাসন করা তারই সাজে ---

“ফায়ার ! ফায়ার ! আগ লাগি হ্যায় ! সব বাহার আ-যাও!” পড়াশুনা করে, রেকর্ডপ্লেয়ারে গান শুনে সবে ঘুমিয়েছি। রাত্রি দু’টা-তিনটা হবে। চারদিক থেকে আসা হঠাৎ এমন তীব্র চিৎকারে ঘুম ভেংগে গেলো। অফিসার মেসে নিজের রুমে একা ছিলাম। ( কখনও একরুমে দু’জন সিংগল ফিসারকেও থাকতে হতো।) ধরফরিয়ে উঠে কাপড় পাল্টে দরজা খুলে বাইরে এলাম। পূব-পশ্চিমে টানা কলেজের মেইন রোড ধরে অনেক লোক, যার মধ্যে কোনো ক্যাডেট ছিলো না, পশ্চিম দিকে ছুটছে। সবার মুখে এক চিৎকার, আগ লাগি হ্যায়। পশ্চিম দিকে তাকিয়ে দেখলাম আকাশে আগুনের সুউচ্চ লেলিহান শিখা। ওদিকে ক্যাডেটদের আবাস হিসেবে বাবর হাউস এবং গজনবি হাউস নামে দু’টি হাউস রয়েছে। বলা তো যায় না ! স্লিপার পায়েই ছুটলাম পশ্চিম দিকে। পথে কলেজের কম্যানড্যান্ট কর্নেল মর্তুজাকে (লে: কর্নেল মর্তুজা হোসেন, এ ই সি) খুড়িয়েখুড়িয়ে একই দিকে যাচ্ছেন। পড়নে স্লিপিং স্যুট (বৃটিশ এটিকেট অনুযায়ী স্লিপিং স্যুট পড়ে বেডরুমের বাউরে আসা মহা গুনাহের কাজ !)। দেখামাত্র আমি ফৌজি তরিকায় ‘উইশ’ করলাম, অর্থাৎ “স্লামালেকুম, স্যার” বলে চিৎকার করে উঠলাম। তিনি আতংকিত কন্ঠে বললেন, “ভাই, কওন হো তোম ? ম্যায় জলদি মে আয়নাক (চশমা) ভুল গেয়া। তোম মুঝে যারা সাথ লে চলো।” ইতোমধ্যে কেউ একজন দৌড়ে এসে যা বললো তার সারাংশ হলো: কলেজের পশ্চিম প্রান্তে সীমানা প্রাচীর ঘেঁসে যে গো-খামার রয়েছে সেখানকার খরের গাদায় কে বা কারা আগুন লাগিয়েছে। কম্যানড্যান্টকে নিয়ে আস্তে আস্তে সেখানে গিয়ে দেখলাম আগুন ততক্ষণে নিভে গেছে। কিছু লোক ভীড় করে আছে। গেইটের বাইরে ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি এসে গেছে। অন্য সময় লাইটস আউটের পর সব হাউসে দু’য়েকজন ক্যাডেটকে টয়লেটে যাওয়াআসা করতে দেখা গেলেও সেদিন রাতে একজন ক্যাডেটকেও রুমের বাইরে দেখা গেলো না। হাউসগুলো মনে হচ্ছিলো জনমানবহীন ভূতের বাড়ির মতো।

ক্যাডেট কলেজের মতো মিলিটারি কলেজেও সপ্তাহে একদিন ক্লাস শুরুর আগে এসেম্বলি বা সমাবেশ হতো। তাতে সকল ক্যাডেট ও শিক্ষককে উপস্থিত থাকতে হতো। অগ্নিকান্ডের পরের দিন নরমাল এসেম্বলি ছিলো না, বিশেষ এসেম্বলি ডাকা হলো। সবার মুখ গম্ভীর। চতুর্দিকে থমথমে ভাব। কী জানি, কম্যানড্যান্ট তাঁর বক্তৃতায় অপরাধীদের জন্য কী কঠোর শাস্তি ঘোষণা করেন। যথারীতি কুর’আন থেকে আবৃত্তির পর কম্যানড্যান্ট মঞ্চে উঠলেন। ধীর-স্থিরভাবে চারদিকে একবার চোখ ফিরিয়ে নিলেন। চেহারা বা কন্ঠে রাগ বা উত্তেজনার লেশমাত্র নেই। তারপর বললেন: My dear boys, I understand last night some of you wanted to cut a joke with me. I do appreciate your sense of humor. It is only the intelligent people who can cut good jokes. But, my boys, I have a request to make. Before you cut a joke you should also consider the age of the person concerned. For an old man like me a joke like the one you had last night might be too dangerous to bear with. Next time when you cut such a joke, please keep my age in mind. Thank you. College Captain, carry on, please.এসেম্বলি শেষ। ক্যাডেটরা ক্লাসে চলে গেলো। আমরা ইয়ং আফিসাররা খুব হতাশ হলাম। ক্যাডেট কলেজে সাধারণত ক্লাস ইলেভেনের ছেলেরা, যারা প্রায়শ ইয়ং ইন্সট্রাক্টরদের কর্তৃত্ত মানতে চায় না, বড় ধরনের কান্ড ঘটিয়ে থাকে। এরা কোনো কারণে বড় শাস্তি পেলে ইয়ং ইন্সট্রাক্টররা মনেমনে পুলকিত হয়। যাহোক, আমরাও হতাশ হয়ে যারযার কাজে ফিরে গেলাম।

কম্যানড্যান্ট কর্নেল মর্তুজা ব্যক্তি জীবনে চিরকুমার ছিলেন। প্রথম যৌবনে প্রেমে ব্যর্থ হবার পরিণতি। ছেলেমেয়ে একদম পসন্দ করতেন না বলে রটনা ছিলো। যা সঠিক ছিলো না। যাহোক, সপ্তাহখানেক পরের কথা। ক্লাস ইলেভেনের চারপাঁচজন ক্যাডেট নিয়মানুযায়ী এডজুট্যান্টের অফিসে গিয়ে কম্যানড্যান্টের সাক্ষাৎকার চাইলো। এডজুট্যান্ট কারণ জানতে চাইলেন। ছেলেরা বললো, আপনাকে কারণ বলা যাবে না। যা বলার সরাসরি কম্যানড্যান্টকে বলবো। কম্যানড্যান্ট ছেলেদেরকে তাঁর অফিসে আসার অনুমতি দিলেন। সাথে এডজুট্যান্টকে থাকতে বললেন। বলা তো যায় না, পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়। ছেলেগুলো কম্যানড্যান্টের অফিসের দরজায় গিয়ে ‘উইশ’ করে হুড়মুড় করে, কেউ চেয়ারের তল দিয়ে, কেউ টেবিলের তল দিয়ে কম্যানড্যান্টের পায়ের উপর হুমরি খেয়ে পড়লো। সবাই উচ্চস্বরে কাঁদতেকাঁদতে বললো: স্যার, উই ডিড ইট। উই পুট দি হে স্ট্যাক অন ফায়ার। প্লিজ ফরগিভ আস। উই আর রিয়ালি ভেরি সরি ফর দি ট্রাবল উই গেইভ ইউ। উই শ্যাল নেভার ডু ইট এগেইন। প্লিজ ফরগিভ আস দিস টাইম। কম্যানড্যান্ট চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সবাইকে বুকে জড়িয়ে ধরে নিজেও কাঁদতে লাগলেন। হাপুস নয়নে সবার সে কি কান্না ! কিছুক্ষণ কান্নাকাটির পর কম্যানড্যান্ট কিছুটা স্থির হয়ে বললেন: বয়েজ, ইউ আর মাই চিল্ড্রেন। আই ফরগেইভ ইউ দি ডে আই এড্রেসড ইউ। আই এম হ্যাপি টু সি দ্যাট ইউ আর রিপেন্ট্যান্ট। দ্যাট’স লাইক গুড বয়েজ। আই এম প্রাউড অব ইউ। কাম অন মাই সান্স, নাউ স্মাইল ! ছেলেরা তাঁর পা ছুঁয়ে সালাম করে চোখে পানি, ঠোটে হাসি নিয়ে বেরিয়ে আসলো। তারপর কর্নেল মর্তুজা যতদিন ছিলেন ততদিন মিলিটারি কলেজে ছেলেরা তেমন কোনো বড় ঘটনা ঘটিয়েছে বলে শোনা যায়নি।


সেদিনের সে ঘটনা আমার জীবনে গভীর রেখাপাত করেছিলো। সারা জীবনের জন্য আমাকে যেনো চোখে আংগুল দিয়ে শেখালো: “শাসন করা তারই সাজে সোহাগ করে যে গো।” -------------
মিলিটারি কলেজ ঝেলাম: পর্ব ৪
আমার গুরু কর্নেল মর্তুজা

আগেই বলেছি, মিলিটারি কলেজে জয়েন করার সাথেসাথে আমাকে প্রশাসনিক কাজের জন্য শের শাহ হাউসে এসিট্যান্ট হাউস টিউটর নিয়োগ করা হলো। শের শাহ হাউসের হাউস মাস্টার ছিলেন মি: ফজলুল হক হায়দ্রি। সিনিয়র সিভিলিয়ান ইন্সট্রাক্টরদের মধ্যে অন্যতম একজন। বাচ্চ্দের জন্য চমৎকার একজন ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন। সমবয়সী হবার কারণে কম্যানড্যান্ট কর্নেল মর্তুজার ব্যক্তিগত বন্ধু ছিলেন। প্রশাসনিক অনেক সিদ্ধান্ত নিতে কম্যানড্যান্টের উপর প্রভাব বিস্তার করতেন। পরে বুঝতে পেরেছিলাম হায়দ্রী সাহেবের একান্ত আগ্রহে আমাকে ওনার অধীনে শের শাহ হাউসে এসিট্যান্ট হাউস টিউটর নিয়োগ করা হয়েছিলো। এর আগে আর কোনো আর্মি অফিসারকে ওনার আন্ডারে নিয়োগ করা সম্ভব হয়নি। কারণ, হায়দ্রী সাহেবের অফিসিয়াল স্ট্যাটাস ছিলো ক্লাস টু গেজেটেড অফিসার। একজন আর্মি অফিসারকে ক্লাস ওয়ান গেজেটেড অফিসার হবার কারণে হায়দ্রী সাহেবের অধীনে নিয়োগ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। হায়দ্রী সাহেব আমার জুনিয়রিটির সুযোগ নিয়েছেন। অল্প দিনের মধ্যে বিষয়টি বুঝতে পারলাম। একজন বন্ধু ভাবাপন্ন সিনিয়র পাঞ্জাবি কলিগের সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বললাম। তিনি বললেন, কাজটি অবশ্যই বেআইনি হয়েছে। তোমার প্রতি অবিচার করা হয়েছে। আমি তাঁকে প্রশ্ন করলাম, কেনো তাঁরা কম্যানড্যান্টকে একাজ থেকে বিরত থাকতে বললেন না। জবাবে তিনি যা বললেন তা আমার সারা জীবনের জন্য শিক্ষা হয়ে আছে। তনি বলেছিলেন, প্রথমত: কাজটি করার আগে কম্যানড্যান্ট কোনো আর্মি অফিসারের পরামর্শ চাননি। দ্বিতীয়ত: আর্মিতে আগ বাড়িয়ে কেউ কারও জন্য কথা বলে না। যার কথা তাকেই বলতে হয়। আমরা ভাবলাম, তুমি যদি ব্যাপারটা মেনে নেও তাহলে আমরা বলার কে ? আর, তুমি যদি না মানো তাহলে প্রচলিত আইনই তোমাকে বলে দিবে তোমার কী করতে হবে।

ক’দিন ভেবেচিন্তে অবশেষে একদিন হায়দ্রী সাহেবকে বিনয়ের সাথে বললাম যে, আমার পক্ষে আর তাঁর হাউসে কাজ করা সম্ভব নয়। তিনি যেনো বিকল্প ব্যবস্থা করেন। বিষয়টি ব্যাখ্যা করে আরও বললাম, বয়স্ক লোক হিসেবে আপনাকে আমি সব সময় সম্মান করি। এটি একটি নীতির প্রশ্ন। দয়া করে ব্যক্তিগতভাবে নিবেন না। হায়দ্রী সাহেব কোনো জবাব না দিয়ে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন।

পরদিন টী-ব্রেকের সময় স্টাফ রুমে সকল আর্মি এবং সিভিলিয়ান অফিসারের সামনে হায়দ্রী সাহেব আমাকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার করে বলে উঠলেন, লে: আশরাফ, গতকাল থেকে কেনো আপনি হাউসে ডিউটি থেকে অনুপস্থিত থাকছেন ? এটা খুব অন্যায় কাজ। আপনার বুঝা উচিৎ। আমি বুঝলাম, হায়দ্রী সাহেব এতো লোকের সামনে আমাকে উল্টাপাল্টা কিছু বলার জন্য প্ররোচিত করছেন। রাগের মাথায় মুখ ফসকে অন্যায় কিছু যদি বলে ফেলি তাহলে আমার কোর্ট মার্শাল করতে সাক্ষীর অভাব হবে না। আমি ধীরস্থিরভাবে জবাব দিলাম, আমার যা বলার তা গতকাল আপনাকে বলেছি। আমার আর কিছু বলার নেই। তুমি কম্যানড্যান্টের আদেশ অমান্য করছো, হায়দ্রী সাহেব এবার গর্জে উলেন। আমি বললাম, বিষয়টি তা’হলে আপনি কম্যানড্যান্টকে বলুন। তিনি যা করার করবেন।

এর পরদিন, যা ভেবেছিলাম, কম্যানড্যান্ট আমাকে তাঁর অফিসে ডেকে পাঠালেন। অফিসে ঢুকে স্যাল্যুট করতে না করতেই শুরু হলো বজ্রের গর্জন। ইংরেজি, উর্দু মিলিয়ে আর্মিতে যত গালি ও মন্দ কথা আছে তা প্রবল বেগে আমার উপর বর্ষিত হতে লাগলো। যার বেশিরভাগ ছাপার অযোগ্য। ‘শান’ পজিশনে দাঁড়িয়ে থেকে তাতে অবগাহন করা ছাড়া আমার তখন কিছু করার ছিলো না। তিনি বললেন: তুমি লে: আশরাফ ‘টিট অব এ সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট’ হয়ে আমার আদেশ অমান্য করার ‘অডাসিটি’ কোথায় পেলে ? প্রথম সুযোগেই বিড়াল মারার জন্য আমি খুব আস্তে করে বললাম: স্যার, আপনার আদেশটি এমপিএমএল (ম্যানুয়াল অব পাকিস্তান মিলিটারি ল’) অনুযায়ী বৈধ ছিলো না। তাই মানা সম্ভব নয়। একজন ক্লাস ওয়ান অফিসার হয়ে আমার পক্ষে একজন ক্লাস টু অফিসারের অধীনে কাজ করা সম্ভব নয়। কাজ হলো না। বিড়াল তো মরলোই না, বরং তিনি আরও রেগে গিয়ে বললেন: হতে পারে মি: হায়দ্রী একজন ক্লাস টু অফিসার। কিন্তু আমি আমার ওথরিটি তাঁকে ডেলিগেইট করেছি। তুমি তার হুকুম মানতে বাধ্য। আমি কোনো প্রকার আবেগ না দেখিয়ে বললাম: আপনি আপনার ওথরিটি একজন হাবিলদারের কাছে ডেলিগেইট করতে পারেন। তাইবলে একজন হাবিলদারের কম্যান্ড আমি মানতে পারি না। পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি আমাকে এমন শিক্ষা দেয়নি। বরং আমাকে বলেছে, কমিশনের প্রতীক হিসেবে তোমার কাঁধে যে ‘পিপ’ দেওয়া হয়েছে, সেটা দেশের মহামান্য প্রসিডেন্ট দিয়েছেন। এটা দেশ ও জাতির গৌরব ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। প্রাণ দিয়ে হলেও এর সম্মান রক্ষা করা তোমার পবিত্র কর্তব্য। এ পর্যন্ত শুনে কম্যানড্যান্ট আরও ক্ষেপে গেলেন। যেনো আগুনে ঘি পড়লো। চিৎকার করে বললেন: ইউ ডাকা ইউনিভার্সিটি চ্যাপস, ইউ ওনলি নো হাউ টু আরগু। বছরের পর বছর তোমার মতো রটেন মাল বের করে ঢাকা ইউনিভার্সিটি দেশের সর্বনাশ করছে। তোমরা শুধু শিখেছো কিভাবে গন্ডগোল পাকাতে হয়। আমি বিনয়ের সাথে বললাম: প্লিজ ক্রিটিসাইজ মি ইফ আই এম রং। বাট, স্যার, প্লিজ ডু নট ক্রিটিসাইজ মাই ইউনিভার্সিটি। ইট ইজ বিক’জ অব ডাকা ইউনিভার্সিটি হোয়াট আই এম টু’ডে। ইট টট মি হাউ টু কীপ মাই হেড হাই এগেইনস্ট অল অডস। ইট ওয়াজ বিক’জ অব ডাকা ইউনিভার্সিটি আই ওয়াজ ফাউন্ড ফিট ফর কমিশন বাই দি আইএসএসবি। আমার প্রাণপ্রিয় ইউনিভার্সিটির সমালোচনা সহ্য করতে না পেরে বেশ কিছুটা ইমোশনাল হয়ে পড়েছিলাম। সব শেষে তিনি গর্জে উঠলেন: ইউ ব্লাডি চ্যাপ, ইউ ডোন্ট নো হোয়াট ইজ অর্মি। আই উইল কিক ইউ আউট অব দি আর্মি। আর্মি ডাজ নট নীড এন ইনডিসিপ্লিড রো’গ লাইক ইউ। নাউ গেট আউট। স্মার্ট একটা স্যাল্যুট দিয়ে বেরিয়ে এলাম।

সেদিন সারাদিন কোনো কাজে মন বসলো না। অবশেষে একাএকাই সিদ্ধান্ত নিলাম, আর্মিতে আর চাকুরি করবো না। মান-ইজ্জত বিসর্জন দিয়ে চাকুরি করার কোনো মানে হয় না। যা হয় হবে, চাকুরি থেকে ইস্তফা দেবো। তখনকার দিনে কম্প্যুটার ছিলো না। ব্যক্তিগত টাইপরাইটারও ছিলো না। সারারাত জেগে আর্মি চীফকে এড্রেস করে, যথাযোগ্য কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পাঠানোর জন্য, নিজ হাতে রেজিগনেশন লেটার লিখলাম। দরখাস্তে পুরো ঘটনা সংক্ষেপে বর্ণনা করলাম। সবশেষে লিখলাম: আমি ঠিক বুঝতে পারছি না কোনটা আর্মির আসল শিক্ষা। একজন আর্মি অফিসারের মর্যাদা সম্পর্কে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি যা আমাকে শিখিয়েছে, নাকি আমার বর্তমান কম্যানড্যান্ট যা শেখাতে চাচ্ছেন। যদি কম্যানড্যান্ট যা শেখাতে চাচ্ছেন তা-ই কারেক্ট হয়, তবে আমি এই আর্মিতে আর চাকুরি করতে চাই না। আমার এই চিঠিকেই পদত্যাগপত্র বলে বিবেচনা করতে সবিনয় অনুরোধ জানাচ্ছি।

আর্মি বিধি অনুযায়ী এধরনের চিঠিকে ‘রিড্রেস অব গ্রীভেন্স’ (দুর্দশার প্রতিকার) চেয়ে চিঠি বলা হয়। কম্যান্ড চ্যানেলের প্রতিজন কম্যান্ডারের হাত হয়ে সর্বশেষে চিঠিটিকে অবশ্যই আর্মি চীফের হাতে পৌছাতে হবে। প্রত্যেক কম্যান্ডারের জন্য নির্ধারিত সময়সীমা বেধে দেওয়া আছে। যদি কোনো কম্যান্ডার নির্ধারিত সময়ের চাইতে বেশি সময় ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় দরখাস্তটি ফেলে রাখেন, তবে আবেদনকারী সরাসরি পরবর্তী সিনিয়র কম্যান্ডারের কাছে তার চিঠি পাঠাতে পারবেন। তবে হ্যাঁ, যদি মাঝ পথে কোনো কম্যান্ডার প্রার্থিত প্রতিকার করে দিতে পারেন, এবং আবেদনকারী অফিসার যদি তাতে সন্তুষ্ট হন, চিঠিটি পরবর্তী সিনিয়র কম্যান্ডারের কাছে আর পাঠনো হয় না। বিষয়টি ওখানেই শেষ হযে যায়। মিলিটারি কলেজ ঝেলামে আমার কম্যান্ড চ্যানেলে প্রথম অফিসার ছিলনে চীফ ইন্সট্রাক্টর মেজর বি এ (বশীর আহমদ) মালিক, এইসি। পরদিন সকাল বেলা তাঁর অফিসে গিয়ে আমার চিঠিটি তাঁর হাতে দিলাম। মুখ দেখে মনে হলো তিনি এমন কিছু আন্দাজ করেছিলেন। আমার জন্য কফির অর্ডার দিয়ে তিনি চিঠিটি মনেমনে পড়তে লাগলেন। পড়া শেষ করে ছোট্ট করে মন্তব্য করলেন, ওয়েল ড্রাফটেড। রেখে যাও। দেখি কী করতে পারি।

দু’তিন দিন পরের কথা। ঊর্দ্ধতন কম্যান্ডারের কাছে আমার দরখাস্তখানা পাঠাবার সময়সীমা তখনও পার হয়নি। একদিন সকাল দশটার দিকে ডাক এলো কম্যানড্যান্টের কাছ থেকে। যেতেযেতে ভাবলাম, যা হবার হবে। নীতির প্রশ্নে আপোষ করবো না। কম্যানড্যান্টের অফিসে পা দিয়ে স্যাল্যুট করতে না করতেই তিনি আন্তরিক কন্ঠে আহ্বান জানালেন, হাঁ ভাই আশরাফ, আ যাও। টেইক এ সীট। হাউ আর ইউ ? ঘরওয়ালে (বাড়ির সবাই) কেয়সে হ্যায় ? কেয়া পিউগে, চায় ইয়া কফি ? একজন সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট স্বঅভাবিক অবস্থায় তাঁর কমান্ডিং অফিসারের কাছ থেকে স্বপ্নেও এমন আচরণ আশা করতে পারে না। আমার বুঝতে বাকী রইলো না, দেয়ার হ্যাজ বীন এ চেইঞ্জ অব হার্ট ! বসতেবসতে বললাম, থ্যাংক ইউ স্যার। এজ ইউ প্লীজ। কম্যানড্যান্ট অর্ডার্লিকে চা আনতে বললেন। তারপর তিনি বললেন: আশরাফ, আই এম সরি। দি আদার ডে আই ওয়াজ হার্শ উইথ ইউ। ইট কুড বি এভয়ডেড। আই শুড হ্যাভ টেকেন ইওর পয়েন্ট। এনি ওয়ে, লেট’স ফরগেট এন্ড ফরগিভ। ফ্রম টু’ডে আই হ্যাভ পুট ইউ ইন টিপু হাউস। দি হাউস মাস্টার ইজ এ সিনিয়র আর্মি অফিসার। এ নাইস ম্যান। ইউ উইল নট হ্যাভ এনি প্রবলেম ইউথ হিম। আমার চা তখনও শেষ হয়নি। থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ স্যার বলে দাঁড়িয়ে স্যাল্যুট করে অত্যন্ত খুশিমনে কম্যানড্যান্টের অফিস থেকে বেরিয়ে এলাম। আল্লাহকে শুকরিয়া জানালাম।

এরপর থেকে কর্নেল মর্তুজা যেনো আমার ব্যক্তিগত বন্ধু হয়ে গেলেন। আমাকে নিজের গাড়িতে বসিয়ে প্রায় উইকএন্ডে ক্লাবে নিয়ে যেতেন। ভালো ছবি হলে ঝেলাম বা রাওয়ালপিন্ডি শহরে সিনেমা দেখাতে নিয়ে যেতেন। গাড়ি চালাতেচালাতে কলেজের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। প্রায় দিন, রাত্রি বার’টার পর আমার রুমের দরজায় টোকা দিয়ে আমাকে বিছানা থেকে উঠিয়ে বলতেন, আশরাফ, চলো যারা চক্কর লাগাতে হে। বাকী সব লোগ (অন্য অফিসাররা) তো বিবি-বাচ্চা লে কে সোগিয়া হ্যায়। এক তরফ (জুনিয়রদের মধ্যে) তোম হো ব্যাচেলর, দু’সরি তরফ (সিনিয়রদের মধ্যে) ম্যায় হুঁ বাচেলর। ঘর মে কোই কাম নেহি হ্যায়। চলো চক্কর লাগাতে হে। আমাকে সাথে নিয়ে হাউসগুলোতে, কলেজ হাসপাতালে রাউন্ড দিতেন। দেখতেন, ছেলেরা ঠিকমত ঘুমাচ্ছে কিনা। কারও গা থেকে কম্বল পড়ে গেলে একজন মায়ের মতো তা ঠিক করে দিতেন, যেনো ঘুমন্ত ছেলেটি জেগে না উঠে। বাথরুমগুলো পরিষ্কার আছে কিনা, পানির কল সব কাজ করছে কিনা, ইত্যাদি। দু’জনের পায়ে থাকতো রাবার সোলের জুতা, যাতে বাচ্চাদের ঘুমের ব্যাঘাত না হয়। গো-খামারের গরুগলো কেমন আছে তা-ও তিনি দেখতে ভুলতেন না। বলতেন, এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ। গরুগুলো ঠিক না থাকলে ছেলেদেরকে খাঁটি দুধ কেমন করে দেবো ? সারা দিন কাজকর্ম, খেলাধুলা করে আমি খুব ক্লান্ত থাকতাম। রাত জেগে কম্যানড্যান্টের সাথে এভাবে ঘুরতে আমার কষ্ট হতো। ছেলেদের প্রতি কতটা মায়া থাকলে একজন প্রিন্সিপাল এতটা নিবেদিতপ্রাণ হতে পারেন, সত্য বলতে কি, তখন বুঝতে পারিনি। হয়তো বয়স কম হবার কারণে। পরবর্তীকালে যখন আমি নিজে ক্যাডেট কলেজের প্রিন্সিপাল হয়েছিলাম তখন পর্যন্ত আমাকে অপেক্ষা করতে হয়েছিলো একথা বুঝতে যে, কেনো কর্নেল মর্তুজা এমন করতেন। বিষয়টি কাউকে বোধ হয় বুঝিয়ে বলা যায় না, ফুলের ঘ্রাণের মতো উপলব্ধি করতে হয়। সত্যিকার অর্থেই কর্নেল মর্তুজাকে আমি গুরু মানি।